Now Reading
শক্তিমান প্রেসিডেন্ট শক্তিশালী বলয়



শক্তিমান প্রেসিডেন্ট শক্তিশালী বলয়

আয়তনে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ১৪ কোটি ৭০ লাখ নাগরিকের দেশ রাশিয়ায় ৭ম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চতুর্থ মেয়াদে আবারো ক্ষমতার মসনদে বসেছেন বিশ্ব ক্ষমতাধরদের একজন হিসেবে পরিচিত ভ্লাদিমির পুতিন। তাকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে ‘আনপ্রেডিক্টেবল পাওয়ারফুল ম্যান’। রুশদের কাছে পুতিন একজন শক্তিশালী নেতা ও লৌহমানব হিসেবে পরিচিত। তাই এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পুতিন এর শ্লোগান ছিল-   ‘শক্তিমান প্রেসিডেন্ট, শক্তিশালী রাশিয়া’

রুশ নির্বাচন পরিচালনা বিষয়ক কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্যমতে, সারাদেশে ৩০ হাজার পর্যবেক্ষক এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেছেন।  রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০৮ মিলিয়ন। আর সমগ্র দেশজুড়ে ৯৭ হাজার ভোটকেন্দ্রে মোট ৭৩ মিলিয়ন ভোট ব্যালট বাক্সে জমা পড়েছে। ৬৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ রুশ ভোটকেন্দ্রে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি আট প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সর্বোচ্চ ৭৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট পদে জয়লাভ করেন ভ্লাদিমির পুতিন। সংখ্যার হিসেবে ৫ কোটি ৬২ লাখ ৬ হাজার ৫১৪ জন রুশ পুতিনকে ভোট দিয়েছেন এবার। ২০১২ সালের নির্বাচনের চেয়ে এবার বেশি ভোটে জয়ী হন পুতিন। তিনি গত নির্বাচনে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন।

২০১৪ সালের গণভোটে ক্রিমিয়া রাশিয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম সেখানকার অধিবাসীরা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ পান। ক্রিমিয়ায়ও পুতিনের জয়জয়কার এখানে তিনি পেয়েছেন ৯২ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, সিরিয়ায় অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার রুশ সেনার প্রত্যেকেই পুতিনকে ভোট দিয়েছেন।

সংবিধান অনুযায়ী রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট এর মেয়াদকাল ছয় বছর। ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের এই মেয়াদ ছিল মাত্র চার বছর, কিন্তু একই বছর সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এই মেয়াদকাল চার থেকে বাড়িয়ে ছয় বছরে উন্নীত করেন। সোভিয়েত একনায়ক যোসেফ স্ট্যালিনের পর দ্বিতীয় নেতা হিসেবে সবচেয়ে বেশি মেয়াদে ক্রেমলিনের ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছেন পুতিন। ১৯৯৯ সালের শেষ থেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আছেন তিনি। বর্তমানে গণমাধ্যমসহ রাশিয়ার পুরো প্রশাসনে একছত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী তিনি।

কেউ যদি ভাবেন পুতিন উড়ে এসে জুড়ে বসেছে তাহলে সেটি তার অজ্ঞতা। তিনি একদিনেই রাশিয়ার প্রতাপশালী নেতায় পরিণত হননি পরিবেশ-পরিস্থিতিই তাঁকে করেছে দৃঢ়চেতা। সাফল্যকে রপ্ত করার কৌশল জীবন থেকে শিখেছেন তিনি।

এর জন্য একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৫২ সালের ৭ অক্টোবর তৎকালীন লেনিনগ্রাদের (বর্তমানে সেন্ট পিটার্সবার্গ) একটি দরিদ্র পরিবারে পুতিন জন্ম গ্রহন করেন। পুতিনের ঠাকুরদাদা লেনিনের গ্রামের বাড়িতে শেফ হিসেবে কাজ করতেন, তিনি একটা সময় স্টালিনের বাবুর্চির কাজও করেছেন।  ছাত্রাবস্থা থেকেই পুতিন জুডো-কারাতের প্রতি আগ্রহী ছিলেন, এ বিষয়ে তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা আছে।১৯৭৫ সালে লেনিনগ্রাদ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের আন্তর্জাতিক শাখা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিভাগে কাজ করতে পাঠানো হয়। এরপরই রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন ১৯৭৬ সালে। এই পেশাটার প্রতি পুতিন এর আলাদা কৌতহল ছিল, কেননা রুশ সিনেমায় গোয়েন্দাদের ভূমিকা দেখে তাঁর গোয়েন্দা জীবনের প্রতি কৌতূহল জন্মে। কেজিবি’র এজেন্ট হিসেবে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনে দায়িত্ব পালন করেছেন পুতিন। সেন্ট পিটার্সবার্গে ফিরে এলে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল থাকাকালীন ১৯৯২ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে অবসর নেন। ১৯৯৪ সালে পুতিন সেন্ট পিটার্সবার্গ প্রশাসন চীফ এর প্রথম ডেপুটি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯৬ সালে মস্কোতে তাঁর ডাক পড়ে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী রাশিয়ায় প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন কেজিবির উত্তরসূরি গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির প্রধান করেন পুতিনকে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের আগস্টে ইয়েলৎসিনের মন্ত্রিসভার সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। একই বছরের ৩১ ডিসেম্বর মেয়াদ পূর্ণ হবার পূর্বেই প্রেসিডেন্ট ইয়েলিসনের পদত্যাগ করলে দায়িত্বভার প্রত্যাবর্তনের পর পুতিন প্রথমবার কার্যকরভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর রাশিয়ার প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিনের অধীনে ক্রেমলিনে কাজ করার সুযোগ হয় পুতিনের।

২০০৮ এর নির্বাচনে পুতিন তাঁর প্রেসিডেন্টের মেয়াদের দ্বিতীয় দফা পূর্ণ করেন। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার ফলে তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহচর দিমিত্রি মেদভেদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিজে হন প্রধানমন্ত্রী। কার্যত ক্ষমতার নাটাই ছিল পুতিনেরই হাতে। রাষ্ট্রীয় সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তিনিই দিতেন। ২০১২ সালে তিনি ফের প্রেসিডেন্ট হন আর এই দফায় পুতিন ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়াকে নেতৃত্ব দেয়ার অধিকার লাভ করলেন।

যদিও বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা রাশিয়ায় তেমনভাবে বিকশিত হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া স্বাধীন হলেও সে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত দুর্বলই রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন ও তাঁর দল অন্যদের ওপর একচেটিয়া প্রভাব রেখেছে। তবে এ কারণে রাশিয়াকে বা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে কেউ দোষ দিতে পারেনা কেননা রাষ্ট্রীয় সমাজ ব্যাবস্থাটাই সেখানে এমন।

বর্তমানে রাশিয়াসহ প্রায় সব দেশ অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে। তাই প্রত্যেক  দেশের মানুষই চায় সে দেশে একজন শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেতা ক্ষমতায় থাকুক। আর ঠিক সেই জায়গায় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন পুতিন। পশ্চিমাদের চোখের সামনেই ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে রীতিমতো ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বদলে দিয়েছেন সেখানকার যুদ্ধের সব হিসাব নিকাশ। আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়া যে সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছে তাতে দাবার দান এখন উল্টো পথে। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ‘ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়’ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে দেখছেন পুতিন। আর এই বিশ্বাস থেকে বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রে রাশিয়াকে আনতে মরিয়া তিনি। দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার ক্ষমতায় আছেন পুতিন আর এই সময়ে দেশটির সর্বস্তরে কর্তৃত্ব বলবৎ করে নিয়েছেন তিনি। তাঁর প্রচেষ্টায় আবারো শৌর্যবীর্যে ফিরেছে রাশিয়া।  মস্কোর প্রভাববলয় ক্রমেই বাড়ছে, ইউরোপের সীমানা বদলানোর বিষয়ে বরাবর সোচ্চার পুতিন। অভিযোগ রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের সীমানা পুনরায় নির্ধারণ করতে চান তিনি। গণভোটের মাধ্যমে ক্রিমিয়ার অধিবাসীরা রাশিয়ায় যোগ দেওয়ার পক্ষে রায় দেয়ার পরবর্তি এ-সক্রান্ত বিলে সই করে পুতিন পৃথিবীর নতুন মানচিত্র বানানোর কথা বিশ্ববাসীকে জানান দেন।

রাজনীতিটা বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন পুতিন, যা বিশ্লেষণ করার সাধ্য অন্য কারও নেই। বিশ্ব রাজনীতিকে কখন কোন দিকে ঘুরিয়ে দেবেন সে হিসাব কষতে গিয়ে বিশ্লেষকরা এটা মানছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় পুতিন যা ভাবান বিশ্লেষকরাও তাই-ই ভেবে নেন। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট নতুন পরমাণু অস্ত্র উন্নয়নের কথা ঘোষণা করেন, যা কিনা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা দিয়েও শনাক্ত করা যাবে না। তাই ঘটনা পর্যবেক্ষণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে পশ্চিমের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখনই সবচেয়ে টালমাটাল অবস্থায় রয়েছে। পুতিন নিজেকে ও তাঁর দেশকে এমন জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন যে এতে তাদের আরেক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ আমেরিকার ঘুম হারাম হওয়ার জোগাড়।

সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়া যুদ্ধে আইএসকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করে বৈশ্বিক অঙ্গনে নিজের শক্ত পদচারণার কথা জানান দিয়েছেন পুতিন। সিরিয়ায় পশ্চিমা মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি গুলোতে এখনো অভিযান চালাচ্ছে মস্কো-সমর্থিত বাশার আল আসাদের বাহিনী।

সন্ত্রাসবাদ নির্মূল অভিযানে রাশিয়ার সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালভাবেই ঝাঁকিয়ে দিয়েছে বলা যায়। ফলশ্রুতিতে আমেরিকার মিত্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন পরোক্ষ আবার কখনো প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এমনকি ফ্রান্স ও সৌদি আরবের মতো দেশকেও রাশিয়ার গুণগান করতে দেখা যাচ্ছে।

এদিকে স্নায়ুযুদ্ধে পুতিনকে মাস্টারমাইন্ড ভাবতে শুরু করেছেন অনেকেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত কয়েক বছর পূর্বে দক্ষিণ চীন সাগরের কিছু ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ বাঁধে চীনের। সেখানে চীনের প্রতিপক্ষদের সাহায্যার্থে আমেরিকা রণপ্রস্তুতি নিলেও চীনের প্রতি ভ্লাদিমির পুতিন সমর্থন দিলে আমেরিকা তৎক্ষণাৎ তার যুদ্ধজাহাজ প্রত্যাহার করে নেয়। এতে বুজাই যায় রাশিয়া তথা পুতিনকে কত সমীহ করে আমেরিকা।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এক সতর্ক অভিনন্দন বার্তায় পুতিনকে ট্রাম্প বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, কিন্তু আমাদের যা আছে কাউকে আমরা কখনো তার কাছাকাছি আসতে দিবো না”                                                                                               

চলবে…

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment