মৃতদেহ সৎকার নিয়ে বিশ্বের কিছু অদ্ভুত রীতিনীতি

Please log in or register to like posts.
News

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে মৃতদেহ সৎকার নিয়ে রয়েছে নানান অদ্ভুত রীতিনীতি। এর বেশ কিছু যেমনই অদ্ভুত, তেমনই বীভৎসও বটে। বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী লোকজন এই নিয়ম-কানুন অত্যন্ত বিশ্বাস ও সম্মানের সাথে যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে, একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যার অনেকটাই বর্তমান। জীবনের সকল অনিশ্চয়তার মধ্যে, মৃত্যুই একমাত্র জিনিস, যা নির্দিষ্ট থাকে এবং জীবনে একবারই আসে। সকলেই জানে চিকিৎসা শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী সেই আদিকাল হতেই হয়ে আসছে আগে কিংবা পরে সকলকে একদিন মরতে হবে। সাধারণত আমরা ধর্মীয় এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে মৃত্যুর পর আমাদের মৃত দেহকে সমাধিস্ত করি। যাই হউক এই মৃত্যু পরবর্তী সারা বিশ্বে ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু অদ্ভুত রীতি নীতি পালনের মাধ্যমে মৃতদেহকে সমাধিস্ত করে, যাতে মৃত্যু পরবর্তী ব্যাক্তিটি পরপারে ভাল থাকে।

চলুন জেনে নিই তেমনি কিছু অদ্ভুত নিয়ম বা প্রথাঃ-

সতী দাহ প্রথাঃ এই প্রথা অনুযায়ী ভাষ্য, স্বেচ্ছায় একজন নারী তার স্বামীর মৃত্যুতে এক সঙ্গে সম চিতায় পুড়ে আত্মাহুতি দেয়। পৌরাণিক কাহিনীতে এমন আত্মাহুতির বহু উদাহরণ রয়েছে, যেমন মহাভারতে পাণ্ডুর দ্বিতীয় স্ত্রী মাদ্রী তার স্বামীর সঙ্গে স্বেচ্ছায় চিতার মধ্যে আত্মাহুতি দিয়েছেন৷ কিন্তু ইতিহাস পরবর্তী লক্ষ্য করা যায় এটা আদৌ স্বেচ্ছায় কোন আত্মাহুতি নয়, বরং জোর করেই স্ত্রীকে তার স্বামীর সঙ্গে দাহ করা হচ্ছে ৷ বিশেষ করে কোনও ধনী লোকের মৃত্যু হলেতো কথাই নেই, তাঁর সম্পত্তির দখল-আত্মসাৎ করতেই তার আত্মীয় স্বজনরা মৃত ব্যক্তির সদ্যবিধবা স্ত্রীকে জোর করে চিতায় পুড়িয়ে মারত ৷ জোর করে বিধবাকে সতী করতে যখন চিতায় তোলা হত তখন তার কান্নার আওয়াজকে চাপা দিতে জোরেশোরেই বাজানো হত ঢাক-ঢোল ও কাসড় ৷ খৃষ্টাব্দ ৪০০ বছর পূর্ব অর্থাৎ গুপ্ত সম্রাজ্যের বহু আগে থেকেই ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল বলে ইতিহাসে তথ্য পাওয়া যায়। তাছাড়া প্রাচীন এই সতীদাহ প্রথার বিভিন্ন উদাহারণ পাওয়া যায় সেসময়কার অন্তর্লিখিত স্মারক পাথরগুলিতেও। প্রাচীন এই স্মারক পাথরের সবচেয়ে বেশি দেখা মিলে মধ্য প্রদেশে, তবে সব চেয়ে বড় আকারের সংগ্রহ পাওয়া যায় রাজস্থানে। এই স্মারক পাথরগুলিকে সতী স্মারক পাথর বলা হতো যেগুলো পূজা করার বস্তু ছিল। বলা হচ্ছে হিন্দু সমাজ থেকে সতীদাহ প্রথা নির্মূল হয়েছে। এই দাবি পুরোপুরি সত্য নয়। কেননা আধুনিক কালেও এর উদাহরণ পাওয়া যায়। তাই সঠিকভাবে বললে বলতে হবে, সময় ও পরিস্থিতির চাপে পড়ে সতীদাহ প্রথা প্রায় বন্ধ হয়েছে। কারণ, আগে থেকেই ব্রাহ্মণ স্কলার ও প্রভাবশালী হিন্দুরা এই প্রথা বন্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায়, ধর্ম দিয়েও সতীদাহ প্রথাকে সমর্থন করা হয়েছে। ধর্মে এও বলা হয়েছে বলা প্রচার হয়, বিধবা নারীদের নির্বাণ লাভের জন্য সতীদাহ একটি পূণ্যের কাজ। কিন্তু কালে কালে সেই প্রথার বিনাশ ঘটেছে। সতীদাহ প্রথাকে যেহেতু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পূণ্যের কাজ মনে করা হয় সেহেতু এ’রকম একটি প্রথাকে অল্প সময়ে বা চাওয়া মাত্রই নির্মূল করা বাস্তবে সম্ভব নয়। তবে মুঘল সম্রাটরা ধাপে ধাপে এই প্রথা নির্মূলের কাজ অনেকটাই প্রশস্ত করেছিলেন। এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হয়েছিল। ইউরোপীয় পর্যটকদের লিখিত দলিল ও বক্তব্য অনুযায়ী আওরঙ্গজেবের শাসনামলের শেষের দিকে সতীদাহ প্রথা একেবারে কমে যায়।

সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম বারের মতো পদক্ষেপ নেন সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক। এর পর একে একে সম্রাট হুমায়ূন, আকবর, শাহজাহান, ও আওরঙ্গজেব সতীদাহ প্রথা বন্ধের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেন। বৃটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতে সতিদাহ প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়। অবশ্য এ আইনী কার্যক্রম গৃহীত হয়েছিল মূলতঃ রাজা রামমোহন রায়ের সামাজিক আন্দোলনের জন্যেই। তিনি প্রমাণ করে দেন এবং প্রচার করেন যে, এই প্রথা কেবল অমানবিকই নয়, পরন্তু অশাস্ত্রীয় ও আইনবিরুদ্ধ। সেই সময় বেঙ্গলের গভর্ণর ছিলেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিংক, তিনি রামমোহনের যুক্তির সারবত্তা অনুভব করে আইন পাশে উদ্যোগী হন। যদিও এই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে হিন্দু সনাতনপন্থীরা লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলে মামলা করেছিলেন। তবে প্রিভি কাউন্সিল ১৮৩২ সালে বাংলার শাসক লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের ১৮২৯ এর আদেশই বহাল রাখে।এরপর খুব অল্পসময়ের মধ্যে ভারতের অন্যান্য কোম্পানি শাসিত অঞ্চলেও সতীদাহ প্রথাকে বাতিল ঘোষণা করা হয়৷

 

ভাইকিংসদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াঃ জল দস্যুদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এবং সমধিস্ত করার রীতি নীতি গুলো তাদের পৌত্তলিক বিশ্বাসে মারাত্মক প্রভাবিত ছিল। তারা বিশ্বাস করত যে, মৃত্যুর পর দস্যু উপজাতির ৯টির মধ্যে একটি হয়ে পুনরায় তাদের নেতৃত্ব দেবে। আর এই কারনেই তারা মৃতদেহ পরপারে পাঠাতে কঠোরভাবে চেষ্টা চালায় যেন ভালভাবে পৌঁছে। তাই তারা সাধারনত এমনভাবে তাদের অন্তস্তিক্রিয়া অনুষ্ঠানগুলি করত যেন রীতি নীতির ব্যত্তয় না ঘটে। দস্যু বা ভাইকিংদের রাজার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান ছিল বেশ অদ্ভুদ এবং উদ্ভট। তাদের রাজার মৃত্যুর পর এমন এক অনুষ্ঠানের মাধম্যে রাজার দেহটা ১০দিনের জন্য অস্থায়ী একটি জায়গায় সমাধিস্থ করা হয় যেন তার পোশাক পরিবর্তন করা যায়। আর এই সময়ের মধ্যে তার ক্রীতদাস নারীদের মধ্যে এমন একজনকে নির্বাচন করা হয় যাকে বিভিন্ন রীতি ও আচারের মাধ্যমেই তার সাথেই সমাধিস্থ করা হয়েছে, উদ্দেশ্যে ছিল পরপারে রাজার সেবা যত্ন করা। প্রচুর পরিমাণ এলকোহল সঙ্গে নিয়ে ক্রিতদাসি দিন রাত রাজার মৃতদেহটি পাহারা দিয়ে রেখেছিল। যখন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল তখন সেই ক্রীতদাসীকে গ্রামের প্রত্যেক পুরুষের সঙ্গে ঘুমাতে হয়েছে। তারপর শেষে একটি দড়ি গলায় পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে গ্রাম্য কর্ত্রী দ্বারা তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর দস্যুরা তাদের রাজার মৃত দেহ এবং সেই ক্রীতদাসীর মৃত দেহ একটি কাঠের তৈরি জাহাজে করে আগুন লাগিয়ে ভাসিয়ে দিয়েছে। আর এভাবেই বহুবছর যাবত ভাইকিংসদের এই জঘন্য নিয়ম রীতি চর্চা হয়েছিল।

 

দানি জনগোষ্ঠীঃ পাপুয়া নিউগিনির দানি জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে যে দুঃখমুক্তির জন্য মানসিক এবং শারীরিক ব্যাথা অপরিহার্য। সেই জনগোষ্ঠীর এমন এক মহিলাকে পাওয়া যায়, যে তার হাতের বেশিরভাগ আঙ্গুল কেটে ফেলেছেন পরিবারের সদস্য ও সন্তান হারানোতে। আর যুগের পর যুগ ধরে এই সংস্কৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে ইন্দোনেশিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির দানি উপজাতি গোষ্ঠি। প্রিয়জন বিয়োগে দানি উপজাতির নারীরা তাদের আঙুল কেটে ফেলেন। আঙুল বিসর্জনের এ ঘটনা তারা প্রিয়জনের প্রতি শোক ও সহমর্মিতা প্রকাশের পাশাপাশি অলৌকিক ক্ষমতার প্রতি নিজেদের আনুগত্যতার বহিঃপ্রকাশ দেখান। মৃতের আত্মার সন্তুষ্টির জন্য তারা এই অমানবিক প্রথাটি পালন করেন। পৃথিবীতে এখনো প্রায় আড়াই লক্ষ দানি উপজাতির মানুষ টিকে আছেন, যারা এ সংস্কৃতি বহু বছর ধরে রেখেছেন, যদিও রাষ্ট্র তাদের এই আঙুল কেটে ফেলার প্রথাকে নিষিদ্ধ করেছেন।

 

ফামাদিহানাঃ আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের দ্বীপরাষ্ট্র মাদাগাস্কারের আদিবাসীদের কাছে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের নাম ফামাদিহানা। মাদাগাস্কারের মালাগাছি উপজাতিরা এই প্রথাটি পালন করে প্রতি ৭ বছর বা এরকম সময় পর পর। ফামাদিহানা নামক এই প্রথায় পূর্বপুরুষের লাশ কবর থেকে তুলে এনে তাদের নতুন কাপড়ে মুড়িয়ে, কবরের পাশে গিয়ে উদ্দ্যেম নৃত্য করা হয়। আয়োজন করা হয় সঙ্গীতানুষ্ঠানের, দেয়া হয় পশু বলি এবং আগত অতিথিদেরকে আপ্যায়ন করা হয় বেশ খাতির এর সঙ্গে। পরিবারের বড়রা তাদের শিশুদের বুঝিয়ে বলেন, কবর থেকে তোলা মৃতদেহগুলোর পরিচয় এবং তাদের গুরত্ব ও সম্মান কতটুকু। ফামাদিহানা হচ্ছে তাই একটি উৎসবের মত যাতে পরিবারের পূর্ব পুরুষদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা দেখানো হয়। তারা বিশ্বাস করে যে, মৃত ব্যাক্তির দেহ সম্পূর্ণ পচে যাবার আগ পর্যন্ত তারা এই পৃথিবী ত্যাগ করে না এবং ততদিন পর্যন্তই তারা জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করতে সক্ষম। তাই মৃতদেহগুলো পুরোপুরি মাটির সাথে মিশে যাওয়ার আগ পর্যন্ত এই ফামাদিহানা উৎসবের মাধ্যমে তাদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা দেখানো হয়। অনুষ্ঠান শেষে পুনরায় কবর দিয়ে দেওয়া হয় মৃতদেহটিকে।

 

সাল্লেখানাঃ এটি  জৈনদের একটি রীতি যা সান্তাহারা হিসেবেও পরিচিত, এর অর্থ স্বেচ্ছায় অনশনে মৃত্যুবরণ করে নিজেকে মমিতে পরিণত করা। সাল্লেখানা এমন একটি সাধনা, যার মাধম্যে একজন সাধু আমৃত্যু উপোস করে থাকতেন এবং ঐ অবস্থায় কোন খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ না করেই মৃত্যুবরণ করতেন। বিশ্বাস করা হতো এতে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভ করা যায় এবং সহজে স্বর্গে যাওয়া যায়। সাল্লেখানা ১২পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এটি এমন এক ব্রত যা কঠোর সংযমের মাধম্যে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। বিতর্ক সত্ত্বেও, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ১০১৬ সালে সাল্লেখানার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। 

 

সাইলেন্স অব পার্সি টাওয়ারঃ পার্সিদের ধর্মীয় প্রথা অনুসারে, তাদের কোনো প্রিয়জনের মৃত্যু হলে তারা সেই মৃতদেহটির সৎকার করেন না। তারা এই মৃতদেহ কবর দেয়া কিংবা পুড়িয়ে ফেলার সংস্কারেও বিশ্বাসী নয়।  মূলত পার্সিয়ানরা জরথ্রুস্ট ধর্মে বিশ্বাসী। জরথ্রুস্টবাদে, পানি এবং আগুন হলো ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতিনিধি। তাই তাদের শুদ্ধিকরণের আচার-অনুষ্ঠানসমূহকে ধর্মীয় জীবনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পার্সিদের ঐতিহ্য অনুসারে মৃতদেহকে অপবিত্র ভাবা হয়। যার কারণে পানিতে মৃতদেহ ভাসিয়ে দেয়া বা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা তাদের ধর্মে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মৃতদেহকে কবর দেওয়া বা পোড়ালে প্রকৃতি দূষিত হয় বলে পার্সিদের গভীর বিশ্বাস। মৃতদেহকে খোলা আকাশের নিচে রাখা পার্সিদের আদিম রীতি। তাদের উদ্দেশ্য চিল-শকুন কিংবা অন্যান্য মাংসাশী প্রাণী যাতে মৃতদেহটি ছিঁড়ে খেতে পারে, তাই খালি নিরিবিলি জায়গায় খোলা আকাশের নিচে রেখে দেয়া হত সেটি। পার্সিরা যে খোলা স্থানটিতে মৃতদেহ রেখে দিত, সেই সৎকারের জায়গাটিকে বলা হয় ‘টাওয়ার অফ সাইলেন্স’৷ জায়গাটি ছাদবিহীন এবং সুউচ্চ কাঠামো দ্বারা তৈরি, এর নিচের অংসে একটি দরজা রয়েছে এবং ভিতরে রয়েছে বেশ কয়েকটি তাক। সেই তাকে মৃতদেহকে রেখে দিয়ে আস্ত পরিবারের সদস্যরা, আর এতে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকত। নানা রীতিনীতির মাধ্যমে পার্সি পরিবারগুলি ঐ স্থানে মৃতদেহ রেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিস্তব্দ রেখে চলে যেত। পরে অন্য কোনো মৃতদেহ রাখার সময় কিংবা বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ঐ দরজা আর খোলা হত না।

 

Reactions

0
0
0
0
0
0
Already reacted for this post.

Reactions

Nobody liked ?