আন্তর্জাতিক রাজনীতি

অভিন্ন ইউরোপের স্বপ্নদ্রষ্টা!

‘অভিন্ন ইউরোপীয় বাসভূমি’ এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গরবাচেভ। তিনি পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপ বলতে বলতে চাননি অর্থাৎ ইউরোপের বিভক্তি চাননি। তার মতে ইউরোপ এমন এক শক্তিশালী বাসভূমি যেখানে ভূগোল আর ইতিহাস পরস্পর ঘনিষ্ঠভাবে মিলে গিয়ে গড়ে তুলেছে বেশ কিছু দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎকে। একথা অবশ্যই ঠিক যে এদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। প্রত্যেকেই চায় নিজস্ব ধারায় জীবন যাপন করতে এবং নিজস্ব পুরুষানুক্রমিক ঐতিহ্য অনুসরণ করতে।  তাই রুপক অর্থে তিনি ইউরোপকে চিহ্নিত করেছিলেন একটি বাসভূমি হিসেবে, যেখানে বিভিন্ন কক্ষে (বিভিন্ন দেশ) বিভিন্ন লোক (বিভিন্ন জাতি) বসবাস করে। ইউরোপে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে বিভিন্নতা আছে, কিন্তু ইউরোপ এক- এ কথাটাই রাখতে বলেছিলেন গরবাচেভ। তিনি ইউরোপে স্থিতিশীলতা ও শান্তি বজায় রাখার স্বার্থেই এক ইউরোপ চেয়েছিলেন। তার এই প্রচেষ্টার পেছনে বেশ কিছু যুক্তিও ছিল।

প্রথমত, ঘনবসতিপূর্ণ ও অত্যন্ত শহরায়িত ইউরোপে পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরণের অস্ত্রে ছেয়ে গিয়েছিল।

দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বাদ দিলেও একটা চিরাচরিত যুদ্ধও বর্তমান ইউরোপের জন্য ক্ষতিকর হবে। এর কারণ শুধু এই নয় যে শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের চেয়ে প্রচলিত অস্ত্রগুলো আরো মারাত্মক- এর কারণ এটাও যে মোট দুশর মতো আণবিক রিঅ্যাক্টর ইউনিট আর বিপুল সংখ্যক রাসায়নিক কারখানাসমেত নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎশক্তি ইউনিট এখানে রয়েছে। প্রচলিত যুদ্ধের সময় এইসব কারখানা ধ্বংস হয়ে গেলে এই মহাদেশ বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, ইউরোপ বিশ্বের শিল্পোন্নত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানকার শ্রম শিল্প ও পরিবহন বিকাশ লাভ করতে করতে এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে পরিবেশের পক্ষে তার বিপদ গুরতর হয়েছে বলা যেতে পারে। এই বিপদ একটা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এখন গোটা ইউরোপের বিপদ হয়ে উঠেছে।

চতুর্থত, ইউরোপের দুই অংশের অর্থনৈতিক বিকাশের এবং সেই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিকাশের তাগিদে কোনো না কোনো ধরণের পারস্পরিকভাবে সুবিধাজনক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

পঞ্চমত, ইউরোপের দুই অংশে পূর্ব-পশ্চিম পরিসরে নিজস্ব সমস্যা আছে। কিন্তু অত্যন্ত তীব্র উত্তর-দক্ষিণ সমস্যা সমাধান করায় তাদের উভয়েরই আছে অভিন্ন স্বার্থ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতিসমূহের ভবিষ্যৎ যদি উপেক্ষিত হয়, উন্নয়নশীল দেশ ও শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার ফারাক দূর করার জটিল সমস্যাকে যদি অবহেলা করা হয় তাহলে সেটা ইউরোপ আর বিশ্বের বাকী অংশের পক্ষে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ষষ্ঠত, গরবাচেভ তার ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’ নীতির সফল বাস্তবায়ন ও সাফল্যের জন্য পশ্চিম ইউরোপের ও সেই সাথে পূর্ব ইউরোপের সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। আর এজন্যেই তিনি ‘কমন ইউরোপিয়ান হোম’ এর তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন।

চলুন জেনে নিই ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’ নীতি আসলে কি?

পেরেস্ত্রোইকাঃ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে মিখাইল গরবাচেভের আগমনের পর (১৯৮৫) দেশ ও পার্টির সদুর প্রসারী পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে ব্যপক সংস্কারমূলক কর্মসূচী ‘পেরেস্ত্রোইকা’ হাতে নেয়া হয়েছিল। পেরেস্ত্রোইকায় প্রধান যে বিষয়গুলো হাতে নেয়া হয়েছিল তা হলোঃ ১. অর্থনৈতিক সংস্কার, ২. সামাজিক অগ্রগণ্যতা, ৩. রাজনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ৪. পার্টির ভূমিকা সংশোধন , ৫. মতাদর্শ, ধর্ম ও  সংস্কৃতির গুনবিন্যাস, ৬. অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় সমস্যা সমাধান, ৭. পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো সম্পর্কে ব্যপক পুনর্গঠনের মাধ্যমে গরবাচেভ পূর্ব ইউরোপে এক নতুন ধারার সূচনা করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বহুল প্রচারিত ‘পেরেস্ত্রোইকা’-তে লিখেছেন, ” বহুবার আমি ব্যাখ্যা করেছি যে পশ্চিমী স্বার্থবিরোধী কোন লক্ষ্য আমরা অনুসরণ করিনা। আমরা জানি যে মার্কিন ও পশ্চিম ইউরোপীয় অর্থনীতির পক্ষে প্রধানত কাঁচামালের উৎস হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, এসিয়া, ল্যাতিন আমেরিকা অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের এলাকা এবং এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকা কত গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্ক ছেদ ঘটাবার কথা আমরা চিন্তাও করিনা এবং ঐতিহাসিক কারণে সৃষ্ট পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের হানি ঘটাবার কোন অভিপ্রায় আমাদের নেই”

 

গ্লাসনস্তঃ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তার জন্য রাজনৈতিক সংস্কার ও গণসমর্থন প্রয়োজন ছিল। আর এর জন্য গ্লাসনস্ত নীতি গ্রহণ করা হয়। গ্লাসনস্তের আওতায় রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থায় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হয়েছিল তা হলো, ১. সকল পর্যায়ে নির্বাচিত পদে পর পর দুবার কেউ নির্বাচিত হতে পারবে না, ২. কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটি হবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব এবং সদস্য সংখ্যা হবে ২২৫০, ৩. ডেপুটিদের মধ্য থেকে একটি স্থায়ী কার্যনির্বাহী সুপ্রিম  সোভিয়েত নির্বাচিত হবে, ৪. কংগ্রেস অব পিপলস ডেপুটি গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করবে।

গরবাচেভের এই নীতি নানা কারণে বিতর্কিত ছিল। অভিযোগ আছে, ১৯৮৫ সালে গরবাচেভ ক্ষমতায় আসার পর তিনি পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ঐক্য দৃঢ় না করে বরং পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপকে একীভূত করার জন্য ইউরোপের অভিন্ন বাসভূমির কথা বলেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন এর মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপের ঐক্য ও সংহতি বাড়বে। কিন্তু প্রকারান্তরে তার এই প্রচেষ্টা ও নীতি পূর্ব ইউরোপের ঐক্যে চির ধরায়। গরবাচেভ পূর্ব ইউরোপ সম্পর্কে দীর্ঘদিনের গড়া সোভিয়েত নীতিকে পরিত্যাগ করেন।

সহায়ক গ্রন্থঃ আমাদের দেশ ও সমগ্র বিশ্ব (পেরেস্ত্রোইকা ও নতুন ভাবনা)

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সিঙ্গাপুরের শীর্ষ বৈঠক নিয়ে মার্কিন এবং উত্তর কোরিয়া প্রশাসনের ধোঁয়াশা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

MP Comrade

কোরিয়া সমাচারঃএকাল-সেকাল

Raihan Tanvir

“ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল যুক্তরাষ্ট্র!

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: