খেলাধূলা

কোন বিশ্বকাপ খেলা হয়েছে কোন ফুটবলে

বিশ্বকাপ শুরু হতে খুব বেশি দেরী নেই। পৃথিবীর শত কোটি মানুষের চোখ এখন রাশিয়া ফুটবল বিশ্বকাপ এর উপর। বিশ্বকাপের অনেকগুলো অনুষঙ্গের মধ্যে প্রধান হচ্ছে ফুটবল, খেলার এই মূল অনুষঙ্গ নিয়েই আজকের লেখা। বিশ্বকাপের প্রতিটি আয়োজনের সাথে থাকে বলের নতুনত্ব এবং উন্নত সংস্করণ। বিশ্বকাপের সেইসব বলের পেছনের গল্প ও বেশ ঐতিহ্যমণ্ডিত। বিশ্বকাপের শুরুর দিকে ব্যবহার করা ফুটবল খুব একটা উন্নত এবং দৃষ্টিনন্দন ছিল না। ধারাবাহিকতার ক্রমে পাল্টেছে ফুটবল, এসেছে তার উন্নত সংস্করণ। আর এসব উন্নত ফুটবল তৈরির জন্য যুগের পর যুগ চলেছে গবেষণা, কিভাবে একে উন্নত করা যায় সে প্রক্রিয়া এখনও অব্যাহত। ১৯৩০ সালের উরুগুয়ের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে আসন্ন রাশিয়া বিশ্বকাপ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে এই ফুটবল। ভিন্ন ভিন্ন নামে, ভিন্ন ডিজাইন ও রঙে, আধুনিক এবং খেলার সবচেয়ে উপযোগী করে প্রস্তুত করা হয়েছে এই ফুটবলকে।

 

চলুন জানা যাক কোন বিশ্বকাপে কোন বলটি দিয়ে খেলা হয়েছে:

১৯৩০ উরুগুয়ে, টি মডেল

 

এবং ১৯৩০ উরুগুয়ে, টিএনটো

 

১৯৩৪ ইতালি, ফেডারেল ১০২

 

১৯৩৮ ফ্রান্স, অ্যালেন

 

<<< ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ হয়নি>>>

 

১৯৫০ ব্রাজিল, ডুপলোট

 

১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড, সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন

 

১৯৫৮ সুইডেন, টপ স্টার

 

১৯৬২ চিলি, ক্র্যাক

 

১৯৬৬ ইংল্যান্ড, স্লেজেঙ্গার চ্যালেঞ্জ

 

১৯৭০ মেক্সিকো, টেলস্টার

 

১৯৭৪ জার্মানি, টেলস্টার ডারলেস্ট

 

১৯৭৮ আর্জেন্টিনা, টাঙ্গো ডারলেস্ট

 

১৯৮২ স্পেন, টাঙ্গো স্পানা

 

১৯৮৬ মেক্সিকো, আজট্যাকা

 

১৯৯০ ইতালি, এতরুসকো উইনিকো

 

১৯৯৪ যুক্তরাষ্ট্র, কুইস্ট্রা

 

১৯৯৮ ফ্রান্স, ট্রিকোলোর

 

২০০২ দক্ষিণ কোরিয়া/জাপান, ফেভারনোভা

২০০৬ জার্মানি, টিমগেইস্ট

২০১০ দক্ষিন আফ্রিকা, জাবুলানি

২০১৪ ব্রাজিল, ব্রাজুকা

২০১৮ রাশিয়া, টেলস্টার ১৮

তবে বিশ্বকাপ ফুটবল তৈরিতে দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে ক্রীড়া সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস। জার্মান এই কোম্পানিটি ১৯৬৩ সাল থেকে ফুটবল তৈরি করে আসছে। আর ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের জন্য বল তৈরির দায়িত্ব পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির উপর, এরপর থেকে তারা এখনো পর্যন্ত টানা বল তৈরি করেছে ফিফার জন্য। রাশিয়া বিশ্বকাপে অ্যাডিডাস এবার তৈরি করেছে টেলস্টার ১৮ নামের বল। যদিও বিগত বছর গুলোতে দেখা গেছে আয়োজক দেশের ঐতিহ্যের ছাপ রাখা হত বিশ্বকাপের বলের নাম ও ডিজাইনে। যেমন, ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে ‘জাবুলানি’ এবং ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে ‘ব্রাজুকা’ বল যার ডিজাইন সেইসব দেশের ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্য। কিন্তু এবার আর সে ধারা বজায় রাখেনি অ্যাডিডাস। তারা ফিরিয়ে এনেছে ৪৪ বছর পূর্বের ১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে ব্যবহার করা সেই সাদা-কালো টেলস্টারকে। রাশিয়ার রঙিন ক্যানভাসে আয়োজিত বিশ্বকাপের এই বলটির অফিসিয়াল নাম দেয়া হয়েছে ‘টেলস্টার ১৮’।  আধুনিকতা আর প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে এর কালো প্যানেলে যুক্ত হয়েছে পিক্সেল, আর ভেতরে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে উন্নত প্রযুক্তির চিপ। মূলত টেলস্টার তৈরির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঐতিহাসিক বলটিকেই নতুন করে ফিরে এনেছে অ্যাডিডাস। সেই ১৯৬৮ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম উন্মুক্ত করা হয় টেলস্টার বলকে। তারপর ১৯৭০ এবং ১৯৭৪ বিশ্বকাপেও এই বল দিয়ে খেলা হয়েছে । অ্যাডিডাস যুগের আগ পর্যন্ত স্বাগতিক দেশই বল সরবরাহ করতো। ১৯৭০ এর পূর্বের ৮টি বিশ্বকাপে যে বল দিয়ে খেলা হয়েছে চলুন জেনে নিই তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসওঃ

১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপে খেলা হয়েছে “টি মডেল” নামক বল দিয়ে। সত্যি বলতে কি ঐ বিশ্বকাপে কোন অফিসিয়াল বল ছিল না। ফাইনাল শুরুর আগে দুই ফাইনালিস্ট উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনার মধ্যে তর্ক বেঁধে যায় কারা বল সাপ্লাই দেবে। তবে মজার ব্যাপার হল সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে দুইটি ভিন্ন বল দিয়েই খেলা হয়েছিল। ফাইনালের প্রথম অধ্যায়ে আর্জেন্টিনার পছন্দ করা বল “টিএনটো” দিয়ে এবং দ্বিতীয় অধ্যায়ে উরুগুয়ের পছন্দ করা বল “টি মডেল” দিয়ে খেলা হয়েছে। যদিও বল দুটি দেখতে একই সাদৃশ্যের ছিল। ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত আর সেরকম নজীর স্থাপন হয়নি।

শুরুর দিকে যদিও ইংল্যান্ড বেশিরভাগ বল তৈরির অধিকারী ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আরো কিছু দেশ ফুটবল তৈরি শুরু করে। ১৯৩৪ সালে আয়োজিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপে স্বাগতিক ইটালি দাবি করে বিশ্বকাপের বল তারাই তৈরি করবে। সেই অনুযায়ী ‘ফেডারেল ১০২’ নামে ১৩টি প্যানেলের বল সরবরাহ করে স্বাগতিক ইটালি। ১৯৩৮ সালে স্বাগতিক ফ্রান্স তৈরি করে ‘অ্যালেন” নামের বল। প্যারিস কেন্দ্রিক অ্যালেন হচ্ছে প্রথম প্রতিষ্ঠান যাদেরকে নিজেদের ব্র্যান্ডের বল তৈরির অনুমতি দেয়া হয়। বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ এবং ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ আয়োজিত হয়নি। দীর্ঘ ১২বছর পর পুনরায় আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপ।

১৯৩০ সালে আর্জেন্টাইন কোম্পানি তোসোলিনি ফুটবল তৈরিতে ব্রেক থ্রু নিয়ে আসে। তারা এমন একটি বল তৈরি করে, যার ভেতরে থাকত আরেকটা আচ্ছাদন বা থলি। সেই থলিতে বাতাস প্রবেশ করালেই তৈরি হত বলের প্রকৃত আকৃতি। শুরুতেই এই বলটি বিশ্বকাপের উপযুক্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি ফিফা, এতে তারা সময় নিয়েছে প্রায় ২০বছর। এই ধরণের বল নিয়ে নানান গবেষণার পর শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফিফা ‘ডুলপোট’ নামের ওই বলটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়।

শুরুর দিকের বলগুলোতে ছিলো ১২ থেকে ১৩টি প্যানেল। কিন্তু ১৯৫৪ সালের সুইজারল্যান্ড বিশ্বকাপে প্রথম ব্যবহার করা হয় “সুইস ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন” নামের ১৮ প্যানেলের বল। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ১০০টি বলের মধ্যে ট্রায়ালের মাধ্যমে বল নির্বাচন করে ফিফা। সেই বিশ্বকাপে স্বাগতিক সুইডেনের কোম্পানি সিডসভেন্সকা লিডারোস রেমফাব্রিকেন-র তৈরি ‘টপ স্টার’ বলটি নির্বাচিত করা হয়। টপ স্টার বলটির বিশেষ গুণ ছিল এর উপরিভাগ মসৃণ এবং জলরোধক। প্রথম বিশ্বকাপের পর থেকে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে নিখুঁত উন্নত মানের ফুটবল তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চলেছে। শেষ পর্যন্ত কাঙ্খিত আলোর মুখ দেখাল অ্যাডিডাস।

১৯৭০ সালে অ্যাডিডাস এর তৈরি বিশ্বকাপের বলটি প্রথমবারের মতো নাম পেল ‘টেলস্টার’ নামে। ৩২টি বিশেষ লেদার প্যানেল দ্বারা তৈরি বলটির বিশেষত্ব অনেক যার ফলে নতুন যুগে প্রবেশ করল বিশ্বকাপের বল। তখনকার সময় রঙিন টেলিভিশন ছিলনা সাদাকালো টিভিই ছিল মানুষের ভরসা। ১২টি কালো প্যানেল বাকি সাদা প্যানেলগুলির সমন্বয়ে তৈরি টপসটার বলটি সাদাকালো টেলিভিশনে সুস্পষ্ট দেখা যেত। ‘টেলস্টার’ নামটিও এসেছে মূলত ‘টেলিভিশন’ এবং ‘স্টার’ শব্দ দুটি থেকে। ৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপই প্রথম টিভিতে সম্প্রচারিত বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা।

১৯৭৪ সালের জার্মানি বিশ্বকাপেও খেলা হয় ‘টেলস্টার’ এর পরবর্তী ভার্সনে। বলটির অফিসিয়াল নাম ছিলো ‘টেলস্টার ডারলেস্ট’। এরপর টেলস্টারের জায়গা নেয় ‘ট্যাঙ্গো’, যা দিয়ে খেলা হয়েছে পরপর দুটি বিশ্বকাপ। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা এবং ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে ট্যাঙ্গো বলটি বেশ দক্ষতা দেখায়। ৮০ এর দশকে এবং পরে যারা ফুটবল দেখেছেন বা খেলেছন তাদের এই বলটি চিনতে মোটেও ভুল হবার কথা নয়। এটিই সম্ভবত পূর্বের বিশ্বকাপগুলোতে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল হিসেবে এখনো চিহ্নিত।

এরপর মেক্সিকো, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি বিশ্বকাপে পর্যায়ক্রমে আধুনিক থেকে আধুনিকতর বল তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। যারমধ্যে কিছু হয়েছে প্রশংসিত আর কিছু সমালোচিত। সর্বশেষ ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য তৈরি ‘ব্রাজুকা’ নিয়েও ছিল কিছু সমালোচনা।

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে সমালোচিত বল ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের ‘জাবুলানি’। ফুটবল সংশ্লিষ্ট প্রায় সব পক্ষ থেকেই এসেছিলো সমালোচনা। বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া তারকা ফুটবলারদের মধ্যে অনেকেই দাবি করেছিলেন, খেলার মাঠে বলটির গতিবিধি অস্বাভাবিক যা তাদের বুজতে বেশ অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এডিডাস মনযোগী হয় কিভাবে একটি নিখুঁত বল তৈরি করে খেলোয়াড়দের পছন্দের করা যায়।

তবে এবার আর কোনো সমালোচনা নয়, নয় কোন দেশ কিংবা ঐতিহ্যের ছাপ। রাশিয়াতে নিজেদের সেই জনপ্রিয় বল টেলস্টারকেই ফিরিয়ে আনছে অ্যাডিডাস। তবে নতুন চেহারা ও উন্নত প্রযুক্তিতে বলটিকে তারা করেছে অসাধারণ। আর এই “টেলস্টার ১৮” বলটির মাধ্যমে প্রথমবার লাখো কোটি ফুটবলপ্রেমীর নজর কেড়েছিল। এখন মাঠেই দেখার পালা এই উন্নত সংস্করণের নতুন বলটি কেমন আচরণ করে, “টেলস্টার ১৮” পারবে কি খেলোয়াড়দের পছন্দের জায়গা করে নিতে!

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

মাশরাফির টি-টোয়েন্টি বিদায়! বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টিতে ভবিষ্যৎ

Rakiiib Al Hasan

একজন মিসবাহ উল হক

২০১৮ ফুটবল বিশ্বকাপের হালচাল

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: