Now Reading
দুর্দান্ত এক ফরাসি বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব



দুর্দান্ত এক ফরাসি বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব

পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ইউরোপে এক বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার কৃষক ও শ্রমজীবীদের আন্দোলনের পথিকৃৎ এই বিপ্লব। তারই ফলাফলে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, গণতন্ত্র শব্দটি পায় নতুন মাত্রা। সত্যিকার অর্থে, ফরাসি বিপ্লব কিন্তু সফল হয়নি। যে রাজতন্ত্র থেকে মুক্তি পাবার আশায় এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল, মাত্র ১৫ বছরের মাথায় সেই রাজতন্ত্র আবার ফিরে এসে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় যা পরবর্তী ৭০ বছর পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব ছিল। তবে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে বাইরের বিশ্বকে, গোটা বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থায় অভুতপূর্ব প্রভাব ফেলেছিল এই ফরাসি বিপ্লব। উনিশ শতকে ফ্রান্স ছাড়িয়ে সারা ইউরোপে নতুন ভাবধারার সূচনা করেছিল এই বিপ্লব। ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৭৮৯ সালে, যার মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। এই আন্দোলন সংঘটিত হওয়ার পেছনে ফরাসি দার্শনিক ও সাহিত্যিকদের অসামান্য অবদান রয়েছে। ব্রিটিশদের বিপক্ষে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্যে অনেকেই ফরাসি বিপ্লব থেকে অনুপ্রানিত হয়েছিলেন।

 মানব সভ্যতার অন্যতম একটি মাইলফলক রেনেসাঁ থেকে এনলাইটেনমেন্ট পর্যন্ত যাত্রা। বিশেষত মধ্যযুগের ইউরোপে যখন ধর্মের প্রতাপ ছিল। মানুষের চিন্তা চেতনায় তখন গুরুত্ব পেয়েছিল ঈশ্বর এবং ধর্মবিশ্বাস। সেই সুযোগে মানুষের ভাবনার জগৎকে আলোড়িত করে ইতালিতে গোড়াপত্তন করেছিল রেনেসাঁ আর তা সমগ্র ইউরোপেই ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় শিল্প সাহিত্যের প্রসারও ঘটেছিল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, বতিচেলি­, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েলসহ বহু উলে­খযোগ্য চিত্রশিল্পী ও ভাস্করদের বিখ্যাত সৃষ্টিকর্মগুলো সে সময়কারই। ফরাসি বিপ্লবের পূর্বে প্রায় এক শতাব্দী ফ্রান্স আলোড়িত হয় নতুন আর পুরান  চিন্তার দ্বন্দ্বে। ১৭৭৬ সালে আমেরিকা যখন ব্রিটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে তখন বহু ফরাসি আমেরিকানদের সমর্থন দিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। সেই ফরাসিরা যখন দেশে ফেরত আসে, তখন উপলব্দি হয় স্বাধীনতার স্বাদ কেমন। তাদের মধ্যেও আন্দোলিত হতে থাকে নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের, আর এই স্বাধীনতা তাদের রাজতন্ত্র থেকে মুক্তির। ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের নয়, সে সময় বদলে দিয়েছিল গোটা ইউরোপের চিত্র। মানুষের চিন্তার জগৎকে আলোড়িত গোটা মানব সভ্যতাকে নতুনভাবে লিখতে ভুমিকা রেখেছে ফরাসি বিপ্লব।  ১৪ জুলাই ১৭৮৯ সাল, সেদিন শ্রমিক, জনতা, কারিগর, গ্রাম ও শহরের গরিব মেহেনতি মানুষের খাদ্যের দাবিতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস বেশ উত্তপ্ত হয়। চারিদিকে শুরু হয় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, এ শুধু যে নিছকই তা কিন্তু নয়। প্যারিসে সর্বাত্মক বিক্ষোভ মিছিলে প্রকম্পিত, আর তাদের ছত্রভঙ্গ করতে তৎকালীন রাজার নির্দেশে মিছিলের ওপরই তুলে দেয়া হয় অশ্বারোহী বাহিনী। ফ্রান্সের সামরিক অধিনায়ক জনতার সাথে সংঘর্ষে যেতে চাইলেন না, অতঃপর প্যারিসের নিয়ন্ত্রণ জনতার হাতেই চলে যায়। এদিকে উন্মত্ত জনতা কারাগারের অধিকর্তা দ্যলুনেকে হত্যা করে রাজবন্দীদের মুক্ত করে আনে।  বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্রের দোকান লুট করার পাশাপাশি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের প্রতীক বাস্তিল কারাদুর্গও আক্রমণ করে উত্তেজিত জনতা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করা এবং রাজা ষোড়শ লুই এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। মূলত ফরাসি রাজতন্ত্র ছিল নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী। কেননা রাজা ক্ষমতার একক অধিকারী হওয়াতে অধিক স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে তাকে অনুপ্রানিত করে। ফলে একটা সময় রাজা নিজেকে ঈশ্বর প্রদত্ত ডিভাইন রাইট অব মনারকির প্রতিভু বলে ঘোষণা করেন। তিনি বলতেন, সার্বভৌম ক্ষমতা আমার ওপর ন্যস্ত, তাই সব আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও বিচারিক আদেশের ক্ষমতা আমার। রাজার সমালোচনা যদি কেউ করত তবে তাকে গ্রেফতার করে গোপনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো।

রাজতন্ত্রের এই স্বেচ্ছাচারিতা শুরু হয়েছিল রাজা চতুর্দশ লুই এর শাসনামলের শেষ ভাগের দিকে যখন তা চরম আকার ধারণ করেছিল। পরবর্তী রাজা পঞ্চদশ লুইও ছিলেন অধিক স্বৈরচারী, তিনি রাজকার্য পরিচালনার পরিবর্তে বিলাস জীবনেই অধিক অভ্যস্ত ছিলেন। এর পর রাজা  ষোড়শ লুই সিংহাসন আরোহণের পর প্রশাসনকে ঢেলে সাঁজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অভিজাত শ্রেণির প্রাধান্য আর পূর্বসূরিদের বিশ্বাসভিত্তিক চিন্তাধারা থেকে মুক্ত হতে পারেননি।  রাজা ষোড়শ লুই এর উচ্ছৃঙ্খলতা, অমিতব্যয়িতা এবং দুর্বল প্রজাদের উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচার এসব কিছুই ফরাসি জনগণকে বিপ্লবমুখী করে তুলেছিল। এ ছাড়াও ছিল শাসন বিভাগের বিশৃঙ্খলতা এবং রাজকর্মচারীদের অতি মাত্রায় অত্যাচার। অন্যদিকে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল  শাসন ও বিচারব্যবস্থা যা অসন্তোষ ছড়ায় জনগণের মাঝে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত ও ইংরেজদের সাথে প্রায় সাত বছরব্যাপী যুদ্ধে ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। আর তাতেই ব্যবসা বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়ে এবং এই অবনতির ফলে ফরাসিদের রাজকোষও শূন্য হয়ে পড়ে।  ফ্রান্সের সমাজে ব্যবস্থায় শ্রেণি বৈষম্য ছিল  প্রকট। অভিজাত ও যাজক সম্প্রদায় প্রথম শ্রেণিভুক্ত যারা রাজার আস্থাভাজন ছিল। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও জনসাধারণ ছিল সুবিধাহীন অধিকারবঞ্চিত শ্রেণি। এসব বৈষম্য সাধারণ মানুষের মনে মারাত্মক ইন্ধন জুগিয়েছিল রাজার শাসনের বিরুদ্ধে। যাজক সম্প্রদায় রাজার বিশেষ রাজনৈতিক, বিচার এবং রাজস্ব সংক্রান্ত সুযোগ সুবিধা প্রাপ্ত ছিল। রাজ্যে তাদের নিজস্ব এলাকা, বাহারি প্রাসাদ, দুর্গ ও গির্জা ছিল। আবার ফরাসি সমাজে দ্বিতীয় শ্রেণি ধরা হত অভিজাতদের। যদিও সংখ্যায় তারা নগণ্য তবুও সমাজে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন তারাই। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একচেটিয়া অধিকার ভোগ করত এই অভিজাত শ্রেণী। বুর্জোয়া বা মধ্যবিত্ত ছিল তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত যারা অনেকটাই সুবিধাপন্থি ছিলেন। কৃষক ও শ্রমিকরা ছিল সমাজের সর্বনিম্ন স্তরের  যাদের উপর চলত রাজতন্ত্র তথা উচ্চ শ্রেণীর শোষণ ও নিষ্পেষণ। সর্বোপরি নিন্মবিত্ত ও কৃষকদের উপর অন্যায় নির্যাতনই শ্রেণি সংঘাতের ক্ষেত্র গড়ে তুলেছিল। রাষ্ট্র ব্যবস্থা এমন ছিল যে, রাজস্বের ব্যয়ভার কেবল কৃষককেই বহন করতে হতো। ফলে কৃষক ও শ্রমিকরা ক্রমেই বিপ্লবমুখী হয়ে ওঠে। ফলে পুরো অষ্টাদশ শতাব্দী ধরে ইউরোপে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটে।

১৭৮৯ সালে ফ্রান্সের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ গ্রামাঞ্চলে থাকত যার মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখই ছিল কৃষক শ্রেণীর। এদিকে চাষযোগ্য জমির প্রায় ৩০ শতাংশের মালিকানা ছিল গির্জা ও সামন্তপ্রভুদের হাতে যারা ছিল সংখ্যায় মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ ভাগ। এ ছাড়া বিপ্লবের সময়টাতে ফ্রান্সে প্রায় ১০ লাখের মতো ভুমিদাস ছিল। মাঝেই মাঝেই দেখা দিত অজন্মা। একজন ইতিহাসবিদ লিখেছিলেন, ফ্রান্সে ৯ দশমাংশ লোক অনাহারে মারা যায়, আর এক দশমাংশ মরে অতি ভোজনের ফলে। এ ছাড়া ছিল কর বা খাজনার জন্য নির্যাতন। সাধারণ মানুষকে রাজার আরোপ করা কর, গির্জা কর্তৃক আরোপ করা কর, ভুস্বামী বা জমিদারদের আরোপ করা কর দিতে হতো। আইনও ছিল গরিবের বিপক্ষে। তাদের বিচার করার সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ নিয়ে ততটা মাথা ঘামানো হতো না। সব মিলিয়ে জ্বলে ওঠে বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।

আন্দোলনকারী বিদ্রোহীদের হাতে ষোড়শ লুই ও তার স্ত্রী মারি অ্যান্তনে বন্দী হন। রাজার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বিদ্রোহী নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে আয়োজন করা হয় ভোটের, ৩৬১ জন মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে এবং ২৮৮ জন বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৭৯৩ সালের ২১ জানুয়ারি হাজার জনতার সম্মুখে রাজা ষোড়শ লুইসকে গিলোটিনে শিরোচ্ছেদ কার্যকর করা হয়।  এরপর ১৬ অক্টোবর রানীর ক্ষেত্রেও একই শাস্তি কার্যকর হয়।ফরাসি বিপ্লব উন্মোচিত করেছিল এক নতুন দিগন্ত। এর ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র শব্দটি অর্থবহ হয়ে ওঠে। বিশেষত রাজতন্ত্রের পতন এর পর বিশ্বাসভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। আর ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফরাসি বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ইউরোপসহ, গোটা পৃথিবীর পট পরিবর্তন করে দেয় ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল। বর্তমান বিশ্বের বেশির ভাগ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই ফরাসি বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার সুফল ভোগ করছে।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment