Now Reading
জোট নিরপেক্ষ “ন্যাম” আদৌ কি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা?



জোট নিরপেক্ষ “ন্যাম” আদৌ কি কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা?

বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতির একটি উল্ল্যেখযোগ্য দিক হচ্ছে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের জন্ম, যা “ন্যাম” নামে পরিচিত। ১৯৬২ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়। এই ন্যাম আন্দোলন দুটি পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে বিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক রাজনীতিতে তাদের অবদান রেখে গেছে। আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা আছে এই জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন নিয়ে। আদতে এটি কোন আন্তর্জাতিক সংগঠন নয়, নয় কোন চুক্তিভিত্তিক আলাদা জোট। এর কোনো সনদ বা গঠনতন্ত্র নেই, নেই কোন স্থায়ী দপ্তর। কিন্তু এ সত্ত্বেও এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের জন্য গড়ে উঠেছে একটি সুনির্দিষ্ট অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। আর এটি হচ্ছে, ১. রাষ্ট্র অথবা সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন, ২. সমন্বয়কারী রাষ্ট্র আন্দোলনের চেয়ারম্যান, ৩. পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন, ৪. পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সভা, ৫. জাতিসংঘ জোট নিরপেক্ষ দেশ সমূহের গ্রুপ, ৬. সমন্বয় ব্যুরো (পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা জাতিসংঘ জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের স্থায়ী প্রতিনিধি) এবং ৭. বিশেষায়িত সংস্থা সমূহ।

সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান কাজ হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর বিচার বিশ্লেষণ ও মুল্যায়ন করা। সেই সাথে জোট নিরপেক্ষ নীতির মূল কৌশলগত ধারাসমুহের দিক নির্দেশ করা এবং জাতি সংঘে বিভিন্ন প্রশ্নে একটা যৌথ অবস্থান গ্রহণের ক্ষেত্রে মতৈক্য সৃষ্টি করা ও শীর্ষ সম্মেলনের আন্দোলনের কার্যক্রমের সার্বিক মুল্যায়ন করে ভবিষ্যৎ কর্মসূচী গ্রহণ করা। তিন বছরে একবার সম্মেলন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা রয়েছে। নিয়মিত সম্মেলন ছাড়া সীমিত সংখ্যক অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রের সমন্বয়ে বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে যে দেশে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সে দেশ পরবর্তী ৩ বছরের জন্য সমন্বয়কারী দেশ হিসেবে পরিচিত হয়। সে দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ঐ সময়ের জন্যে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমন্বয়কারী দেশ ও আন্দোলনের চেয়ারম্যান দুই শীর্ষ সম্মেলনের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলী সম্পাদন করেন। আন্দোলনের কার্যক্রম চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে সমন্বয়কারী রাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত হয়। চেয়ারম্যান আন্দোলনের প্রধান মুখপাত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বিশ্লেষণে এবং প্রতিক্রিয়া ব্যাক্তকরনে চেয়ারম্যান জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনভুক্ত উন্নয়নশীল দেশ সমূহের মধ্যে অভ্যন্তরীণ, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এদের মধ্যে অনেক অভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো মূলত এ সমস্ত দেশের অভিন্ন ঔপনিবেশিক অতীত দ্বারা সৃষ্ট। সমস্যাগুলোর সমাধানের মূল কথা হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক আসরে স্বাধীন ও সন্মানজনক অবস্থান গ্রহণ, যা শুধু ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সম্ভব। যে সমস্ত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহ তাদের অভিন্ন পররাষ্ট্র নীতির ভিত্তিতে একটি আলাদা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সত্ত্বা ও গোষ্ঠীতে একত্র হয়েছে, তা হচ্ছেঃ ক) নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর পূর্ণকর্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করা, স্বাধীন অর্থনৈতিক বিকাশে অধিকার সমুন্নত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপমুক্তভাবে সিদ্ধান্তগ্রহণসহ জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। খ) আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সমতা, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গনতন্ত্রায়নের জন্য  ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম,  গ) উন্নত বিশ্বের সাথে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে ব্যাপক সংযোগ সৃষ্টি করা এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রবাহে নিজেদেরকে সক্রিয় রাখার মাধ্যমে বিশ্বে নিজেদের একটা ইতিবাচক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, ঘ) বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য যৌথ কূটনৈতিক তৎপরতা চালু রাখা।

সার্বিকভাবে, জোট নিরপেক্ষ দেশসমূহের মধ্যে একটি সাধারণ সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা এবং বস্তুনিষ্ঠ ও স্বাধীন সংবাদ সরবরাহ ও প্রচারের নীতিমালা প্রণয়ন করা এই পরিষদের কাজ।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment