Now Reading
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা….



ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা….

প্রবাদে বলা আছে “কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে”

সময়ের সাথে সাথে এই প্রবাদের গ্রহণযোগ্যতাও কমে এসেছে।

আমাদের বাপ দাদাদের আমলে তারা একনিষ্ঠ পড়াশোনা করলে ভালো রেজাল্ট প্রতিদিনকার দিবা রাত্রির মতোই সত্য এবং পরিষ্কারভাবে নসিবে নাযিল হতো। এখন একজন ছাত্রের ভালো রেজাল্টের উপর কেবল তার পরিশ্রম নয়। আরো অনেক কিছুর প্রভাব থাকে।

বিগত কয়েক বছর ধরে পরীক্ষা পরবর্তী সময়ে বেশকিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র ভাইরাল হয়েছে। কোনোটাতে দেখা যায় চলন্ত লোকাল বাসে বসেই পরীক্ষক পাবলিক বোর্ড পরীক্ষার খাতা কাটছেন। কোনোটাতে দেখা যায় পরীক্ষকের ভূমিকায় অপেক্ষাকৃত ছোটক্লাসের কিশোর কিশোরীরা/ছাত্রেরা। আবার অনেক সময় এমনও দেখা গিয়েছে, পরীক্ষক খাতায় কোনো ধরনের ভুল সনাক্ত না করেই চোখ বন্ধ করে খাতার মান নির্ধারণ করেছেন নিজের ইচ্ছেমত।

পরবর্তী শিক্ষাজীবনের অনেকটাই যে বোর্ড পরীক্ষাগুলোর উপর নির্ভর করে সেই পরীক্ষার খাতাগুলোর সঠিক মূল্যায়ন কি আদৌ হয়?

যে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হয় তার উত্তর মূল্যায়ন করার ট্রেনিং/ নিয়ম কি সকল পরীক্ষক-নিরীক্ষকদের প্রদান করা হয়েছে?

উত্তরপত্র মূল্যায়নের আগে প্রশ্নপত্রের কথা বলতে হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস বানিজ্যের ব্যাপারে সকলেই এখন কমবেশি অবগত। গত ৫ বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন একটি মহা উত্সবে পরিনত হয়েছে। এমন কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই যেখানে অনিয়ম হয়নি কিংবা প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। এই অনৈতিক কাজ গুলো আমাদের শিক্ষার্থীদের কতটা ভাবায় তার জ্বলন্ত উদাহরণ ২০১৫ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস পরিবর্তী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। শিক্ষাব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে না হলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে পারে তার বিচারের দায়িত্ব পাঠকের উপরেই ন্যস্ত করলাম। আমার তো মনেহয় পৃথিবীতে এমন দ্বিতীয় একটি দেশ কেউ দেখাতে পারবেন না যে দেশের শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামতে হয় নিজেদের পরীক্ষার প্রশ্ন জালিয়াতি রোধ করার দাবি নিয়ে। এটি আমাদের মত জাতির জন্য লজ্জা বৈ কি?

শুধু তা-ই নয়, যে প্রশ্ন বৈধ-অবৈধ উভয়ভাবেই পরীক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায় তার কোয়ালিটি/মান নিয়ে প্রতিবছরই পরীক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনা যায়। পরীক্ষার্থীদের বেকায়দায় ফেলতে আনকমন নয়, বরং কোয়ালিটিহীন প্রশ্নপত্রই যথেষ্ট, যে প্রশ্নের আগামাথা বুঝে উঠার আগেই সময় পক্ষী যেনো ফুরুৎ করে বেরিয়ে যায়।

সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হওয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সারাদেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হবার কথা থাকলেও তা না করে অনেক বোর্ডে ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিলো। আবার এমনও হয়েছে যে, বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে বাংলা ২য় পত্রের প্রশ্ন। অনেক পরীক্ষায় নতুন প্রশ্নপত্র না দিয়ে দেওয়া হয়েছে ২-৩ বছর আগের পরীক্ষার প্রশ্ন। এমন অবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা কোন পর্যায়ে যেতে পারে তা সহজে অনুমেয়।

যে প্রশ্ন এবং উত্তরপত্রের সাথেই এত এত প্রশ্ন জুড়ে আছে তার ফলাফল প্রশ্নাতীত থাকার কথাই অচিন্ত্যনীয়। এখন GPA-5 ই ভালো রেজাল্টের সিলমোহর এবং এটা আবার কিনতেও পাওয়া যায়! সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে শহরের বিভিন্ন নামীদামী কলেজের অধ্যক্ষ্যরা লাখ টাকার বিনিময়ে GPA-5 বিক্রির কথা অপকটে স্বীকার করেছেন। কয়েক মাস আগে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কিভাবে লাখ টাকার বিনিময়ে GPA-5 পাইয়ে দিচ্ছে কিছু স্কুলের শিক্ষরেরা।

মোটকথা পরিশ্রম, অধ্যবসায় এবং মেধা এসব থাকলেও একজন ভালো শিক্ষার্থী এই দূর্নীতি ও অবহেলাপূর্ণ এডুকেশন সিস্টেমের গ্যাড়াকলে পড়ে তার সঠিক মূল্যায়ন পায়না। অপরদিকে কেউ একজন “ফেল করি মাখো তেল” সিস্টেমে চাইলেই একটি GPA-5 বগলদাবা করতে পারে।

এমন মেধার অবমূল্যায়ন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকেই পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করছে। শিক্ষাজীবনের প্রতি বিষিয়ে উঠছে মন এবং জমে উঠছে ক্ষোভ। সর্বশেষ SSC পরীক্ষার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ছেলের ভিডিও ভাইরাল হয়েছিলো, যেখানে ছেলেটিকে শিক্ষা ব্যবস্থা এবং কর্তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে দেখা যায়। কারণ সে সবার থেকে ভালো পরীক্ষা দেওয়ার পরেও পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলো, যা সে কোনো অবস্থাতেই মানতে পারছিলো না। তার ওই ভিডিওতে ফুটে উঠা ক্ষোভ-ই প্রমান করে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে কতটা ত্রুটিপূর্ণ। আর এই ক্রুটিপূর্ণ সিস্টেমের মাশুল হিসেবে কত মেধাবী শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই।

গত সপ্তাহে একটি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের ৬০ বছর বয়স্ক জিল হোসেনের কাহিনী তুলে ধরা হয়। যে জিল হোসেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সব পরীক্ষায় পাশ করলেও তাকে রেজাল্টে ফেইল দেখানো হয়। ফেইল মেনে নিয়ে অসহায় জিল হোসেন আবারও পরীক্ষায় বসে, কিন্তু প্রথম পরীক্ষার দিন-ই কোন কারণ ছাড়া জিল হোসেনকে পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়। আর পরীক্ষায় বসতে পারেনি জিল হোসেন। সারাজীবন অশিক্ষিত সার্টিফিকেট বিহীন একজন মানুষ হিসেবে সমাজের কাছে তিরস্কার আর অবহেলা পেয়ে আসতে হয়েছে জিল হোসেনকে।

আজ জিল হোসেন বৃদ্ধ, কিন্তু নামের পাশে ‘গ্রাজুয়েট’ লাগাতে আজও জিল হোসেন ছুটে যান হাইকোর্টের বারান্দায়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টানা ৩৬ বছর ধরে মামলা চালিয়ে আসছেন জিল হোসেন। রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মামলা করায় রাষ্ট্র লজ্জিত না হলেও জিল হোসেনেরা ঠিকই লজ্জিত। কারণ স্বাধীন রাষ্ট্রে এমন ক্যান্সারে আক্রান্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জিল হোসেনেরা কখনোই দেখতে চায় না।

যে শিক্ষার উদ্দেশ্য জীবন আলোকিত করা, আমাদেরই ভুল এবং দূর্নীতির জন্যই ফুলের মতো শিক্ষার্থীদের জীবনে তা হয়ে উঠে নরকসম কালো অধ্যায়। একজন জিল হোসেন-ই তার প্রকৃত উদাহরণ।

শিক্ষা ব্যবস্থা-ই যখন মহাব্যাধি ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত, তখন কস্ট করলে “কেষ্ট” মেলার গ্যারান্টি এই প্রজন্মকে দিবে কে?

About The Author
নীল সালু
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment