Now Reading
কবে থামবে এই অসভ্যতা?



কবে থামবে এই অসভ্যতা?

ঘটনা -১
আগামীকাল জ্যোতির পরীক্ষা। পরীক্ষার তারিখ অবশ্য শিক্ষক ১ সপ্তাহ আগেই বলে দিয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই হল খাবার থেকে বিষক্রিয়া । কয়েক বার বমি করে শরীর একদম কাহিল হয়ে গিয়েছে। এরপর যখন ডাক্তার দেখিয়ে , ওষুধ খেয়ে ভালো হল , তখন পরীক্ষার মাত্র ১ দিন বাকী। যেভাবেই হোক পরীক্ষায় ভালো করতেই হবে। নাহলে এই সেমিস্টারে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে। ঠিক করল লাগলে সারা রাত পড়ে প্রস্তুতি নিবে।

কিন্তু একি অবস্থা ! সন্ধ্যা শুরু হতে না হতেই পাশের বাড়ির বিয়ে বাড়ি তে শুরু হল উচ্চ সুরে গান বাজান। তার মধ্যে অশ্লীল শব্দে ভরা হিন্দি গান গুলোতে কথার চাইতে বাজনাই বেশি । কানে তুলা গুজে কয়েকবার পড়ার চেষ্টা করল জ্যোতি। কিন্তু , শব্দের মাত্রা এতো বেশি যে কোন ভাবেই সে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারল না। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ওর এখন। আগে অবশ্য এরকম গান শুনতে ভালোই লাগত। রাত ভর হিন্দি গান গুলো শুনে মাঝে মাঝে কল্পনার জগতে হারিয়ে যেত জ্যোতি। কিন্তু আজকে পাশের বাড়ির আনন্দের এক ফোটা রেশ ও ওকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না। উলটো পরীক্ষার টেনশন এ নিজের ভাগ্যকেই বার বার দোষারোপ করল ও।

ঘটনা-২
বছরের শেষ দিন। এই সময়টা ব্যাংক এ খুব চাপ যায়।আজকেও শ্যামার (ছদ্মনাম) ব্যাংক থেকে বাসায় ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংক এ কাজ করে ও। গুরুত্বপূর্ণ একটা রিপোর্ট অনেক আগেই হেড অফিসে পাঠানোর কথা। আগামীকাল যে করেই হোক পাঠাতে হবে । অফিসে কাজটা শেষ করতে পারে নি । ঠিক করেছে বাসায় এসে মেয়েকে খাইয়ে-ঘুম পাড়িয়ে বাকি কাজটা শেষ করে ফেলবে । মেয়ে না ঘুমলে কোন ভাবেই কাজটা শেষ করা সম্ভব নয়।
তবে ভাগ্যটা ভালোই বলা যায়। মেয়ে আজকে খাওয়া দাওয়া নিয়ে একটুও জালাতন করলো না। বিকালে দাদুর সাথে অনেক ক্ষণ ঘুরেছে। এজন্য অনেক ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত ছিল। খাওয়ার পরেই মেয়েকে শুইয়ে দিল শ্যামা । পাশে বসে গল্পের বই পড়ে শোনাল ।ধীরে ধীরে মেয়ের চোখ বুজে আসছে। আনন্দে নেচে উঠলো শ্যামার মনঃ। ভাগ্যকে বার বার ধন্যবাদ জানালো সে। ধীর পায়ে উঠে যেই ল্যাপটপ টা খুলে বসল। অমনি বিকট শব্দে এক টা বোম ফুটল মনে হয় কোথাও। শুরু হল অনেক মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি। এরপর শুরু হল যেন ব্রাশ ফায়ার। চিৎকার করে কেঁদে উঠল ছোট মেয়ে টা। শ্যামা কে জড়িয়ে ধরে কাপতে থাকল থর থর করে। কি হচ্ছে বুঝে উঠতে পারল না শ্যামা । জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল ভয়ার্ত চোখে। চারদিকে দেখল আলোর ঝলকানি। ওহো! কাজের চাপে ভুলে গিয়েছিল আজকে যে থারটি ফার্স্ট নাইট। এখন কি হবে। মেয়ে এত ভয় পেয়েছে যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, কোন ভাবেই ছাড়ছে না। ওদিকে আতশবাজির শব্দ আরও বেড়েই চলেছে। এক একটা আতশবাজির শব্দ যেন সারা শরীর কাপিয়ে দিচ্ছে। কি করবে এখন শ্যামা ?

ঘটনা-৩
নিজাম সাহেব আজকে ১ সপ্তাহ পর বাসায় ফিরল। দিন সাতেক আগে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। হার্টের সমস্যা অনেক পুরন । Heart Attack ও হয়েছে একবার। এবার তাই পরিবারের সবাই প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিল। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায় সজনেরা। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা যায় Heart Attack হয় নি। লো প্রেশারের কারণে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। তবে শঙ্কা আছে। কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। অবশেষে ডাক্তার কে অনেক বলার পর ৭দিন পর রিলিজ পেলেন।
তবে ডাক্তার সাথে দিয়ে দিলেন লম্বা ওষুধ আর নিয়ন কানুনের তালিকা। বলেছেন ঠিক মত ঘুমাতে হবে। বেশি হইচই করা যাবে না। দুপুর খাওয়ার পর ইজি চেয়ারে একটু গা এলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু খুব কড়া শব্দে চমকে উঠলেন । তার খুব প্রিয় একটি দেশাত্মবোধক গান বাজছে মাইকে। কিন্তু এত জোরে বাজাচ্ছে যে নিজাম সাহেবের বুকে ধড়পড় শুরু হল। Heart Attack এর পর থেকে বেশি জোরে শব্দ শুনতে পারেন না তিনি । আজকে কোন এক বড় রাজনৈতিক দলের প্রোগ্রাম আছে। হয়ত সারাদিন ধরেই অনুষ্ঠান হবে। তার খুব প্রিয় গান গুলোই চালাচ্ছে। কিন্তু শব্দের মাত্রা এত বেশি যে উনার বুকের ব্যথাটা বেড়েই চলেছে…

উপরের ঘটনা গুলো এখন প্রায়ই ঘটছে। ১ দশক আগেও আমাদের দেশে এত জোরে শব্দ করে গান বাজানোর প্রচলন ছিল না। কোন কারণে বাজালেও রাত ভর চালানোর কথা তো কল্পনাও করা যায় না। এখন শুধু মাত্র একটি উপলক্ষ প্রয়োজন জোরে গান বাজানোর।

শব্দ দূষণ যে কতটা ক্ষতিকর তা আমাদের বেশির ভাগ মানুষেরই মাথায় আসে না। বিয়ে শাদী, জন্মদিন তো আছেই, এমন কি যে ধর্মীয় উৎসব গুলো ভাব গাম্ভীর্যের সাথে পালন করা উচিৎ সেগুলো তেও হচ্ছে শব্দ দূষণ। শবে বরাতের মত ভাব গাম্ভীর্য পূর্ণ ইবাদতের রাতেও কিনা আতশ বাজির শব্দে ইবাদতে মনোযোগ দেয়াও কঠিন হয়ে যায়।
রাজনৈতিক সমাবেশ,বিভিন্ন দিবস উদযাপন , ধর্মীয় সমাবেশে ও এখন মাইক ভাড়া করে সভা করা হয়, বাজানো হয় গান। যেন যে শুনতে চায় সে তো শুনবেই, এমন কি যে শুনতে চায় না তাকেও জোর করে শোনানো হয়। সেই সাথে তা যদি চলে রাত ভর তবে প্রহসন বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়।

অথচ, একটু আনন্দের জন্য যে আশে পাশের মানুষের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে সেদিকে খেয়ালই করি না আমরা। আমাদের প্রতিবেশীদের মাঝে আছে অসুস্থ মানুষ, ছোট বাচ্চা, পরীক্ষার্থী।

অনেক সময় রোমান্টিক গানের ভাষা গুলোও এমন অশ্লীলতা পূর্ণ হয় যে অনেক অভিভাবকই সন্তানের সামনে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। অথচ না চাইতে ও সন্তান ,বাবা-মা , মুরুব্বীদের সামনে এরকম জোরে বাজান অশ্লীল- ইংগিত পূর্ণ গান গুলো শুনতে হয় ।

আমাদের দেশে যখন একটা সংস্কৃতি শুরু হয়ে যায়, তখন মানুষ আর এর ভালো মন্দ চিন্তা করে না। স্রোতের সাথে একরকম গা ভাসিয়ে দেয়। তার বিপরীতে কথা বলাটাকেও তখন অন্যায় মনে করা হয়।
আর কম বয়সী রা সবসময় ই আনন্দ প্রিয় হয়ে থাকে। বয়সের কারণে তারা তাদের মাত্রা টা ধরে রাখতে পারে না। তবে তাদের মাত্রাটা ধরিয়ে দেবার দায়িত্বটা কিন্তু বড়দের।

কিন্তু, বড় এবং দায়িত্বশীলরা যখন তাদের দায়িত্বে অবহেলা করেন তখন তা বাড়তে বাড়তে সীমা ছাড়িয়ে যায়। আর প্রকৃতির নিয়মই হচ্ছে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া প্রকৃতি কখন ও মেনে নিতে পারে না। তার ক্ষতিপূরণ মানব জাতিকে দিতেই হয়।

বড় দুর্ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত যেন কারোরই কোন কিছুর টনক নড়ে না। ঠিক তেমনি একটি ঘটনা ঘটল রাজধানীতে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে  জোরে গান বাজানোর  প্রতিবাদ করেন এক বৃদ্ধ। শুরু হয় বাক বিতণ্ডা। এরপর হয় হাতা হাতি। হাতাহাতির এক পর্যায়ে বৃদ্ধটি পড়ে গিয়ে নিহত হন।

কবে মানুষের টনক নড়বে? যে আনন্দে আরেকজনের কষ্ট হয়,ক্ষতি হয়, সেটা কোন আনন্দ নয়।পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে এরকম নজির পাওয়া যায় না। সেখানে অনুষ্ঠান করা, গান বাজানোর আলাদা জায়গা আছে। এরকম আবাসিক এলাকায় রাত ভর গান বাজানোর নিয়ম সেসকল দেশে কল্পনাও করা যায় না। সভ্য সমাজের জন্য এটা এক ধরনের অসভ্যতা।

কবে থামবে এই অসভ্যতা?

About The Author
Kanij Sharmin
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment