চট্টগ্রাম

স্বমহিমায় চট্টগ্রাম

পাহাড়ী কন্যা কর্ণফুলী পাড়ের জেলা ও শহর চট্টগ্রাম। পাহাড়, সমুদ্র আর উপত্যকায় ঘেরা চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যে প্রাচ্যের রাণী হিসেবে বিখ্যাত। এখানে দেশের প্রধান এবং সর্ববৃহৎ বন্দর ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দেশের প্রধান প্রধান শিল্প কলকারখানা।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম, এশিয়ায় ৭ম এবং বিশ্বের ১০ম দ্রুততম ক্রমবর্ধমান শহর, এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত

বন্দরনগরী নামে পরিচিত এই শহরের অবস্থান দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম জেলায়,  এর আয়তন ৫,২৮৩ বর্গ কিলোমিটার। চট্টগ্রামের জনসংখ্যা প্রায় ৮১ লক্ষ,  যেখানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১৪৭২ জন মানুষের বসবাস।

বঙ্গোপসাগরের সীমানায় ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দর চট্টগ্রামের গুরুত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে আরো জোরদার ও আকর্ষনীয় করে তুলেছে।

দেশের সর্বমোট রপ্তানী বাণিজ্যের প্রায় ৭৫ ভাগ সংঘটিত হয় চট্টগ্রামের উপর দিয়ে। অন্যদিকে আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ ভাগ। রাজস্ব আয়েও চট্টগ্রামের ভুমিকা অপরিসীম। আমাদের মোট রাজস্ব আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ আসে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে।

এই চট্টগ্রামের রয়েছে হাজার বছরে গৌরবোজ্জল স্বর্ণালী ইতিহাস বৈচিত্রময়ী এই চট্টগ্রামের নামও বৈচিত্রে ভরা। সুপ্রাচীনকাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন পরিব্রাজক, ভৌগোলিক এবং পন্ডিতগণের লিখিত বিবরণে, অঙ্কিত মানচিত্রে, এখানকার শাসক গৌড়ের সুলতান ও রাজাদের মুদ্রায় চট্টগ্রামকে বহু নামে খ্যাত করেছিলেন।

এ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৪৮টি নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‌‌- সুহ্মদেশ, ক্লীং, রম্যভূমি, চাতগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চক্রশালা, শ্রীচট্টল, চাটিগাঁ, পুস্পপুর, চিতাগঞ্জ, চাটিগ্রাম ইত্যাদি।

সে সব নাম থেকে চট্টগ্রামের নাম উৎপত্তির সম্ভাব্য ও চট্টগ্রামের নামের সঙ্গে ধ্বনিমিলযুক্ত কিছু নামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি হলো।

  • চৈত্যগ্রাম: চট্টগ্রামের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অভিমত এই যে, প্রাচীনকালে এখানে অসংখ্য বৌদ্ধ চৈত্য অবস্থিত ছিল তাই এই স্থানের নাম হয় চৈত্যগ্রাম। চৈত্য অর্থ বৌদ্ধমন্দির কেয়াং বা বিহার। এই চৈত্যের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয় বলে চৈত্যগ্রাম নামের উদ্ভব হয়।
  • চতুঃগ্রাম: ব্রিটিশ আমলের গেজেটিয়ার লেখক ও’মলি সাহেবের মতে, সংস্কৃত চতুঃগ্রাম শব্দ থেকে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি। চতুঃ অর্থ চার। চতুঃ শব্দের সঙ্গে গ্রাম শব্দ যুক্ত হয়ে চতুঃগ্রাম হয়।
  • চট্টল: চট্টগ্রামের তান্ত্রিক ও পৌরাণিক নাম ছিল চট্টল। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন তন্ত্র ও পুরাণগ্রন্থে চট্টল নামের উল্লেখ দেখা যায়।
  • শ্যাৎগাঙ্গ: বার্ণোলী সাহেবের মতে আরবি শ্যাৎগাঙ্গ শব্দ বিবর্তিত হয়ে চট্টগ্রাম নামের উদ্ভব হয়েছে। শ্যাৎ অর্থ বদ্বীপ, গাঙ্গ অর্থ গঙ্গানদী। চট্টগ্রাম গঙ্গানদীর মোহনাস্থিত বদ্বীপ- প্রাচীন আরব বণিক-নাবিকদের এই ধারণা থেকে এর নামকরণ করা হয়েছিল শ্যাৎগাঙ্গ।
  • চাটিগ্রাম: সম্ভবত রাজোয়াং বর্ণিত উপরোক্ত চিৎ-তৌৎ-গৌং নামটি মধ্যযুগে বিবর্তিত ও সংস্কৃতায়িত হয়ে চাটিগ্রাম রূপ প্রাপ্ত হয়। গৌড়ের রাজা গণেশ দনুজমর্দন দেবের ১৩৩৯-১৩৪০ শকাব্দে ও রাজা মহেন্দ্র দেবের ১৩৪০ শকাব্দে চট্টগ্রামে তৈরি মুদ্রায় টাকশালের নাম চাটিগ্রাম উল্লেখ দেখা যায়। বাংলার সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্‌ ও সৈয়দ নাসির উদ্দিন নশরত শাহ্‌র আমলে কবীন্দ্র পরমেশ্বর বিরচিত পরাগলী মহাভারতে এবং বৈষ্ণব সাহিত্য চৈতন্য-ভাগবত প্রভৃতিতে চাটিগ্রাম নামের উল্লেখ রয়েছে।
  • চাটিগাঁ: চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত জনশ্রুতি থেকে জানা যায় যে, প্রাচীনকালে চট্টগ্রাম ছিল জ্বীনপরী অধ্যুষিত দেশ। পীর বদর শাহ্‌ এখানে আগমন করে অলৌকিক চাটির (মৃৎ-প্রদীপ) আলোর তেজের সাহায্যে জ্বীনপরী বিতাড়িত করার ফলে এই স্থানের নাম হয় চাটিগাঁ।
  • চতকাঁও/চাটগাঁও: চাটিগাঁর ফার্সি রূপ চতকাঁও বা চাটগাঁও। বাংলার সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ্‌র (১৩৮৯-১৪০৯ খ্রি.) ও সুলতান জালালুদ্দিন মোহাম্মদ শাহ্‌র (১৪১৮-১৪৩২ খ্রি.) মুদ্রায় চতকাঁও টাকশালের নাম উৎকীর্ণ দেখা যায়। ১৩৯৭ খ্রিস্টাব্দে লিখিত সুবিখ্যাত সুফি সাধক মুজাফফর শামস বলখির চিঠিতে চাটগাঁও নামের উল্লেখ দেখা যায়।
  • সুদকাওয়ান: আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্গত মরক্কোর অধিবাসী ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে বঙ্গ ও আসাম পরিভ্রমণ করেন। তিনি তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামকে সুদকাওয়ান নামে উল্লেখ করেন।
  • চাটিকিয়াং: চীন দেশ থেকে ১৪০৯, ১৪১২, ১৪১৫, ১৪২২ বা ১৪২৩, ১৪২৯ ও ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে মোট সাতবার বাংলার সুলতানদের দরবারে রাজদূত প্রেরিত হয়েছিল। তাদের লিখিত বিবরণে চট্টগ্রামকে চাটিকিয়াং রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
  • শাতজাম: তুর্কি সুলতান সোলায়মানের রেডফ্লিটের ক্যাপ্টেন সিদি আলী চেহেলভি ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে জাহাজযোগে ভারত মহাসাগরীয় দেশসমূহ পরিভ্রমণ করেন। এবং এ সময় তিনি আরাকান থেকে চট্টগ্রামের সমুদ্র উপকূল হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আগমন করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামের নাম শাতজাম নামে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
  • চার্টিগান: পরিব্রাজক রালফ ফিচ ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পরিভ্রমণ করেন। তাঁর লিখিত ভ্রমণকাহিনীতে চট্টগ্রামের নাম চার্টিগান রূপে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
  • জেটিগা: ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে ফ্যান্ডেন ব্রুক অঙ্কিত মানচিত্রে চট্টগ্রামের নাম জেটিগা রূপে লিখিত আছে।

পবিত্র এই অঞ্চলের মাটি সুদীর্ঘকাল ধরেই পীর-আউলিয়াদের সাধনপীঠ, এখানে রয়েছে  সকল ধর্মের মিলন ক্ষেত্রের পাশাপাশি কবিধাত্রী, বিপ্লবতীর্থ। রয়েছে অনেক দর্শনীয় স্থান যার মধ্যে- পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, সি আর বি, জাতিতাত্ত্বিক যাদুঘর, ওয়ার সিমেট্রি, ডিসি হিল,চেরাগী পাহাড়, বাটালি হিল, কোর্ট বিল্ডিং, হযরত শাহ আমানত (র:) এর মাজার, হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (র:) এর দরগাহ, চন্দ্রনাথ পাহাড় , বাঁশখালী ইকোপার্ক, পারকি সমুদ্র সৈকত, নেভাল, গোল্ডেন বিচ, কর্ণফুলী হারবার, মিলিটারি একাডেমি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সহ আরো কত কি।  

মোট কথা চট্টগ্রামের সৌন্দর্য্য বলে বুজানোর মত নয়। যে কেও বিমোহিত হতে পারে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে, সব খানেই আছে নৈসর্গিক রুপ যা ঢেলে সাঁজাতে প্রকৃতি কিঞ্চিৎ কার্পণ্য করেনি।

চট্টগ্রামের আবাহাওয়া ও খুবি চমৎকার,  এই অঞ্চলের বার্ষিক গড় আপমাত্রা ৩৩.৮ সেলসিয়াস ও সর্বনিম্ন ১৪.৫ সেলসিয়াস। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ৩,১৯৪ মিলিমিটার পর্যন্ত হয়।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ – কক্সবাজার থেকে টেকনাফ

Footprint Admin

লোকপূরাণ -বেহুলা লক্ষ্মিন্দরের কাহিনি অজানা সব তথ্য

ABDULLA AL MENON

কর্ণফুলীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিন?

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: