পরিবেশ সাফল্যের গল্প

পৃথিবীর এক টুকরো স্বর্গরাজ্য, যার সুখ-আনন্দ আস্বাদনে উন্মুক সকলেই

বিশ্বের সবচেয়ে চেয়ে সুখের নগরী হিসেবে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন এর নাম বিশ্ব ব্যাপী সমাদৃত। বাস করার জন্য সবচেয়ে উত্তম জায়গা হিসেবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে স্থানটির কদর খুব বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে সবুজ নগরী হিসেবে এই নগরীকে তুলনা করা হয়। ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত ও জনপ্রিয় বিনোদন পার্ক তিভোলি গার্ডেন্স রয়েছে এই শহরে। বছরে প্রায় ৪০ লাখের ও অধিক পর্যটক বেড়াতে আসে এখানে। হ্যান্স ক্রিস্টিয়ান অ্যান্ডারসেন্স বুলেভার্ডকে নামকরণ করা হয়েছে ডেনমার্কের অনন্য সাহিত্য প্রতিভার নামে । সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে, এখানে ডেনরা বেশ সাজগোছ করেই তাদের সাইকেল চালায়। সর্বত্রই দেখা মিলবে হাইহিল পরা নারী, স্যুট পরা আকর্ষণীয় পুরুষদের। শহরটিতে রয়েছে অ্যান্ডারসনের সুবিশাল ব্রোঞ্জ মূর্তি যার সামনে পর্যটকদের সেলফি তোলার চিত্র নিত্য নৈমিত্তিক। শহরটিকে আধুনিক কালের ‘স্বর্গ-রাজ্য’ বললে কম বলা হয়। সারা বিশ্বে এই নগরীকে ঘিরে বহু উপমা ব্যবহার করা হয়েছে,  ‘বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য নগরী’, ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুখের নগরী’, ‘বিশ্বের প্রধান দুই বাইসাইকেল-বান্ধব নগরীর একটি’, ‘ইউরোপের সবচেয়ে সবুজ নগরী’, ‘ভোজনরসিকদের জন্য ইউরোপের সেরা নগরী’, ‘ইউরোপের ডিজাইন রাজধানী।’

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধম্যেও ঘুরে ফিরে এসেছে এই সুন্দর নগরীর জয়গান। ব্রিটেনের ডেইলি মেইল সংবাদপত্র নিউজ করেছিল, ‘ওহ্, অনেক শীতল কোপেনহেগেন’। ইউএসএ টুডে লিখেছিল, ‘কোপেনহেগেনে গিয়ে সুখী হওয়াটা কঠিন ব্যাপার নয়’। আর ব্রিটেনের গার্ডিয়ান লিখেছে, ‘কোপেনহেগেন সত্যিই বিস্ময়কর’।

প্রশ্ন থেকেই যায় এত বিপুল প্রত্যাশা আদৌ কি কোপেনহেগেন পূরণ করতে পেরেছে?

কোপেনহেগেনের অধিবাসীরা বেশ স্বাস্থ্য সচেতন, তারা সাস্থ্যের যত্নে আপোষ করেননা। তাছাড়া পরিবেশ সচেতন হিসেবে তাদের দুনিয়া জোড়া সুখ্যাতি। এখানকার জনগোষ্ঠীর অধের্কেরই বেশি সাইকেলে চড়ে অফিস কিংবা স্কুলে যায়। এর প্রধান কারণ যান্ত্রিক বাহন কমিয়ে পরিবেশ দূষণ রোধ করা। তাছাড়া গাড়ির চেয়ে সাইকেল স্বাস্থ্যসম্মত, পরিবেশবান্ধব আর তুলনামূলক অনেক সস্তা। এই নগরীকে বলা হয় সাইকেলের নগরী। পরিসংখ্যান মতে, এখানে মানুষের চেয়ে সাইকেলের আধিক্য বেশি, এবং গাড়ির তুলনায় সাইকেল আছে পাঁচ গুণ। এমনও দেখা যায় রাজনীতিবিদরাও সাইকেলে চড়ে কাজে যায়। এখানকার পার্লামেন্টের ৬০ ভাগেরও অধিক সদস্য প্রতিদিন সাইকেল ব্যবহার করেন। বিশ্বের আরেক সাইকেলের নগরী আমস্টারডামের সাথে কোপেনহেগেনের প্রতিযোগিতা চলে কোথায় বেশি সাইকেল চলে তা নিয়ে। সাইকেল-বান্ধব হিসেবে এই দুই নগরীই বিশ্বে সবচেয়ে সমাদৃত। মনে হতেই পারে, নগরীটি গড়ার পরিকল্পনা হয়েছে বাইসাইকেলকে মাথায় রেখেই। তবে সে যাই হউক এমন সুন্দর নগরী কিন্তু এক দিনেই হয়নি। বছরের পর বছর ধরে নানান গবেষণা, পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও অবকাঠামো গড়তে হয়েছে এই শহরের নগরবিদদের।

কোপেনহেগেনে দেখা মিলবে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা একটি রাস্তা আছে যা ৩৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ। এছাড়াও অন্যান্য রাস্তায় সাইকেলের জন্য আলাদা লেইন আছে যেখানে সাইক্লিস্টদের জন্য রয়েছে আলাদা ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। এখানকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা এমনভাবে সেট করা আছে যেন একজন সাইক্লিস্ট নির্দিষ্ট গতিতে চালালে কোথাও না থেমেই পুরো নগরী অতিক্রম করতে পারবে। কোপেনহেগেন এখানেই থেমে নেই, ২৬টি বাইক সুপারহাইওয়ে তৈরি হচ্ছে যার কোনো কোনোটি হবে ২২ কিলোমিটারের মত দীর্ঘ। এসব নতুন ‘সুপার’ বাইক রাস্তাগুলো নির্মাণ করা হচ্ছে মনোরম সব সবুজ মাঠের পাশ দিয়ে এবং বনের মধ্য দিয়ে যেখানে দেখা মিলবে মনোরম সব পুকুর চারপাশে। গাড়ির জন্য অপেক্ষা না করেই  সাইকেল নিয়ে সহজেই যাওয়া যাবে এসব রাস্তায়। এমনকি প্রতি এক কিলোমিটার পরপর সাইকেলে বিনামূল্যে বাতাস দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এসব আধুনিক রাস্তায়। কোপেনহেগেনকে আরো বেশি সাইকেল-বান্ধব করা হচ্ছে যেন অধিবাসীরা নগরীর উপকণ্ঠে বাস করতে উৎসাহিত হয়। এখানে পোতাশ্রয়ের ওপরে উঁচু সেতু হিসেবে এলিভেটেড সাইক্লিস্ট রোডওয়েটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। সবকিছু বিবেচনায় সাইকেলের নগরী হিসেবে নিশ্চিতভাবেই কোপেনহেগেনই সেরা।

ইউরোপিয়ান কমিশন কর্তৃক ‘ইউরোপের সবুজ রাজধানী’ হিসেবে স্বীকৃতি মিলেছে কোপেনহেগেন এর। তাই কোপেনহেগেন ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বের প্রথম কার্বন ডাই-অক্সাইড নিরপেক্ষ রাজধানী হতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্যে তারা এখন থেকেই কাজ করে যাচ্ছে, সেখানকার ২০১০ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী অফিস, গ্যারেজ, শেড থেকে শুরু করে প্রতিটি নতুন ভবনে সবুজ ছাদ (বাগান) থাকা বাধ্যতা মূলক। সরকারের আইনে আছে, কোপেনহেগেনের প্রতিটি বাসিন্দা যেন তার বাড়ি থেকে ১৫ মিনিটেই হেঁটে কোনো পার্কে সহজেই যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একসময় যে পোতাশ্রয়টি দূষিত ছিল এখন সঠিক নগরায়নে তা এত পরিষ্কার যে, যে কেউ নিরাপদে সাঁতর কাটতে চাইবেন। কোপেনহেগেনের বাসিন্দারা এখানে বাস করাটাকে গর্বের ব্যাপার হিসেবে ধরে নেয়। দিনের পর দিন সুক্ষ সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে কোপেনহেগেন বাসযোগ্য নগরীর মডেলে পরিণত হয়েছে। আর কোপেনহেগেনে কিভাবে এত দ্রুত উন্নতি ঘটাচ্ছে, তা দেখতে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হতে হাজার হাজার নগর পরিকল্পনাবিদ এখানে ভিড় জমান।এখান থেকে ধারণালব্দ হয়ে তারা তাদের নগরীতে প্রয়োগ ঘটান।

কোপেনহেগেনের ক্রিস্টিয়ানি দ্বীপটি ৩৪ হেক্টর আয়তনে সীমাবদ্ধ এবং বেসরকারি স্বায়ত্তশাসিত এলাকা। দ্বিপটিতে বাইসাইকেল এবং গাড়ি উভয়ই নিষিদ্ধ। ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত এটি ছিল একটি সামরিক ব্যারাক। কিন্তু দখলদার বোহেমিয়ানদের সরকার উচ্ছেদ করার অনেক চেষ্টা চালালেও ব্যর্থ হয়। ফলে ১৯৭২ সালে ডেনিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ক্রিস্টিয়ানিয়াকে সরকারি সম্পত্তি ও ভূমি ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। এর পর থেকেই পরিবর্তন ঘটতে থাকে দ্বিপটিতে, সেখানে বসবাসকারীরা সরকারের বেঁধে দেয়া গতানুগতিক নিয়মে চলতে নারাজ। এ সকল হাজারো নিয়ন না মানার জন্য তারা নিজেদের গর্ববোধ করে। এখানকার অধিবাসীরা ভয় পাওয়ার মতো ভূতুরে বাড়ি বানিয়ে বাস করে। এখানে দেখা মিলবে প্রচুর অর্গানিক ক্যাফের, ধোঁয়া ভরা ক্যাফেগুলো থেকে ধেয়ে আসে মিউজিকের শব্দ। আর এখানকার আর্ট গ্যালারিও আছে নিজস্ব ধরণ এবং রাস্তার প্রতিটি দেয়াল জুড়েই রয়েছে নানাণ আঁকিবুঁকিতে ভরা। দলিলপত্রে এখানকার কোনো অধিবাসীর নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, তারা হিপ্পি থাকতে চায়। ২০১১ সালে সরকার ফাউন্ডেশন ফ্রিটাউন ক্রিস্টিয়ানিয়ার কাছে যখন জমি বিক্রি করতে রাজি হয়। তক্ষণ শর্ত জুড়ে দেয় যে, অধিবাসীদের বিনা পয়সায় বাড়ি দিতে হবে। ক্রিস্টিয়ানিয়া হলো নগরীর দ্বিতীয় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আকর্ষণকারী (তিভোলি গার্ডেন্সের পর) স্থান। এখানে আগত পর্যটকদের পূর্বেই নির্দেশনা দেয়া হয় যে এখানকার নিয়ম মেনে চলতে। তাদের বলা হয় ‘আনন্দ করো কোন বাঁধা নাই, তবে ছবি তোলা যাবে না, আর ভয় পাবে না।’ পর্যটকদের আশ্বাস দেয়া হচ্ছে, তারা যেন পুলিশি অভিযান হবে এমন আশঙ্কা না করে। ক্রিস্টিয়ানিয়াতে আইনগতভাবে ড্রাগ কেনা বা বেচা উভয়ই নিষিদ্ধ। সব কিছুকে ছাপিয়ে পৃথিবীর বাস যোগ্য উত্তম নগরী হিসেবে বেশি উজ্জ্বল কোপেনহেগেনই।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সার্থক জন্ম তোমার হে স্বাধীনতাকামী বাঙালীর নেতা

MP Comrade

সুপারহিরো সোয়াত

MP Comrade

সাফল্যের গল্প ও মায়ের ত্যাগ

Fatematuz Zohora ( M. Tanya )

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: