কেইস স্টাডি স্বাস্থ্য কথা

মাদকাসক্তের সহজ যাত্রা এবং একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা

চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের পাশ দিয়ে রিক্সাতে করে আসছিলাম, হটাৎই চোখে পড়া দেয়ালের একটি চিকা খুব মনে ধরল। যদি ভুল করে না থাকি দেয়ালে লিখা ছিল “কৌতহলে মাদক সেবন ভবিষ্যতে পরিণত হওয়া নেশা” অনেক্ষন ধরেই চিকার লাইনটি মনে ঘুর পাক খেতে লাগল। আরে! সত্যিইতো কৌতহলের বশবর্তী হয়েই বিশেষ করে একজন যুবক বা যুবতি প্রথম মাদক গ্রহন করে বসে। এটাতো নিজের জীবনে বাস্তবেই উপলব্ধি করেছি।

মনে পড়ে গেল আমার ছাত্রাবস্থার একটি রঙিন স্মৃতি, সবে ইন্টারমিডিয়েট এর গণ্ডি পেরিয়েছি। শহুরে বন্ধুদের নিয়ে নিজেই তৈরি করে নিলাম একটি আন্ডার গ্রাউণ্ড ব্যান্ড দল সময়টা ছিল ২০০১সাল। আমাদের সময়কার একটি আন্ডার গ্রাউণ্ড ব্যান্ডের টিম করা কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের কাছে রীতিমত স্বপ্নই ছিল।

এই ব্যান্ড টিম গঠনের আগে অবশ্যই আমাকে বছরখানেক টানা তালিম নিতে হয়েছিল চট্টগ্রামের দুজন কিবোর্ডিষ্ট আইডল ট্রাইঙ্গেল ব্যান্ড এর রনি ভাই এবং স্টিলার ব্যান্ড এর সুজন ভাইয়ের কাছে। ছোট বেলা থেকেই স্বল্প পরিসরে গান শিখেছি যেটা পরবর্তীতে আমাকে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। যেটা বলার উদ্দেশ্য, এই ব্যান্ড টিম করার পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রামের নামকরা বেশ কয়েকটি ব্যান্ড এর প্যাডে দৈনিক ২ঘণ্টা করে গানের প্র্যাকটিস করতাম।

আমাদের টিমের প্রত্যেকেই ছিল ফ্রেস এবং ছাত্র। নিয়ম করে ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া নেয়া প্যাডে সপ্তাহে ২দিন চলত আমাদের টিম প্র্যাকটিস। বদ্ধ রুমে ঘামার্থ শরীরে টানা প্র্যাকটিস শেষে সকলেই খুবই হাঁপিয়ে যেতাম। আর রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য হন্যে হয়ে খুঁজতাম পানি সহ খাওয়ার এটা ওটা। আমাদের টিমের একজন ছাড়া বাকী সকলেই ছিল নন স্মোকার, আর যার অভ্যাস ছিল সে ছিল মারাত্মক রকমের চেইন স্মোকার। এক বসাতেই ২-৩টা সিগারেট খতম করতে বেশ পারদর্শী ছিল সে, অবশ্য এটা কোন প্রশংসার গুণগান নয়। বিষয়টি আমার খুব অপছন্দের ছিল তাছাড়াও সিনিয়র বড় ভাইদের অনেক অনুরোধ করে তাদের প্র্যাকটিস প্যাড বুকিং নিতাম, আর টিমের কেউ সিগারেট ফুঁকলে তাদের চোখে পড়ে গেলেতো মানসম্মান সব শেষ। পরিচিত ছাড়া তখন কোন ব্যান্ড তাদের প্র্যাকটিস রুমে অন্য ব্যান্ডকে প্র্যাকটিস করার অনুমতি দিতনা, কেননা প্যাডে তাদের নিজস্ব ইন্সট্রুমেন্ট থাকত। ভয় ছিল এই ভুলের কারনে প্র্যাকটিসের সুযোগটাই জানি মিস করে ফেলি। প্রচুর মানা করতাম স্মোকার বন্ধুটিকে,  কে শুনে কার কথা উল্টো এক টান দেয়ার অফার করত। সামলে চলতাম নিজেকে কেননা মা মোটেই পছন্দ করেননা এসব, আর এই অভ্যেস যেন নিজের মধ্যে না আসে স্কুল জীবনেই মাথা ছুঁয়ে শপথ করিয়েছেন তিনি। ছোট বেলায় পড়েছিলাম ধূমপানের ক্ষতিকর দিক নিয়ে এক প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানীর উক্তি- ‘Drink poison but leave smoking’। বিষপানের সাথে সাথেই মৃত্যু ঘটে কিন্তু ধূমপানের ফলে মানুষকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয় কথাটি বিশ্বাস করতাম এবং করি। স্বাস্থগত দিক থেকে সিগারেট যদিও অনেক ক্ষতিকর, তবে এটাকে মাদকের আওতাভুক্ত ধরা হয় না। তবে ধূমপান ও মাদক সেবনে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক। এর কারণ, পৃথিবীতে যত মাদকাসক্ত ব্যক্তি আছে তাদের প্রত্যেকেই প্রথম ধূমপান দিয়ে শুরু করে মাদকে অভ্যস্ত হয়েছেন।

এদিকে প্র্যাকটিস এর পর প্র্যাকটিস করে যতই পরিণত হওয়ার দিকে এগুচ্ছি সহসাত এই অভ্যাসটা টিমের আরো দুজনকেগ্রাস করে বসল। খুব কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ করলাম কেবল কৌতহলের বশেই এই অভ্যাসটা কিভাবে তারা রপ্ত করল। তারুন্যের ঐ বয়সে কে শুনে কার কথা তাই বার বার বারণ করেও তাদের থামাতে পারিনি। কিন্তু টিমের আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সমমনা হওয়াতে তাকে আটকিয়েছি। অন্যদের সাথে যোগাযোগ না থাকলেও সেই বন্ধুটি আমার প্রিয় বন্ধুদের একজন হয়ে আছে এখনো। যাই হউক ফিরে যাই আগের প্রসঙ্গে- মোটামুটি ভালই নাম করতে লাগল আমাদের ব্যান্ড। মেটাল ও পাশ্চাত্য ধাঁচের গানে অভ্যস্ত ছিলাম তাই বিয়ে কিংবা মেহেদী অনুষ্ঠানে আমাদের তেমন ডিমান্ড না থাকলেও কলেজ এবং ইউনিভার্সিটির র‍্যাগ ডে গুলাতে বেশি পারফর্ম করা হত। আর যে সব প্রোগ্রামগুলিতে অংশগ্রহন করতাম তার কন্ট্রাক্ট পারসন বা পার্টিকে পূর্বেই সিগারেট এর প্যাকেট সহ এটা ওটার ডিমান্ড দিয়ে দিত আমাদের টিমে সিগারেটে অভ্যস্থ সদস্যটি। বিষয়গুলি আস্তে আস্তে অন্যদিকে মোড় নিতে লাগল, আজকে এটা কাল ওটা এ যেন এক স্বাভাবিক ব্যাপার। আস্তে আস্তে তারা ঢুকে পড়ল মাদকের রাজ্যে যদিও সেসব আর মনে করতে চাইনা। তখন ভেবেছি প্রচুর দীর্ঘদিনের দিনের পরিশ্রমে গড়া টিম চাইলেও ভেঙ্গে দিতে পারছিনা, শুধু ২জনই থেকেছি বাকিদের চেয়ে আলাদা। বলছিনা টিমের বাকী মেম্বাররা নৈতিকভাবে খারাপ কিন্তু খুব কাছ থেকে দেখেছি মাদকের পথে তাদের সহজ যাত্রা। চিত্রটি ছিল এমন- সংকোচে প্রথমে হাতে নেয়া এদিক ওদিক তাকানো তারপর মুখে দিয়ে গাল দিয়ে ধোঁয়া বের করা তারপর নাক দিয়ে বের করার চেষ্টা, কাশি। এভাবে ১-২টা থেকে প্রতিদিন ১প্যাকেট(২০টা) কিংবা তারও অধিক সিগারেটে তারা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তাদের ভাবটাও ছিল সিগারেট খাওয়া একটি ফ্যাশন। প্র্যাকটিস প্যাডের ভাড়া বাবদ মেম্বারদের নির্ধারিত ফি দিতে অনেকেই গড়িমসি করলেও সিগারেট কিনতে তাদের টাকার কোন সমস্যা হতনা। ব্যাক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি আমার পরিবারের ভাই বোনদের মধ্যে এই বাজে অভ্যাসটি নেই যার কারনে গর্ববোধও করি। আর পরিবারের জুনিয়রদের মধ্যে যারা সামনে অগ্রসরমান হচ্ছে দৃঢ় বিশ্বাস তারাও এই ধারাবাহিকতা পূর্ণাঙ্গ রক্ষা করবে। আগে পরিবার বাঁচাই তারপর না হয় সমাজের কথা বলি। আপনার পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যদের খোঁজ খবর রাখছেনতো সে কি করছে? কৌতহল বশে যদি এমন কিছু করেই থাকে তবে না শাসিয়ে বন্ধুর মত মিশে তার এই বদ অভ্যাসে বাঁধা দিতে হবে। মাদকের শুরুই কিন্তু সিগারেটের হাত ধরে যা পর্যায়ক্রমে মরণ ব্যাধি পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

গরমে ভাল থাকার উপায়।

Md. Riajul Islam

বাংলাদেশ থেকেই বিদেশীরা কিনছে কঠিন রোগের ঔষধ

MP Comrade

আর্থিক সংকটে বিপর্যস্ত “আইওএম” এর রোহিঙ্গা স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: