Now Reading
বিবেকহীন বোধ, ক্ষত-বিক্ষত দেহ



বিবেকহীন বোধ, ক্ষত-বিক্ষত দেহ

সত্যি বলতে কি এমন একটা বিষয় নিয়ে লিখছি যেটা কখনই ভাবিনি এমনটার অবতারণা হতে পারে।

ইদানিং কালে সমাজে যৌনতার প্রকোপ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে যা  অন্যসময়ের চেয়ে তা মাত্রারিক্ত। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে এর ভয়াবহতা বেড়েছে বহুগুণ। চারিদিকে যেন নরপশুদের উন্মত্ত প্রতিযোগিতা! কিশোরী থেকে বাচ্চা পর্যন্ত কেউ যেন এই ভয়াল থাবা থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। অনেকক্ষণ ঘুরে ফিরে একটা শব্দ লিখতে চাচ্ছি কিন্তু কেন জানি সাহস পাচ্ছিনা। সত্যি বলতে কি এত কঠিন এবং খারাপ শব্দ ব্যাবহার করে লিখতে মন সায় দিচ্ছিলনা, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা উপলব্দি থেকে লিখছি।

সামাজিক  যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে এই জঘন্য বিষয়টি বারবার ঘুরে ফিরে আসছে। আর তা হল ধর্ষণ। মানুষের বিবেক বুদ্ধি ও জ্ঞান যখন লোপ পায় তখন সে অদমের চাইতেও খারাপ। আর এই অদম অমানুষ গুলি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে তাদের বিষ বাস্প ছড়িয়ে সমাজকে কলঙ্কিত করতে কুণ্ঠাবোধ করছেনা ইদানীং। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন অসহায় নারী কিংবা শিশুকে জোড় পূর্বক যৌন নির্যাতন করাকেই আমরা ধর্ষণ বলে থাকি। এখনতো ধর্ষণ এর সাথে আরেকটি বাস্তবতার রুপ দিয়েছে পাষণ্ড নরপশুরা, আর তা হল হত্যা। ধর্ষণ পরবর্তী প্রমাণ মুছে দিতে হয়ত তাদের এই হিংস্রতা।

দিনদিন  আমরা কিসের দিকে ধাবিত হচ্ছি? বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নীত হয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, তখন সমাজের কিছু হীন মানুষ এখনো আইয়ামে জাহেলিয়ার মতাদর্শে নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। আইয়ামে জাহেলিয়ার অর্থ হচ্ছে অন্ধকার যুগ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগ। এ যুগে সাধারণত আরবগণ স্বভাব ও চরিত্রের দিক থেকে অজ্ঞতা ও মূর্খতার চরম অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে যথেষ্ট বর্বর ছিল। কিন্তু এখনতো সেসময় আর নেই? তবে কেন এই নর পশুদের তাণ্ডব ও পাশবিকতা সে সময়কার মত?  

এমনি কিছু ঘটনার মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা মানুষের মনকে মারাত্মক নাড়া দিয়েছে। জাগ্রত করেছে বিবেক এর কাছে প্রশ্ন। প্রকাশ্য বা  অপ্রকাশ্য অসংখ্য ঘটনার মাঝে সাম্প্রতিক দু-একটি ঘটনা পূর্বের অনেক ঘটনাকে ছাপিয়ে গেছে। তেমনি কয়েকটির মধ্যে- গত ১৭ই মার্চ হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার একটা হাওরে এক কিশোরীর ক্ষত-বিক্ষত নিথরদেহ সবুজ ঘাসের উপর পড়ে থাকার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। চারিদিকে উঠেছে নিন্দার ঝড়, সকলেই পুলিশের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করছেনা তারা। ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করার পর হত্যা করা হয়েছে। কিশোরীর বাবা সায়েদ আলীর বক্তব্য, সপ্তাহ দুয়েক আগে ৪ঠা মার্চ আদালতে মামলা করেছিলেন।  সেই মামলায় তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মহিলা সদস্য কলম চাঁন বিবির পুত্র বাবুল মিয়াকে প্রধান অভিযুক্ত করে তাঁর মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। মামলা পরবর্তীতে অভিযুক্ত যুবকের হুমকির কারণে তিনি মেয়েকে নানার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কিন্তু বাঁচাতে আর পারেননি। মার্চের শুরুতে ধর্ষণের অভিযোগে কিশোরীর বাবা যে মামলা করেন, তার এজাহারে বলা হয়- গত ২১শে জানুয়ারি তার ১৬ বছরের মেয়ে বিউটি আক্তারকে প্রতিবেশী যুবক বাবুল মিয়া অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং ধর্ষণ করে। ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে সালিশ সহ বিভিন্নভাবে সমাধানের চেষ্টা করে সময়-ক্ষেপণ করা হয়েছে। মামলা করলেও গ্রামে এই মেম্বারের প্রভাবের কারণে প্রথমে তাদের সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ধর্ষণের মামলার পর পুলিশ সেভাবে তৎপর ছিল না। মেয়েটির বাবা সায়েদ আলী ঠেলাগাড়ি চালিয়ে সংসার চালান অন্যদিকে অভিযুক্ত যুবকের মা ইউপি সদস্য হওয়ায় কিশোরীর পরিবারটি তুলনামূলক অসহায়। তাই তারা সঠিক বিচার পায়নি, এদিকে সেই হতভাগা তরুণীর ক্ষত-বিক্ষত মৃতদেহের সেই ছবি সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় প্রশাসন নরেচড়ে বসে। তবে হবিগঞ্জ পুলিশ সুপারের বক্তব্য, ধর্ষণ মামলা সরাসরি পুলিশের কাছে হয়নি, এ বিষয়ে মামলা হয়েছে আদালতে। আদালত থেকে মামলা থানায় আসার পরই তারা তৎপর থেকে অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্তের মা সেই ইউপি মেম্বার সহ দু’জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে কিন্তু প্রধান অভিযুক্ত বাবুল মিয়া পলাতক রয়েছে। বাবুল মিয়াকে গ্রেফতারের জন্য ডিবিসহ পুলিশে সব ইউনিট কাজ করছে। এদিকে ধর্ষণের অভিযোগের ব্যাপারে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল, মেয়েটির মৃতদেহ পওয়ার পরদিন ১৮ই মার্চ। হতভাগ্য মেয়েটির বাবা তাঁর মেয়েকে ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনার দ্রুত বিচার দাবী করেন।

এদিকে এই ঘটনার কিছুদিন পূর্বের আরেকটি জঘন্য ঘটনাতেও  হতবাক হয়েছে সকলে। গত ৫মার্চ জন্মদাতা বাবা কর্তৃক ঔরসজাত মেয়ে ধর্ষণ হয়েছে কক্সবাজার জেলার মহেশখালীতে। মা মারা যাওয়া ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে স্থানীয় এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিলেও স্বামীর সাথে তার সংসার করতে বাঁধা দেয়। ঔরসজাত মেয়েকে নিজের বাড়িতে রেখে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন মিলনে লিপ্ত হয়। এমনকি কক্সবাজার শহরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েও রাতে বোর্ডিঙয়ে তাকে জোড়পূর্বক এই জঘন্য কর্মকাণ্ডটি করে। কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফিরে মেয়েটি স্থানীয় লোকজন ও প্রতিবেশী নারীদের  বিষয়টি জানায়। পুলিশের কাছে নির্যাতিত মেয়েটির অভিযোগ, তার বুকে চুরি ধরে, ভয় দেখিয়ে নিয়মিত যৌন নির্যাতন করত তার বাবা। কখনো পানের বরজে, কখনোবা গরুর গোয়াল ঘরে, কখনো নিজ বাড়িতেই তাকে ধর্ষণ করত তার বাবা। ধর্ষিত মেয়েটির একটি কন্যা সন্তানও আছে যাকে ভরণ পোষণের অভাবে সে অন্যের কাছে দত্তক দেয়। পূর্বের ন্যায় শারীরিক নির্যাতনের চেষ্টা করলে মেয়েটির শোর চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তার লম্পট পিতাকে আটক করে স্থানীয় মেম্বারের কাছে হাজির করে এবং পরবর্তীতে মহেশখালী থানার কাছে সোপর্দ করে।

হঠাৎ করেই যেন হিংস্র মানুষরুপী জানোয়ারের সংখ্যা বেড়ে গেছে দেশে।মাত্র ২২ মাস বয়সী একটি শিশুকেও অমানবিকভাবে ধর্ষন করা হয়েছে। ২২ মাস বয়সী একটি অবুজ বাচ্চার কি দোষ ছিল? সমাজের কাছে এর সদুত্তর নেই। এসব ঘটনা লিখতেও ভাল লাগছেনা। শুধু একটাই দাবী এসব মানুষরুপী জানোয়ার লম্পটদের সরাসরি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হউক। অন্যথা সমাজের এই বিষ বাস্প আরো অধিকতরভাবে সংক্রমিত হতে পারে। ধর্ষকরা ছাড় পেয়ে যাচ্ছে বলেই, আরো অনেকেই উৎসাহিত হচ্ছে আর চারিদিকে ঘটছে ধর্ষনের নানান ঘটনা। এমনও হতে পারে অনেক নির্যাতিত আছে যারা লোকচক্ষু ও সামাজের ভয়ে তাদের সাথে ঘটা অমানবিক ঘটনাকে আড়াল করে রাখে। নিরবে নিভৃতে তাদের চোখের জল রক্ত হয়ে বয়।

এখনি সময় প্রতিরোধের। ধর্ষকদের যথাযথ বিচারপূর্বক এমন নজির স্থাপন প্রয়োজন যেন উৎসাহীরা বুঝে এর পরিণতি।

ধর্ষন প্রতিরোধে সমাজে  নানান উদ্যেগ গ্রহন করা যায়ঃ পাড়ায় পাড়ায় স্থানীয় জনগনের সমন্বয়ে টাস্কফোর্স বা মহল্লা কমিটি গঠন করে ধর্ষণসহ নানান অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা। ইভ-টিজিং এ সম্পৃক্তদের সামাজিকভাবে বয়কট ও আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করা। নারী নির্যাতনের উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে কঠিন সাজার ব্যাবস্থা করা। স্কুল পর্যায় থেকে নারীদের আত্মরক্ষার কৌশন শেখানোর ব্যাবস্থা করাসহ ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক এই ব্যাধি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যমতের  ভিত্তিতে এগিয়ে এসে সমাধানের পথ বের করা অতীব জরুরী।

About The Author
MP Comrade
0 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment