Now Reading
জেমস বন্ড রুপী রাশিয়ান কূটনীতিক



জেমস বন্ড রুপী রাশিয়ান কূটনীতিক

আমরা সকলেই জানি যে বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরা কম বেশি গোয়েন্দা কার্যক্রম এর সাথে জড়িত। তবে এই অভিযোগে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বা সমালোচিত দেশটির নাম রাশিয়া। পৃথিবীর  প্রায় সকল দেশই মনে করেন বা বিশ্বাস করেন যে প্রতিটি রাশিয়ান কূটনীতিকই এক একজন গোয়েন্দা। অনেকের ধারনা একজন ভালো কূটনীতিক দেখতে পরিপাটি পোষাকের ভদ্রলোক, যিনি কয়েকটি ভাষায় কথা বলতে পারদর্শী এবং খুব সাবলীল ভাবে মিশতে পারেন ও  হাত মেলাতে পারেন। তবে এমনটা ভাবা অবান্তর নয় বরং একজন কূটনীতিককে কোথাও নিযুক্ত করার পূর্বে অন্যান্য গুণাবলীর সাথে এই গুনগুলিও থাকা আবশ্যিক। যেহেতু দেশের প্রতিনিধিত্ব তারা করে সুতরাং অবশ্যই তাদের অনন্য উচ্চতার গুণাবলী সম্পন্ন হতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী একজন কূটনীতিক সে দেশের প্রথা মেনেই, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।

১৯৬১ সালের ১৮ এপ্রিল ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের কূটনৈতিক আদান-প্রদান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রতিনিধি সম্মেলনে ভিয়েনার কূটনৈতিক সম্পর্কের কনভেনশন স্বাক্ষরিত হয়।  কূটনীতিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় এ সম্পর্কীত ভিয়েনা কনভেনশনের ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কূটনৈতিক সংস্থার যে কোনো ব্যক্তি হবেন অলঙ্ঘনীয়। তিনি থাকবেন যে কোনো ধরনের গ্রেফতার অথবা আটকের আওতামুক্ত। স্বাগতিক দেশটি তাঁর সকল ধরনের মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে। তার স্বাধীনতা ও মর্যাদা অক্ষুণ রেখে যেকোনো ধরনের আক্রমণের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।

আর ভিয়েনা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৩১(১) এ বলা আছে, “একজন কূটনীতিক যে দেশেই নিযুক্ত থাকবেন তিনি সে দেশের আইনের আওতামুক্ত থাকবেন”। অর্থাৎ তিনি সব ধরনের সিভিল এবং প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে থাকবেন।

এই চুক্তির সুযোগে প্রায় প্রতিটি দেশই সেদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ খুঁজে এবং বিভিন্ন তথ্য নিজ দেশে সরবরাহ করে। তবে ভিয়েনা কনভেনশনের এ সুযোগ নিয়ে কিছু দেশ অতি মাত্রায় গোয়েন্দা তৎপরতা চালায়,  এ ব্যাপারে সর্বাধিক বদনাম রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইসরাইল এবং পাকিস্তানের। তবে সাম্প্রতিক কূটনীতিকদের কর্মকাণ্ডে এ অভিযোগের পালে নতুন করে হাওয়া লাগে। আর এবার সকলেই একাই দুষছে রাশিয়াকে, সকলেরই অভিন্ন সুরে বলছে রাশিয়ান কূটনীতিকরা গোয়েন্দা কার্যক্রমে অধিক সম্পৃক্ত। সম্প্রতি  একজন রুশ ডাবল এজেন্টকে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে রাশিয়ার ২৩ জন কূটনীতিকে ব্রিটেন থেকে বহিষ্কার করেছেন। তার এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে রুশ দূতাবাসের এক তৃতীয়াংশ কর্মকর্তাদের ব্রিটেন কর্তৃক বহিষ্কার করা হল। কম যাননি তাদের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক আদেশে মোট ৬০ জন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছেন আমেরিকা হতে। প্রতিটি রুশ কূটনীতিককে গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবেই ধরে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

আর এই ধারাবাহিকতায় তাদের দেশ থেকে রুশ কূটনীতিক বহিষ্কার করেছেঃ ইউক্রেন, জার্মানি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র,  ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, আলবেনিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি, লাটভিয়া, রোমানিয়া, নরওয়ে, মেসিডোনিয়া, কানাডা । আরো কয়েকটি দেশ নতুন করে এই তালিকায় যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যে তারাও একই ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।

যার ফলে কূটনৈতিক দিকে থেকে অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে রাশিয়া। দেশটি আরো কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বলে ধারনা। সোভিয়েত যুগের সেই শক্তি বর্তমানে রাশিয়ার না থাকলেও যেকোন দেশের মাটিতে গোলমাল পাকানোর যথেষ্ট সামর্থ্য রাশিয়ার রয়েছে। যার কারনে প্রায় প্রতিটি দেশই মেনে নেয় যে, কূটনীতিকদের বেশে সকল দেশেই কার্যত রাশিয়ান গোয়েন্দারা প্রেরিত হয়।

রাশিয়ান গোয়েন্দারা দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের পাশাপাশি দেশের বাইরে নানা ধরনের বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাদের কার্যক্রমের ভেতর থাকে সে দেশের রাজনীতির উপর নজরদারি কার্যক্রম, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, অন্য দেশের কুটনৈতিক তৎপরতায় নজরদারি ইত্যাদি। নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্তের কার্যক্রম ইত্যাদি তারা ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আদান প্রদান করে। যা সাধারণ কম্পিউটার ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রবেশ করা বা জানা সম্ভব নয়। এছাড়া এসব গোয়েন্দারা কাজও করেন তাদের পরিচয় গোপন রেখে। তাই বিশ্ব পরিমণ্ডলে তাদের নিয়ে কৌতহল অন্যদের চেয়ে বেশি।

রাশিয়ার বর্তমান গোয়েন্দা সংস্থার নাম এফএসবির যার পূর্বের নাম ছিল কেজিবি। পৃথিবী কাঁপানো গোয়েন্দা সংস্থা হিসেবে একসময় কেজিবির বেশ দাপট ছিল। মুলত এই এফএসবির অধিনেই কূটনীতিকরা তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হল বর্তমান রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট পুতিন একসময় এই এফএসবি এর প্রধান ছিলেন। তাই স্বভাবতই মনে হতে পারে রাশিয়ার সকল কর্মকাণ্ড হয়ত তিনি গোয়েন্দা ধাঁচের করে রাখেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির কর্মী সংখ্যা আনুমানিক লক্ষাধিক যা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে। এফএসবির সদর দফতর প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ার মস্কো শহরের ল্যুবিয়াঙ্কা স্কোয়ারে। এফএসবির সাহায্যকারী সংস্থার নাম গ্রু। মোট ১০টি বিভাগের মাধম্যে এফএসবির তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। এফএসবির মূল দায়িত্বের মধ্যে থাকে বৈদেশিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স পরিচালনা, কাউন্টার টেররিজম, গুপ্তহত্যা, বর্ডার সার্ভেইল্যান্স, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নিজস্ব লোক সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক তৈরি এবং বিদেশি কূটনীতিকদের ওপর কড়া নজরদারি। ধারণা করা হয় সারা বিশ্বে কূটনীতিক ছত্রছায়ায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাজারো এফএসবির গোয়েন্দা যারা নিয়মিত এফএসবিকে গোপন তথ্য সরবরাহে সহযোগিতা করছে। তাই তাদের কূটনৈতিক কর্মকর্তা আর গুপ্তচরের মাঝে ফারাক কেউ করেন না। বিশ্বের প্রতিটি দূতাবাসেই গুপ্তচর থাকে তবে রাশিয়ার দিকেই কেন সকলে অঙ্গুলি নির্দেশ করছে? এর কারন হচ্ছে রাশিয়ার নিযুক্ত গোয়েন্দারা যথেষ্ট দুর্ধর্ষ যারা গুপ্ত হত্যায় বেশ পারদর্শী। আর এই গুপ্ত হত্যায় তারা নিজস্ব ট্র্যাডিশন ফলো করে থাকেন যেমনটা ডাবল এজেন্ট সের্গেই স্ক্রিপালের ক্ষেত্রে ঘটেছে। স্ক্রিপাল ও তার মেয়ের উপর সোভিয়েত আমলের দুর্লভ নার্ভ গ্যাস প্রয়োগ করেছে কথিত রুশ গোয়েন্দারা। স্ক্রিপাল একসময় কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা হিসেবে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ জিআরইউয়েতে কর্মরত ছিলেন। তিনি রাশিয়ার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার কাছে বহু রুশ গোয়েন্দা ও এজেন্টদের পরিচয় ফাঁস করে দেন- এই অভিযোগে ২০০৪ সালে তাকে আটক করে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি)। বিচারের রায়ে ২০০৬ সালে তার ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আটক মস্কোর ১০ গোয়েন্দার সাথে রাশিয়ায় আটক পশ্চিমা গোয়েন্দাদের পরস্পর বিনিময়ের অংশ হিসেবে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ।  শীতল যুদ্ধ পর ১৯৯১ সালে ঘটে গোয়েন্দা বদলাবদলির সবচেয়ে বড় ওই ঘটনাটি। ভিয়েনা বিমানবন্দরের টারমাকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি জেট বিমান পাশাপাশি ঘেঁষে দাড়িয়ে ওই গোয়েন্দা বিনিময়টি সারে। এরপর স্ক্রিপালকে ব্রিটেন রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় এবং এরপর থেকে সে আক্রান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত গোপনে উইল্টশায়ারে বসবাস করে আসছে।

এর আগেও ২০০৬ সালে সাবেক কেজিবি গোয়েন্দা আলেকজান্দার লিটভিনেঙ্কোকে তেজস্ক্রিয় পোলোনিয়াম ২১০ প্রয়োগের মাধম্যে হত্যা করে রাশিয়া। সেই সুত্রে  ব্রিটেন আর রাশিয়ার সম্পর্কে টানাপড়েন ধরে। সম্পর্ক এতটাই নাজুক হয়ে যায় যে ব্রিটেন সেই বদলা নিতে নানান কৌশল গ্রহন করে রাশিয়াকে চাপের মধ্যে ফেলে দেয়। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কড়া সমালোচক ৪৩ বছর বয়সী লিটভিনেঙ্কোকে ব্রিটেন রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়। ফলে রুশ গোয়েন্দারা ওঁত পাতে তাকে ধরাশায়ী করতে।  লন্ডনের মিলেনিয়াম হোটেলে লিটভিনেঙ্কোর চায়ে গোপনে ওই পোলোনিয়াম ২১০ তেজস্ক্রিয় বস্তু মিশিয়ে দেওয়া হয়। তার অসুস্থতার কারণ বের করতে ব্রিটিশ চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি ১২ বছর আগের চেয়ে ভিন্ন, এবার আন্তর্জাতিক মহল পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি সহানুভূতিশীল। রাশিয়া বিগত কয়েক বছরে যে ধরনের আচরণ করছে, সে বিষয়ে কোন প্রকার ছাড় দিতে নারাজ তারা।

পরিস্থিতি যাই হউকনা কেন একটা জিনিস স্পষ্ট আর তাহল, রাশিয়া কখনই তার বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করে না। মৃত্যু তাদের জন্য অবধারিত আর এই মৃত্যু পরোয়ানা কার্যকর করেন কূটনীতিক রুপী এক একজন জেমস বন্ড।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment