Now Reading
বাঙালীর শেকড় সন্ধান



বাঙালীর শেকড় সন্ধান

বাংলা নব বর্ষ কি ভাবে এলো বা বাংলা সন অর্থাৎ বঙ্গাব্দ কখন কিভাবে প্রবর্তিত হয়েছে, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও তবে ধারণা করা হয় বাংলা সন গণনার সময়পর্ব থেকেই বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির শুভ সূচনা হয়েছে। বাংলা সনের প্রবর্তন কে বা কারা করেছেন, কোন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তা এখনো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মাঝে এ বিষয়ে ভিন্নমত ও বিতর্ক রয়েছে। তবে সভ্যতার শুরু হতেই বাঙালিরা বিচ্ছিন্নভাবে দিনটি পালন করত বলে বিভিন্ন গবেষক তাদের গ্রন্থে উল্ল্যেখ করেছেন। ধারণা পাওয়া যায়, মোঘল আমলে দিন তারিখ গণনা করা হতো হিজরি (সাল) ধরেই। তৎকালীন বাংলায় মোঘলদের খাজনা আদায়ে নানা রকম জটিলতা দেখা দিত কেননা মোঘল সাম্রাজ্যাধীন হওয়ায় বাঙ্গালীদের সাথে মোঘলরা কোন ভাবেই হিজরি সালের সাথে দিন তারিখের হিসাব মেলাতে পারতনা। পর্যায়ক্রমে এসেছে জ্যোতিষশাস্ত্র যার মাধ্যমে মানুষ দিন, মাস, বছর গণনায় পারদর্শী হয়েছে। সম্রাট আকবর জ্যোতিষবিদ আমির ফতেউল্লাহ্ সিরাজিকে দিয়ে হিজরি সনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ‘তারিখ-ই-ইলাহি’ উদ্ভাবন ও প্রচলন করেন বলে জানা যায় যা পরবর্তীতে বঙ্গাব্দরূপে প্রবর্তিত হয়েছে।

পহেলা বৈশাখ দিনটি বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতির দিন হিসেবে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে কৃষি উৎপাদন সম্পর্কিত এবং ঋতুভিত্তিক। সভ্যতার এই বিবর্তনের সাথে সাথে ঋতুরাজির আবর্তন-বিবর্তনের ধরন সংক্রান্ত জ্ঞান মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। আর পহেলা বৈশাখ বছরের প্রথম দিন হিসেবে ধার্য হয়ে আসছে বাঙালি ইতিহাসের সেই অতীত থেকে। মজার বিষয় হলো ইংরেজি বর্ষ শুরু হয় রাত ১২টা বাজার পর থেকেই কিন্তু বাংলা সন সৌর বর্ষ অনুযায়ী হওয়াতে বাংলা নব বর্ষ শুরু হয় সুর্য্যদয়ের সাথে সাথে।

প্রচলনের শুরুতে নতুন বছরের প্রথম দিনেই জমিদারের রাজস্বের হিসাব সম্পাদন করে নতুন করে হালখাতার হিসেব খোলা হতো । প্রজারা জমিদার বাড়ীতে তাদের বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে এসে মিষ্টি মুখ করে যেত। সেই রীতি এখনো পর্যন্ত চলছে তবে জমিদার যুগ এর বিলুপ্তি ঘটলেও এই প্রচলনটি ব্যবসায়ীরা এখনো ধরে রেখেছেন। লাভ-ক্ষতি ও দেনা-পাওনার হিসেব চুকিয়ে পুরোনো খাতার ইতি টেনে যে নতুন খাতার সূচনা করেন তার নামই হালখাতা। হাল’ এর অর্থ হচ্ছে নতুন বা চলতি।

বর্তমান সময়ে বাঙালী আজ বহুবর্ণিল রুপে যেভাবে নববর্ষ উৎসব উদযাপন করছে মূলত তা গ্রাম বাংলার নারীদের সাজসজ্জ্যা থেকে অনুপ্রাণিত বা এর বিশেষত্ব নিয়েই জাগ্রত। এছাড়াও লোকসংস্কৃতির যে অনুষ্ঠানাদি এখন পহেলা বৈশাখে উপস্থাপন করা হয় তা গ্রাম বাংলারই সংস্কৃতির রূপবৈচিত্র।নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশের সকল প্রান্তে মঙ্গল শোভা যাত্রা ও বৈশাখী মেলা সহ নানান আয়োজনে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালীর এক  মহামিলনের সম্মীলন ঘটে এই দিনে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন বসে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা যা পরবর্তীতে নববর্ষ উৎসবের সাথে একীভূত হয়ে বাঙালীর জাতীয়তা বোধের তৃপ্তি বাড়ায়।

পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বাঙালী পালন করে তার হাজার বছরের ঐতিহ্য। যেখানে প্রতিফলিত হয় তার জাতিসত্তা ও অনুভূতি।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment