চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তির অগ্রগতি নাকি ঝুঁকি!

Please log in or register to like posts.
News

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলতে কি বুঝানো হচ্ছে তা একটু জানা প্রয়োজন। কেনই বা এই বিষয়টি নিয়ে সবার এত মাতামাতি এবং আগ্রহ। তবে সহজ অর্থে এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বলতে ডিজিটাল বিপ্লবকেই ধরা হচ্ছে। আর এই ডিজিটাল বিপ্লবকেই কেনবা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলা হচ্ছে তা নিয়েও অনেকের আগ্রহ চরম মাত্রায়। এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হয়েছিল রাজনৈতিক নেতা, উদ্যোক্তা, বহুজাতিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশ্লেষকেরা। সেখানে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আর এই ডিজিটাল শিল্পবিপ্লবকে নিয়ে সেখানে হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ। কেননা বর্তমান বিশ্ব একটা সংকটময় মুহূর্ত পার করছে যার মধ্যে বৈষম্য অন্যতম। প্রায় প্রত্যেক দেশের মধ্যেই সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এই গতি অব্যাহত আছে। পুঁজিবাদ ক্রমশ গ্রাস করে চলেছে বিশ্বকে। আর এই পুঁজিবাদ এ পর্যন্ত অতিক্রম করেছে চারটি শিল্পবিপ্লব। মানবসভ্যতার ইতিহাসে বিগত তিনটি শিল্পবিপ্লব আমূল পরিবর্তন এনেছে বিশ্বের গতিপথে। প্রথম শিল্পবিপ্লব হয়েছিল ১৭৮৪ সালে তখন বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার সারা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। তার প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ আবিস্কার মানুষকে দিয়েছিল আলোকিত বিশ্ব এবং সাথে সাথে পণ্যের বহুল উৎপাদন বিশ্বকে পৌঁছে দেয় নতুন এক মাত্রায়। ১৯৬৯ সালে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। সে সময় বলা হয়েছে এই ইন্টারনেটই পরবর্তী ৪র্থ বিপ্লবকে বেগবান করবে, সে ধারণা এখন বাস্তবতায় রুপ পাচ্ছে। তবে আলোচনার পূর্বের তিনটি বিপ্লবকে ছাড়িয়ে যেতে পারে এই ডিজিটাল বিপ্লব অর্থাৎ যাকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব হিসবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন সারা দুনিয়ায় রীতিমত তোলপাড় চলছে। রোবটিকস দ্বারা নিরাপত্তা, কারখানার বিপদজনক কাজ, স্থাপনার শ্রমিক, কিংবা স্রেফ নিরাপত্তা প্রহরী বা গৃহস্থালি কাজ সব কাজই করবে এই রোবট। এই বিপ্লব মূলত প্রযুক্তির বিপ্লব যা পৃথিবীর মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে এক ধাপেই ১০০ বছর সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। প্রযুক্তির উৎকর্ষতাকে কাজে লাগিয়ে পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হবে শিল্প-অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রই। এই পরিবর্তন বিশ্বের সকল মানুষের জীবন মান উন্নত করবে এবং আয় বাড়াবে সব শ্রেণির মানুষেরই। আসুন এই ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব আমাদের জীবনে কেমন প্রভাব রাখছে তা একটু দেখি। ডিজিটাল বিপ্লবের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ এখন ইন্টারনেট অফ থিংস। বর্তমানে অনেকের বাসার সকল আসবাবপত্র ও স্থাপনা ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত। আর আমরা এই সকল ডিভাইসের মাধম্যে তা নিয়ন্ত্রণ করি-এই সিস্টেমকেই বলা যায় ইন্টারনেট অফ থিংস। এছাড়াও বিদ্যুতের বিল ও গ্যাসের বিল এখন আর স্বশরীরে গিয়ে দিতে হয় না এবং এ নিয়ে আমাদের আর চিন্তাও করতে হচ্ছে না, বিলটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলে আসছে আমাদের স্মার্টফোনে এবং মোবাইল পে করেই তার সমাধান পাচ্ছি। বাসায় বাজার নেই ফ্রিজ খালি তা আপনা থেকেই জানিয়ে দেবে ফ্রিজ। শরীরের পুষ্টি উপাদানের স্বল্পতা তাও জানিয়ে দেবে এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিন! সুস্থতায় রোগ নির্মূলে আসবে কঠিন অসুখের প্রতিষেধক, আবিস্কার হবে নিরোগ জীন যার ফলে বংশগত রোগ আর বিস্তার ঘটবেনা। আর সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ অস্ত্রোপচার করতে ছুরিকাঁচি ছাড়া কম্পিউটারের দক্ষ হাতের বহুল ব্যবহার শুরু হবে এই বিপ্লবে। অটোমেশন পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে এখন, এই অটোমেশন কারখানার সবকটা মেশিন এমন একটি সিস্টেমের সাথে যুক্ত থাকবে যা স্বয়ংক্রিয় চালনা করবে এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও অত্ত্বাবধান করবে। ফলে বাঁচবে শ্রম ঘণ্টা ও খরচ, কমবে মানবিক ত্রুটি।

প্রতিটি শিল্প বিপ্লবের প্রাককালে মানুষের আশার সঞ্চার হলেও এর বিপরীতে নেতিবাচক অনেক প্রতিক্রিয়া তৎসময়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিজ্ঞানের সহায়তায় প্রতিটি শিল্প বিপ্লবই তার বিরাট আবিষ্কার ও পরিবর্তনের মাধম্যে মানুষের জন্য অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষ উপকৃত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি পরিবর্তন আবার মানুষের জন্য নিরঙ্কুশ সুখের কারন হয়নি। বরং সুখের বিপরীতে অনেক দুঃখ-দুর্দশাও তাকে গ্রাস করেছে। একেকটি শিল্পবিপ্লব একদিকে যেমন উন্নয়নের দ্বার উন্মোচন করেছে তেমনি বহু মানুষকে করে দিয়েছে বেকার ও অসহায়, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মধ্যে নিপতিত হয়েছে তারা।

বর্তমানে যে শিল্প বিপ্লবের তোড়জোড় শোনা যাচ্ছে তাতে ঝুঁকির মাত্রা অনেক বেশি। রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অধিক ব্যবহারের প্রতিযোগিতা চলছে। কিভাবে শিল্প কারখানা কিংবা অন্যান্য ক্ষেত্রে রোবট বা প্রযুক্তি ব্যাবহার করে শ্রম কম করা যায় তাই এখন মুখ্য। এদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটের ক্ষেত্রে পারিবারিক, নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব অনেকটা অকল্পনীয় হতে পারে। এর বিপরীতে বেকারত্ব, উন্মূল হওয়া, মজুরি হ্রাস ইত্যাদি ঝুঁকিতো থাকছেই। প্রযুক্তি বিপ্লব সরকারি সকল সেবাকে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসবে, আবার অন্যদিকে বিধ্বংসী মারণাস্ত্রের সহজলভ্যতা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেবে। নিরাপত্তা ঝুঁকির এ বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবই, সেই আশঙ্কাও হাতছানি দিচ্ছে।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ৪র্থ শিল্প বিপ্লব পৃথিবীতে আমূল পরিবর্তন আনবে। যোগাযোগব্যবস্থা আসবে অভাবনীয় উন্নত সংস্করণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য হবে সহজতর। সকল রাষ্ট্রের সরকার পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণে ডিজিটাল বিপ্লব আনবে বড় যুগপোযুগি পরিবর্তন।

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?