Now Reading
প্রাণঘাতী রোগ ‘ম্যালেরিয়া’ মোকাবেলায় বিগত ৬০বছরের মধ্যে অনুমোধন পেল নতুন ট্যাবলেট



প্রাণঘাতী রোগ ‘ম্যালেরিয়া’ মোকাবেলায় বিগত ৬০বছরের মধ্যে অনুমোধন পেল নতুন ট্যাবলেট

ম্যালেরিয়া একটি প্রাণঘাতী জেনোটিক রোগ। নেচার মাইক্রোবায়োলজি নামের এক জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার বছর পূর্বে ম্যালেরিয়া নামক এই জীবাণুটি রোগের নতুন একটি শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে যা মানব শরীরকে নতুন আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করে মানবজাতির জন্য মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরে তখন এমন একটি জিনগত পরিবর্তন ঘটে যার ফলে ম্যালেরিয়ার জীবাণু মানব শরীরের লোহিত কণিকায় আক্রমণ করতে পারে।  তবে মানব শরীরে সংক্রমণ-কারী প্রজাতি হিসেবে ম্যালেরিয়ার আবির্ভাব তিন থেকে চার হাজার বছর আগে। ম্যালেরিয়ার জীবাণু শুধু যে মানব শরীরেই প্রবেশ করছে তা কিন্তু নয়, সেখানে থেকে যাচ্ছে এবং মশার মাধ্যমে তা পরিবাহিত হচ্ছে। ‘প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম’ হল ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহনকারী পরজীবী বা প্যারাসাইট যা বিশ্বজুড়ে এই স্বাস্থ্য সংকটের জন্য মারাত্মক রকমের দায়ী। অ্যানোফিলিস নামক এক প্রকার স্ত্রী মশার কামড়ে মানুষের দেহে ম্যালেরিয়া ছড়ায় যা বহু মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়ায়।  এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বিগত ২০১৬ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই লোকই ছিলেন প্রাণঘাতী ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন জায়গা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। অবশ্য বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব কমেছে, কোনকোন ক্ষেত্রে স্থিতিশীল অবস্থাও বিরাজ করছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ ম্যালেরিয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় এর প্রাদুর্ভাব বেশি। এর বিশেষ কারণ হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার জলবায়ু, সেখানকার জঙ্গল এবং পাহাড়ি ভৌগলিক বৈশিষ্ট্য ম্যালেরিয়ার মশা বিস্তারের জন্য বিশেষ উপযোগী। অবশ্য পার্বত্য এলাকার ভারতীয় সীমান্ত এলাকাতেও ঠিক একই ধরনের প্রবণতা রয়েছে। জঙ্গল এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ার পার্বত্য চট্টগ্রামে সহজে ম্যালেরিয়ার বিস্তার রোধ কার্যক্রম চালানো বেশ কঠিন। বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাগুলো ছাড়াও অন্যান্য জেলায় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব লক্ষণীয়। এছাড়াও মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকাগুলোতেও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব অনেকটাই বেশি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিবর্তনের ফলে ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশার সংখ্যাবৃদ্ধি এর একটা বড় কারণ। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত দুই দশকে ম্যালেরিয়ায় সংক্রমণের হার কমে গেলেও, পুনরায় এখন তা ফিরে আসতে শুরু করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারই বিশ্বে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়া লোকের সংখ্যা কমছে না বরং বেড়েছে। ফলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যে প্রাণঘাতী এই রোগটি আবার জোরেশোরেই ফিরেছে। সমীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রতিবছর ২০ কোটিরও বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এই রোগের কারণে প্রাণ হারিয়েছে আর তাদের একটি বড় অংশই ছিল পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুরা।

ম্যালেরিয়ার এই মারাত্মক ঝুঁকির সময়ে নতুন করে আনন্দের বার্তা বয়ে এলো। বিগত  ৬০ বছরের মধ্যে এই প্রথম উদ্ভাবিত হল ট্যাফেনোকুইন নামের এক ধরণের ট্যাবলেট যা ম্যালেরিয়ার চিকিৎসায় ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। যদিও ঔষধ হিসেবে ট্যাফেনকুইন সত্তরের দশক থেকেই বিদ্যমান, নতুনভাবে গবেষণা করে এটিকে পুনরায় নেয়া হলো লিভারে থাকা ম্যালেরিয়ার জীবাণু থেকে রক্ষা পেতে। গবেষকদের মতে এই ঔষধটি বিশেষ ভাবে কার্যকরী যা লিভারে লুকিয়ে থাকা ম্যালেরিয়ার জীবাণু ধ্বংস করে আক্রান্তকারীর শরীরে পুনরায় জীবাণু জেগে ওঠা রোধ করবে। ম্যালেরিয়া লিভারের মধ্যে বহু বছর ধরে থেকে যেতে পারে, তাই এর প্রতিরোধে ট্যাফেনোকুইন ট্যাবলেটকে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment