সাফল্যের গল্প

সাধারণের মাঝে লুকিয়ে থাকা অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের জীবনেই সমস্যা আছে। ঝামেলাবিহীন মানুষ খুজে পাওয়া প্রায় অসম্ভবই বলা চলে । তবে জীবনের সমস্যাগুলোকে জয় করে ,চূড়ান্ত কঠিন সময়কে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়া মানুষগুলোই আমাদের হিরো।এই ধরণের বহু সফল মানুষেরা আমাদের মাঝেই লুকিয়ে থাকে ।কিছু মানুষ সারাজীবন কিছু পাওয়ার আশায় কাটিয়ে দেয় কিন্তু কেও কেও পৃথিবী থেকে শুধু নেবার নয় ,পৃথিবীকে কিছু দেবার ও চেষ্টা করে ।দেবার চেষ্টা করা মানুষগুলো নিজেকে বিলিয়ে দেয় মানবতার সেবায় ।তারা পরিচিতির লোভে মানুষকে সাহায্য করে না বরং আত্মতৃপ্তির জন্যেই কাজ করে যায় ।চিত্তের আনন্দই থাকে তাদের উদ্দেশ্য ।আর কোন এক মহামানব বলেছেন চিত্তের আনন্দের থেকে বড় শান্তি আর কিছুতেই নেই।

এমনই একজন মানুষকে নিয়ে আমার আজকের লেখা যে তার পুরো জীবনই কাটিয়ে দিচ্ছেন আর্তমানবতার সেবায়।
সাকির ইব্রাহিম মাটি যিনি গুলিস্তানের পথশিশুদের কাছে মাটি ভাই নামেই পরিচিত । সবসময় ঠোটের কোণে একটুকরো হাসি ঝুলিয়ে রাখা মানুষটা ১৭ বছর বয়সেই নাম লিখিয়েছিলেন সেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে ।
১৯৯০ সালের ১৬ ই জুন বাগেরহাট সদরে নানাবাড়িতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ।তবে তার বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই।পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ।

শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ।কখনই তাকে ক্লাসের চতুর্থ স্থানে যেতে হয় নি , প্রথম থেকে তৃতীয় স্থানই তার বরাদ্দ ছিলো।সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত রায়েরবাগ এর ফুলকুড়ি স্কুলে পড়ে তিনি ভর্তি হন দনিয়ার বর্ণমালা স্কুল এন্ড কলেজে।দশম শ্রেণী পর্যন্ত তার রোল ছিলো ২/৩ ।মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে সব বিষয়ে প্লাস মার্ক পেয়ে ভর্তি হন দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজে।তার ভাষ্যমতে তিনি পুরো কলেজ জীবনই টেনেটুনে পাশ করে গিয়েছেন ।কিন্তু টেনেটুনে কেও উচ্চমাধ্যমিকে সব বিষয়ে প্লাস মার্ক পায় না এটা যে কেউ বুঝবে।সব বিষয়ে প্লাস পাওয়া ছেলেটার স্বপ্ন ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে পড়ার।চারুকলার সব দিকই ছিলো তার অত্যন্ত প্রিয়,ছোট থেকে আঁকতে পছন্দ করতেন ,সামাজিক কাজ করতে ভালোবাসতেন।কিন্তু পরিবারের চাপে তিনি বাংলার শ্রেষ্ঠতম মেধাবীদের অন্যতম কেন্দ্রস্থল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) এ পরীক্ষা দেন এবং চান্স পান ।যদিও ঢামেক এ পড়ার কোন ইচ্ছাই তার ছিলো না কিন্তু ছোটবেলা থেকেই পরিবারের বাধ্যগত হওয়ায় নিজের সব ইচ্ছে গুলোকে মাটিচাপা দিতে হয় তার । ঢামেক এ তিনি একে একে এনাটমি ফিজিওলজী, বায়োকেমিস্ট্রি, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনী ,ফরেনসিক মেডিসিন ,মাইক্রোবায়োলজি, কমিউনিটি মেডিসিন, প্যাথোলজি সহ সব কোর্স অত্যন্ত সাফল্যের সাথে শেষ করে এমবিবিএস হয়ে ঢামেক থেকে বের হন । ততদিনে তার পরিবার নির্ভরশীলতা কেটে গিয়েছে , অবশ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরই তিনি স্বনির্ভরশীল । ডক্টর হওয়া যেহেতু তার স্বপ্ন ছিলো না তাই তিনি আর মেডিকেল প্র‍্যাকটিস করেন নি।
তার পারিবারিক জীবন মোটেই সুখকর ছিলো না এবং সম্ভবত এখনও নেই।ছোটবেলা থেকেই তাকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মানসিক চাপের সম্মুখীন হতে হয়েছে। একজন স্বাভাবিক মানুষের ছোটবেলা থেকে পরিবার থেকে যে মানসিক চাহিদা থাকে তিনি তার ছিটেফোটাও পাননি। পাননি কোন বিষয়ে উতসাহ ।এই সমস্যাগুলো তিনি কাওকে জানতেও দেননি এবং এখনও তিনি তা নিজের মাঝেই আগলে রাখেন ।

নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবার একটা জেদ তার মধ্যে চেপে গিয়েছিলো যার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকে আজ পর্যন্ত পরিবার থেকে তিনি কোন আর্থিক সহযোগিতা নেন নি।ঢামেক এ পড়ুয়া অবস্থায় তিনি টিউশনি করে নিজের চাহিদাগুলো পূরণ করতেন ।থাকতেন ঢামেক এর ফজলে রাব্বি হলে যদিও তার বাসা থেকে ঢামেক এর দূরত্ব ছিলো মাত্র আধ ঘন্টার।শুধু টিউশনিই না ,নিজের খরচ যোগাতে তিনি কাজ করেছেন ট্রাভেল গাইড হিসেবেও।সেই দিন গুলি যে তার খুব ভালো কাটেনি সেটা বোঝাই যায়৷

সামাজিক কার্যক্রম বা সেচ্ছাসেবক হিসেবে তার হাতেখড়ি ঘটে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার পরই।  নিজের কিছু বন্ধুদের নিয়ে এলাকাতে “বাউণ্ডুলে” নামক একটি সংগঠন তৈরি করেন৷ সেখান থেকে নিয়মিত পেপার লাগানো ,মেডিকেল ক্যাম্পেইন করা ,রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা ,সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করা ,রোজায় গরীবদের ইফতার করানো ইত্যাদির মতো বিভিন্ন কাজ করতেন ।উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে ঢামেক এ ভর্তি হবার পর তিনি তার কাজকে নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে চাইলেন দেশব্যাপী কাজ করতে।ঢামেক এ পড়াবস্থায় যোগ দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন ক্লাবে এবং সন্ধানীতে ।যুক্ত ছিলেন চিলড্রেন কম্যুনিকেশন বাংলাদেশ নামক সংগঠনেও।বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক এনিমেশন কার্টুন ফেস্টিভ্যাল এর হেড অব প্রোগ্রাম ছিলেন তিনি।ঢামেক পরবর্তী সময়ে তিনি নিজেই একটা সংগঠন গড়ে তোলেন যার নাম ছিলো “গড়ব বাংলাদেশ” ।গড়ব বাংলাদেশ থেকে তিনি এবং তার সহকর্মীরা মিলে পথ শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করা ,মেয়েদের শারীরিক সমস্যা নিয়ে কাজ ,প্রত্যন্ত এবং দুর্ঘটনা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ এবং মেডিকেল ক্যাম্পেইন ,শীতের সময় গরীবদের শীতবস্ত্র বিতরণ এর মতো নানান ধরণের কাজ করেন৷ গড়ব বাংলাদেশে এক বছর কাজ করার পর তার সহপ্রতিষ্ঠাতার সাথে মতপার্থক্যের কারণে তিনি গড়ব বাংলাদেশে ছেড়ে দেন ।গড়ব বাংলাদেশের পথশিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণ টাই এবার তার মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে।কাজ শুরু করেন গুলিস্তান নাট্যমঞ্চের পার্কের ভাসমান বাচ্চাদের নিয়ে । যেই সময় টায় তিনি গুলিস্তান পার্কে কাজ শুরু করেন সেই সময়ে তার পাশে কেও ছিলো না । না ছিলো তার পরিবার ,না ছিলো হাতে হাত রেখে কাজ করার মতো বন্ধু।তবুও তিনি তার কাজ বন্ধ করেন নি ,ঝড় কিংবা তুফান ,প্রচণ্ড রোদ বা হাড় কাপানো শীত কোন কিছুই তার বাধা হয়ে দাড়াতে পারেনি।তিনি প্রতিনিয়ত গুলিস্তান পার্কে গিয়ে বাচ্চাদের পড়াতেন ,তাদের খোজখবর নিতেন।প্রতিটা বাচ্চাকে নিজের করে নিয়েছিলেন তিনি।পরবর্তী সময়ে গড়ব বাংলাদেশের ই এক সদস্য মার্জিয়া প্রভাকে নিয়ে তিনি আবারও নিজের একটি সংগঠন তৈরি করেন যার নাম “আলোকিত আগামী” । তারা দুজনে নিজ হাতে গড়ে তোলেন আলোকিত আগামীকে এবং সকল রকম বাধাকে তুচ্ছ করে সামনে এগিয়ে যান। সেই গুলিস্তান পার্কের বাচ্চাদের জন্যে তৈরি করেন “পথের স্কুল” নামক শিক্ষাক্ষেত্র আলোকিত আগামীর একটা প্রজেক্ট হিসেবে।এছাড়াও আরো অনেক প্রজেক্ট এখনও আলোকিত আগামীর চলমান রয়েছে ।উদাহরণস্বরূপ একটুস খানি কুইজ,ডোনেট এ প্যাড ফর হাইজিন বাংলাদেশ ,প্রজেক্ট কিশোর(নির্মাণাধীন), পথশিশুদের রিহ্যাবিলিটেশন । প্রজেক্টের বাহিরেও বিভিন্ন প্রোগ্রাম আলোকিত আগামীকে সাথে নিয়ে তিনি বাস্তবায়ন করেন।এর মধ্যে উউল্লেখ্যযোগ্য বন্যাদুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ,ফসলের বীজ দান ,বীজ গোলা তৈরি,বিভিন্ন জায়গায় মেডিকেল ক্যাম্পেইন ,শীতবস্ত্র বিতরণ, গরীব এলাকার মাটির স্কুলকে পাকা করে দেওয়া ,গরীব মহিলাদের সাবলম্বী হতে সাহায্য করা ইত্যাদি ।

জীবনের প্রথমদিক থেকেই সাধারণ সুবিধাবঞ্চিত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষটা একটা পর্যায়ে বেছে নিয়েছিলেন আত্নহননের পথ।কিন্তু যার দিকে তাকিয়ে এতগুলো মানুষের স্বপ্ন তাকে বোধহয় সৃষ্টিকর্তা নিজের কাছে ডাকতে চাননি।

আজও পথের স্কুলেত শ খানেক বাচ্চা মাটি ভাই বলতে পাগল ।তিনি কখনই পরিচিতি চাননি ,কাজের বদলে কোন লাভের আশা করেন নি,শুধু নিরলস ভাবে এইসব মানুষদের জন্যে কাজ করেই যাচ্ছেন ।

বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সয়াপ্রোটিন প্রজেক্ট লিমিটেডের হিউম্যান রিসোর্স এক্সিকিউটিভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন।নিজের শত ব্যস্ততায় ও ঠিকই সময় বের করে নেন তার দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষ গুলোর জন্যে।

তাকে যখন প্রশ্ন করা হয় আপনার লক্ষ্য কি তখন তার উত্তর আসে বেচে থাকা।অনেকটা হচকচিত হয়েই জিজ্ঞাসা করা মানে?তিনি বলেন এই বাচ্চাদের হাসিমুখই আমার বেচে থাকার খোরাক ,আমার সম্পদ ও সম্বল ।

একজন বাংলাদেশী হিসেবে আমার খুবই আফসোস আমরা এই মানুষদের যোগ্য সম্মান দিতে পারিনা ।তবুও এরা হাসিমুখেই কাজ করে যাবে আজীবন । হৃদয়েত অন্ততঃস্থল থেকে সম্মান জানাই এসব মানুষদের ।

তথ্যসুত্রঃ ডক্টর সাকির ইব্রাহিম

সাক্ষাৎকার গ্রহণঃ মাহমুদুল হাসান

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

বাংলাদেশ থেকেই বিদেশীরা কিনছে কঠিন রোগের ঔষধ

MP Comrade

তবু ভালোই চলছে দিন…খারাপ কি !

Fatematuz Zohora ( M. Tanya )

স্মার্ট ফার্মিং এ নতুন সংযোজন ড্রোন ব্যবহার

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: