অন্যান্য (U P) ছোট গল্প

অভাগীর মাতৃত্ব

সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছে।বৃষ্টি থামার যেন কোনো নামগন্ধ নেই।মফিজ এই কারনে স্কুলেও যেতে পারছে না।কি করেই বা যাবে,তার যে ছাতা কিনার পয়সাও নেই।মফিজের বয়স ১২ বছর।সে ক্লাস সেভেনে পড়ে।স্কুলে তাকে নিয়ে সবাই ঠাট্টা করে।কারন সে প্রতিদিন একই জামা গায়ে দিয়ে যায়।তাও জামাটার অবস্থা খুবই শোচনীয়।পায়ে জুতা থাকে না।চুলগুলো এলোমেলো।যার এই অবস্থা সে আর বৃষ্টির মধ্যে স্কুলে যাবেই বা কি করে।আজও বৃষ্টি হচ্ছে।তাই মফিজ বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে আছে।পাশে বসে কাঁঁথা সেলাই করছেন তাঁর মা অভাগী।তাঁর মায়ের নাম ছিল আমেনা।কিন্তু এখন অভাগী নামেই গ্রামের সবাই তাকে চিনে।তাঁর নাম অভাগী হওয়ার পেছনে অনেকগুলা কারন রয়েছে।

অভাগীর বয়স যখন ৮ বছর তখন তাঁর মা মারা যান।তাঁর বাপ ছিল আধমাতাল।মদ,গাঞ্জা,সিগারেট কিছুই বাদ যেত না।অভাগীর বয়স যখন ১৪ বছর হলো তখন বৈশাখের এক ঝড়ের রাতে জসীম এসে তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল।জসীম হলো হাশেম খান(অভাগীর বাবা)এর নিত্যদিনের অসৎসঙ্গী।অসৎ এই জন্য যে দুজনে মিলে বেশ ফুর্তি করেই নেশা করেন।জসীমের বয়স ৪০ বছর,হাশেম খানের থেকে বছর নয়েক ছোট।সে আজ ঝড়ের কবলে হাশেম খানের বাড়িতে এসে উঠেছে।দুজনে বসে এবারেও মদ গিলছে।সিগারেট জ্বালানোর দিয়াশলাই খুঁজে না পেয়ে হাশেম তাঁর মেয়েকে ডাক দেয়।অভাগী এসে দিয়াশলাই দিয়ে যায়।চোখে চোখ পড়ে জসীম আর অভাগীর।প্রথম দেখেই অভাগীকে ভালো লেগে যায় জসীমের।সে হাশেম খানের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেয়।হাশেম খান তখনি রাজি হয়ে যান।আড়াল থেকে সব শুনছিল অভাগী।তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।তাঁর থেকে প্রায় ২৫ বছরের বড় জসীমকে কিভাবে বিয়ে করবে সে?ঘরে দোর দিয়ে কাঁদতে থাকে অভাগী।পরের দিন সকালে হাশেম খান তাঁর মেয়েকে জসীমের কথা বলেন।বিয়ে করার নূন্যতম ইচ্ছা না থাকলেও তখন বাবার কথায় রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তাঁর।কারন বাবার মুখের উপর কথা বলার দুঃসাহস তাঁর নেই।নিজের অমতেই বিয়ে হয়ে গেল অভাগীর।বাবার ঘর থেকে বিদায় নিল স্বামীর আদরে মনের কষ্ট দূর করবে ভেবে।বিয়ের পর কয়েকদিন ভালো কাটলেও বিয়ের দুই মাসের মাথায় জসীম আরেকটা বিয়ে করে বউ নিয়ে ঘরে এলো।

সতীন নিয়ে ঘর করা খুব কষ্টসাধ্য হলেও অভাগীর আর কোনো উপায় ছিল না।সতীনের কটু কথা শুনে গা জ্বালা করত।কিন্তু নিরবে তা সহ্য করতে হতো তাঁর।একটু প্রতিবাদ করতে গেলেই স্বামী জসীম তাঁর চুল ধরে উঠোনে আছরে ফেলত।এভাবেই কেটে গেল দেড় বছর।শ্রাবনের মাঝামাঝি এক সকালে অভাগী একটু পর পর বমি করতে থাকল।তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ ছিল না।তাঁর সতীন যেন সে মরলেই বাঁচে।তবে আজ কি মনে করে জসীম গ্রামের বৃদ্ধ কবিরাজকে নিয়ে এল।কবিরাজ অভাগীকে খানিকক্ষন দেখে বললেন সে মা হতে চলেছে।জসীম আর রাহেলার(জসীমের দ্বিতীয় বউ)মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল।তাঁরা চায় না অভাগীর সন্তান জসীমের পরিচয়ে বড় হোক।তাহলে রাহেলার সন্তানের কি হবে?তাই সেদিন রাতেই অভাগীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় তাঁরা।সেই রাত থেকেই অভাগীর জীবনে শুরু হয় নতুন অধ্যায়।সে তাঁর মনকে শক্ত করে নেয়।এক সুদখোরের বাড়িতে কাজ করা শুরু করে।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস চার মাস কাজ করেই তাকে সেখান থেকে বিদায় নিতে হয়।পোয়াতি কাজের লোক রাখবে না বলে জানায় বাড়ির মালিক।এবার অভাগীর বাঁচা কঠিন হয়ে পড়ে।সে মৃত্যুভয় করে না।কিন্তু তাকে বাঁচতে হবে তাঁর পেটের বাচ্চার জন্য।তাই সে জল খেয়ে দিন কাটাতে থাকে।কিন্তু জল খেয়েতো আর বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়।দুইদিন পরই তার শরীর খারাপ করে।সে গাছের ছায়ায় নিস্তেজ হয়ে বসে থাকে।তখনি এক বৃদ্ধা মহিলার তাকে এই অবস্থায় দেখে দয়া হয়।তিনি তাকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান।

তখন অভাগী ৬ মাসের পোয়াতি।বৃদ্ধার ঘরে আড়াই মাস খুব ভালোই কাটায় অভাগী।রবিবারের এক সন্ধ্যায় তাঁর প্রসব বেদনা উঠে।বৃদ্ধ মহিলার সহায়তায় অভাগীর মাধ্যমে পৃথিবীতে আসে এক নতুন শিশু।এই শিশুর নামই মফিজ।পরে মফিজকে অনেক কষ্টে বাড়িতে বাড়িতে কাজ করে আজ এত বড় করেছে অভাগী।তাঁর স্বামী রাহেলাকে নিয়েই সংসার করছে।কোনো খবর নেয় নি তাঁর।তবুও সে হাল ছাড়ে নি।তাঁর ইচ্ছা মফিজকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবে।সেজন্য তাকে যা যা করতে হয় সে সব করবে।মফিজের আদর্শ মা হয়ে উঠবে সে।মফিজের মধ্যেই বেঁচে থাকবে অভাগীর মাতৃত্ব।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

গুগল আই/ও ২০১৭

Arjun Kumar Bose

জিমে না গিয়ে বাসায় ব্যায়াম করে শরীর ১০০% ফিটনেস রাখার উপায়

Muhammad Uddin

“মা”। সত্যিকারের ভালাবাসা।

asifobayed

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: