Now Reading
মমতাময়ী মা’ই আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন



মমতাময়ী মা’ই আমার বেঁচে থাকার অক্সিজেন

পৃথিবীতে মা ডাকটির মত মধুর কোন শব্দ আর আছে বলে আমার জানা নেই। ব্যাক্তিগতভাবে আমার মা আমার কাছে একজন বাবাও। জন্মের ১মাস ১০দিনে আমি আমার পিতাকে হারিয়েছি, তাই শৈশব হতেই দেখেছি মাকে আমার পিতা-মাতার দুই ভুমিকায় অবতীর্ণ হতে। একমাত্র সন্তান হিসেবে এ পর্যন্ত আমাকে নিয়েই তাঁর পথ চলা। আমার মা একজন স্কুল শিক্ষিকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে তিনি পুরোপুরি শিক্ষকতায় পেশায় জড়িয়েছেন নিজেকে। পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিএড ও এমএড সফলতার সাথে সমাপ্ত করেছেন তিনি। ছোট বেলা থেকেই দেখছি আমার মা একজন নির্লোভ, নিরহঙ্কারী, সাদামাটা জীবনে অভ্যস্থ নারী। তার এসব গুণাবলীর অনেকটাই আমার নিজের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যে স্বামী হারিয়ে মনোবল শক্ত রাখা মেয়েদের পক্ষে কতখানি সম্ভব আমার বোধগম্য নয় তবে আমার মাকে দেখে সে বিশ্বাস আমার জন্মেছে। আমি বিশ্বাস করতে শিখেছি, ইচ্ছার জোড়েই সব কিছু জয় করা সম্ভব। আমার মায়ের মন দৃঢ় রাখার প্রত্যয়ে তাঁর পিতা অর্থাৎ মামা বাড়ীর দাদুর পরামর্শে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়োজিত করেছেন তিনি। আমার শৈশবের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দিনের অধিকাংশ সময় মায়ের আদর-স্নেহ প্রাপ্তিতে কিছুটা ব্যত্তয় ঘটেছে। এর কারন ঐ সময়টুকুতেই মা স্কুলে থাকতেন। যদিও আমার ছোট ফুপি সেই অভাব মোটেও বুজতে দেননি। আমার সেই সব দিনগুলির কথা ভীষণ মনে পড়ে যায় যখন মা স্কুলে যেতেন তখন প্রতিদিন আমার গ্রামের বাড়ীর সম্মুখে দাড়িয়ে থেকে তাকে বিদায় জানাতাম। বাড়ীর সামনের ঘাঁটা থেকে সোজা বিস্তৃত রাস্তা ধরে মা হেঁটে যেতেন, কিছুদূর যাওয়ার পর একটা ডাল-পালা সমৃদ্ধ বাদাম গাছ তাঁকে চোখের আড়াল করে দিত। খুব খারাপ লাগত, উঁকি ঝুঁকি মারতাম যদি আরেকটু মাকে দেখা যেত। সেই সময়ের মনের অবস্থা এখনো মনে পরলে নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে আসে।

আমার মা না থাকলে হয়ত পৃথিবীর মায়া শৈশবে ত্যাগ করতাম। কথাটি বলছি এই কারণে, খুব ছোট থাকতে আমার প্রচণ্ড নিউমুনিয়া হয়েছিল। এলাকায় কোন অভিজ্ঞ কিংবা প্রশিক্ষিত ডাক্তার ছিলেন না। আমার মা এবং ছোট চাচা আমাকে কাঁথা মুড়িয়ে ১মাইল দূরের পার্শ্ববর্তী গ্রামে বুক সমান উঁচু জোয়ারের পানিতে মাথার উপরে তুলে দ্রুত নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করান। ডাক্তার সেসময় নাকি বলেছিলেন বাচ্চার কন্ডিশন খুব খারাপ, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছিল আমার। প্রায় ১০দিন সেই চিকিৎসকের বাড়ীতেই থেকে আমাকে সস্রুষা করে সারিয়ে আনেন। অবশ্য পরবর্তীতে চট্টগ্রাম শহরে অভিজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে মা আমাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলেন। এরকম কত স্মৃতি আমাকে আজো নাড়া দেয় তা বলে বুজানোর মত নয়। ছাত্রাবস্থায় একবার ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের মাথার আঘাতে আমার নাকের হাড় ভেঙে যায়। আমার মা দ্রুত শহরের নাম করা হাসপাতালে নিয়ে অপারেশনের ব্যবস্থা করেন। অপারেশন পরবর্তী টানা ২২দিন আমি আমার মায়ের কোলেই মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। আমি অনুমান বা বুজার চেষ্টা করছি কি কষ্টটাই না তাঁর হয়েছিল। এই লম্বা সময়ে একটা বারের জন্য মা আপত্তি করেননি তাঁর কোল থেকে আমার মাথা সরিয়ে দিতে। সত্যি বলতে কি মায়ের স্নেহ ভালবাসার দাম কতটুকু দিতে পারব জানিনা তবে এতটুকুই বলতে পারি পারতপক্ষে তাঁর অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করিনা।

আমার মা ভীষণ দৃঢ়চেতা মহিলা, অন্যায়ের সাথে কখনো আপোষ করেননি। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি হলেও অনেক বিষয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাবলীলভাবে মেনে নেয়ার উদার মানসিকতা পোষণ করতে দেখেছি তাঁকে। বেহিসেবি জীবন মোটেও পছন্দ করেননা আমার মা, তিনি এ ব্যাপারে শৈশব হতে আমাকে যথাযথ শিক্ষা দিয়েছেন। আমি সবসময় সে শিক্ষাকে পাথেয় করে চলার চেষ্টা করি। শৈশবে আমার স্কুলে নিজে গিয়ে আমার পড়ালেখার খোঁজ খবর রাখতেন মা। শৈশবে মাঠে খেলা করতে তিনি বাঁধা দিতেননা ঠিক কিন্তু সন্ধ্যা হওয়ার পূর্বে বিকাল ৫টায় ঘরে ফিরে না আসলে শাসনের কমতিও রাখেননি। মাঝে মাঝে মনে হয়- হয়ত আমার বেড়ে উঠা একটু অন্যরকম হতে পারত, হয়ত নিজেকে আজ অন্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতাম। কিন্তু কিসের জানি অজানা ভয় আমার মাকে তাড়া করেছে সবসময়। তাই সুযোগ থাকলেও অনেক কিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি। ছোট বেলা হতেই দেখেছি, দূরে কোথাও আমাকে ছাড়তে সবসময় আপত্তি ছিল মায়ের।

পরিবার পরিজনদের মতে আমার পিতার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিলনা, তিনি স্থানীয় ইউপি সদস্য থাকাকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়ে যখন এলাকার অবৈধ স্থাপনা ও ইটভাঁটা উচ্ছেদ করেন, তখন এলাকার অনেক প্রভাবশালীদের চক্ষুশূলে পরিণত হন। এর পরবর্তী সময় বাবা তাঁর শারীরিক অসুস্থতায় চট্টগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসা পরবর্তী যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছিলেন, তখন কিসের ইশারায় চিকিৎসকের ভুল তত্ত্বাবধানে তাঁকে মৃত্যু ঝুঁকিতে পড়তে হয়। বিয়ের এক বছর পার হতে না হতেই তাঁর বিয়োগে আমার মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পরার শামিল। একদম শূন্য থেকেই যেন মায়ের পথ চলা শুরু বলা যায়। আমার মায়ের মতনই আমার বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করেছেন এমনকি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যও নির্বাচিত হন। জড়িয়েছেন জাতীয় রাজনীতি এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে। বাবার এসব গুণাবলী আমার মায়ের অনুপ্রেরণা এবং চলার পথে সাহস জুগিয়েছে খুব। আমার মা তাঁর জীবনের স্বল্প আয়ের সঞ্চিত একটা অংশ ব্যয় করেছেন আমার প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা পিতা এবং ভাষা শহীদদের স্মরণে তাঁরই কর্মস্থল স্কুলে শহীদ মিনার নির্মাণে। নিজেদের শত অভাব অনটন লেগে থাকলেও আমার মাকে দেখেছি সমাজকর্মে তাঁর সামর্থ্যনুযায়ী অংশগ্রহণ করতে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণের শিক্ষক সমাজে আমার মায়ের গ্রহণযোগ্যতা প্রবল যার ফলশ্রুতিতে তারা তাদের মহিলা প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকেই বেচে নিয়েছেন। একাধারে আমার মা বাংলাদেশ স্কাউটস চট্টগ্রাম অঞ্চলের একজন উডব্যাজার এবং চট্টগ্রাম বোর্ডের একজন পরীক্ষক। আমার মাকে বই এর নেশা থেকে কখনোই আলাদা করা যায়নি এমনকি অবসর সময়েও তাঁর হাতে বই, পেপার কিংবা ম্যাগাজিন থাকবেই। ২০১৫সালের শুরুর দিকে মা এবং বড় চাচার ইচ্ছাতেই আমার বিয়ের কথাবার্তা পাকা হয় রাউজান উপজেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ের সাথে। কিন্তু সমস্যা বাঁধল এতে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যদের আপত্তি, কারন মেয়ের বাবা গত হয়েছেন ১০বছর পূর্বেই এবং ভদ্র মহিলার(আমার শাশুড়ি) এক মাত্র মেয়ে সন্তান ছাড়া আর কেউ নেই অর্থাৎ আমার মতই। পরিবারের অন্যরা চেয়েছে, পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছি অন্তত পুরুষ তান্ত্রিক একটা পরিবারের সাথে যেন সম্বন্ধটা হয়। আমার মা দৃঢ় কণ্ঠে বললেন এই মেয়েকেই আমি বউ করে নিয়ে যাব, যদি আমার ছেলে আজ মেয়ে হয়ে জন্মাত তবে তার ক্ষেত্রে কি হত? পরে অবশ্য সবাই তাদের ভুল বুজতে পেরে আমার মায়ের সিদ্ধান্তকেই স্বাগত জানিয়েছে। আসলে পিতা হারিয়ে মা নির্ভর হয়ে বেড়ে উঠা একজন সন্তানের বিষয়ে অনেকের অপ্রাপ্তির অনুমান থাকলেও আমার সেরকম কিছুই উপলব্দি হয়নি। সত্যি বলতে কি আমি বাবা নামক বিষয়টার উপর এখনো উপলব্দি স্থাপন করতে পারিনি। আমি বুজতে শিখেছি আমার মা আমার সবকিছুই, তাঁকে ছাড়া একটা মুহূর্ত বেঁচে থাকার কথা কল্পনা করতে পারিনা। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার প্রার্থনা মায়ের সকল বিপদ যেন আমার উপর দিয়ে দেন, বিনময়ে তাঁকে নিরাপদ এবং সুস্থ রাখেন আজীবন। ভালবাসি মা, দীর্ঘজীবী হউন

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment