আন্তর্জাতিক কেইস স্টাডি

“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

ইংরেজি ‘Cold War’ শব্দের বাংলায় বিভিন্ন প্রতিশব্দ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ‘ঠাণ্ডা লড়াই’, ‘স্নায়ু যুদ্ধ’, ‘শীতল যুদ্ধ’, ‘প্রচার যুদ্ধ’ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে “কোল্ড ওয়ার” বা ঠাণ্ডা লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর বিশ্বরাজনীতির চালিকাশক্তি ছিল এই ঠাণ্ডা লড়াই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্ধ ইত্যাদি সবকিছুই এই ঠাণ্ডা লড়াইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। মূলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব রাজনীতি ও ঠাণ্ডা লড়াই অনেকটা সমার্থক হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, উত্তেজনা ও দ্বন্ধ সব কিছুর মূলে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল ঠাণ্ডা লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর পৃথিবীতে যুগপৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের “পরাশক্তি” বা “Super Power” হিসেবে আবির্ভাব ঘটে। উভয়ের মধ্যকার উত্তেজনার সময়কে ঠাণ্ডা লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো এটি। এই দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে স্বীয় কূটনৈতিক তথা অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণা শক্তির মাধম্যে ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং পৃথিবীকে দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে একটি যুদ্ধোদ্দ্যম অবস্থার সৃষ্টি করে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ঠাণ্ডা লড়াই মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা “Psychological War” যা দুটি বিরোধী মতাদর্শগত দ্বন্ধ থেকে উদ্ভূত। এ দ্বন্ধের অর্থ ছিল সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে একে অপরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কলা-কৌশলগতভাবে পরাভূত করা। এ ঠাণ্ডা লড়াইয়ের দুই প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের স্বীয় প্রভাববলয় বা “Sphare of Influence” বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে নব্বই দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এভাবে “যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়” সাধারনত এ ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় ‘Cold War Relationship’। কাজেই ঠাণ্ডা লড়াই ছিল দুই জোটের মধ্যে এমন একটি যুদ্ধোন্মাদ সম্পর্ক, যে সম্পর্ক যুদ্ধ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। উল্লেখ্য যে, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ইঙ্গিত আমরা পাই উইনস্টন চার্চিলের ১৯৪৬সালের ৫মার্চ ওয়েস্ট মিনিস্টার কলেজের এক বক্তৃতার মাধম্যে। অবশ্য চার্চিল সরাসরি ‘Cold War’ কথাটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে মৈত্রীর বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল তা অবলুপ্ত হতে চলেছে। তার পরিবর্তে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ, হিংসা ও অবিশ্বাস। চার্চিল ছাড়া অন্য একজন Cold War শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি হলেন বার্নাড বারুচ, যিনি মূলত একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাউথ ক্যারোলাইনা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে তিনি বলেছিলেন, “Let us not be deceived- today we are in the midst of the Cold War”- তবে আমেরিকার ওয়াল্টার লিপম্যান এই Cold War শব্দটি সংবাদপত্রে প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৪৭সালে। এ শব্দের মাধম্যে তিনি আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে চেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল বেশ সন্দেহ ও ভীতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই “ঠাণ্ডা লড়াইকে” কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের কতকগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট উল্ল্যেখযোগ্য। যেমনঃ

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিদন্ধিতাই হচ্ছে এ যুদ্ধের মূল কথা। আর ঠাণ্ডা লড়াইয়ের রাজনীতিকে ‘Bipolar Politics’ বা দ্বিপক্ষীয় রাজনীতিও বলা হয়।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করতে বিশেষভাবে সচেষ্ট হয়।

৩. উভয় পক্ষই ‘স্নায়ু যুদ্ধ’ সম্বন্ধে তাদের নীতিকে রাজনৈতিক মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ পরিচালনা করে। অপরদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে ঠাণ্ডা লড়াই পরিচালনা করে। তার ফলে এটি অনেক পরিমাণে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ এর রুপ ধারণ করে এবং উভয় পক্ষই প্রচারনার উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করে।

৪. ঠাণ্ডা লড়াইয়ে দুপক্ষই যথা সম্ভব সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো সত্ত্বেও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বিরত থাকে। এ লড়াইকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে দুপক্ষের বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হলেও উভয় পক্ষই  যুদ্ধকে সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য চেষ্টা করে।

৫. ঠাণ্ডা লড়াই মূলত সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে যা পূর্ব ও পশ্চিম এ দুটি বিবাদমান শিবিরে বিভক্ত। এবং সমগ্র বিশ্ব এক অনভিপ্রেত যুদ্ধের চাপে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

যে কারণে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সূত্রপাতঃ

প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যেসব অঞ্চলে বিভিন্ন মিত্রশক্তি প্রবেশ করে তারা সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের আদিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সদ্ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়। অপরদিকে যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে সোভিয়েত ভীতি বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের সাথে চুক্তি স্থাপন করে সোভিয়েত বিরোধী এক জোট সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, আদর্শগত সংঘাতও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্ম দেয়। আমেরিকা তথা পশ্চিম বিশ্বের ধনবাদী আদর্শ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দ্বন্ধ এ ক্ষেত্রে উল্ল্যেখযোগ্য।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়, অস্ত্রসজ্জার খেত্রেও এটা দেখা যায়।

চতুর্থত, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস এই মনস্তাত্ত্বিক কারণের জন্যও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকান মনোভাব উভয়ের মধ্যে একধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল।

পঞ্চমত, তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীন জাতিগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার খাতিরে বৃহৎ শক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় থাকতে চেয়েছিল। এই নেতৃত্ব লাভের জন্য আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং ঠাণ্ডা লড়াই দেখা দেয়।

[email protected]

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

অপূর্ব সুন্দর এবং রহস্যময় বন

কাঁদলে চোখ দিয়ে পানির বদলে ক্রিস্টাল ঝরে!

মহা মূল্যবান ক্রিপটোকারেন্সী বিটকয়েন যা স্বর্ণের চেয়েও দামী।

Md Salman Arefin Shimun

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: