Now Reading
শ্রাবণের বৃষ্টি ধারায় হয়তোবা আস্ত সব কয়লা গেল ক্ষয়ে..!



শ্রাবণের বৃষ্টি ধারায় হয়তোবা আস্ত সব কয়লা গেল ক্ষয়ে..!

বর্তমান সময়ের আলোচিত বিষয়ের অন্যতম হচ্ছে কয়লা গায়েব এর বিষয়টি। কয়লা এ আর এমন কি জিনিস? কচকচে কালো আর আগুনে পোড়াইলে ছাই। এ নিয়ে মাতামাতির কি আছে? আমারো যে এ ব্যাপারে এমনি এমনি আগ্রহ জন্মেছে তা কিন্তু নয়। আমি ভাবছি এত বিপুল পরিমাণ কয়লা সরাতে কি পরিমাণ ট্রাক লেগেছে এবং সময়ও বা কতটুকু লেগেছে! দিনাজপুরের বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির ডিপো থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে গেল যা কিনা কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতসারে। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে কয়লা যাবে কোথায়? কৌতূহল বশত বার কয়েক মনে সন্দেহ দেখা দিল, শ্রাবণের বৃষ্টিতে তা ধুয়ে কিংবা ক্ষয়ে যায়নিতো? কয়লা কোন  পথে ক্ষয়েছে বা গেছে তা খোঁজার জন্য কমিটি হয়েছে বটে। কিন্তু প্রশ্ন খোঁজার পদ্ধতি কি? আদৌ কি এ কয়লা ডিপোতে ফিরে আসবে? ডিপোর নথিপত্রের হিসাব অনুযায়ী, খনি হতে উত্তোলন করার পর কয়লা যেখানে স্তূপাকারে রাখা হয় সেই জায়গায় কয়লা থাকার কথা প্রায় দেড় লাখ টন। এর বিপরীতে সেখানে কয়লা পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ছয় হাজার টনের কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রায় এক লাখ ৪২ হাজার টন মত কয়লা হাওয়া, এর কোনো হদিসই নেই। গায়েব হয়ে যাওয়া এই কয়লার বাজার মূল্য প্রায় ২২৭ কোটি টাকা। উত্তোলন করা কয়লার প্রধান গ্রাহক হলো বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। এদিকে কয়লার অভাবে দেশের একমাত্র এই কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার জোগাড়। দেশের একমাত্র কয়লাভিত্তিক এ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সচল রাখতে এবং এর পূর্ণ মাত্রায় উৎপাদনে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার টন কয়লা প্রয়োজন হয়।

যেটা নিয়ে শুরুতে আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছে তা হল এর পরিমাণের ব্যাপকতা। সাধারণত কয়লা পরিবহণে যে ট্রাক ব্যবহার করা হয় তা দিয়ে এই প্রতি ট্রাকে ১০ টন করে হলেও, কমপক্ষে ১৪ হাজার ট্রাকের প্রয়োজন হবে ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা পরিবহনের জন্যে। তার মানে দাড়ায় এই বিপুল পরিমান কয়লা একদিনে লোপাট হয়নি হয়েছে দিনের পর দিনে।

যেভাবে ধরা পড়েছে কয়লা লোপাটের বিষয়টিঃ

বড়পুকুরিয়ার এই কয়লা খনিটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পরবর্তীতে কখনোই খনির কোল ইয়ার্ড (কয়লা মজুদ কেন্দ্র) খালি হয়নি। অর্থাৎ একদিকে খালি হলেও পুনরায় তা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা দ্বারা ভরাট হয়ে যেত। এদিকে খনির কূপে উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং যন্ত্রপাতি সংস্থাপন ও স্থানান্তর জনিত কারণে গত ২৯ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া খনির কয়লা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পুনরায় কয়লা উত্তোলন শুরু হবার কথা রয়েছে আগস্ট মাসের শেষের দিকেই। এদিকে উৎপাদন বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরেই কোল ইয়ার্ডে বিপুল পরিমাণ কয়লার ঘাটতি পড়ে যায়। খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এতদিন তা সমন্বয় করেনি এবং কোল ইয়ার্ড খালি না হওয়ায় বিষয়টি ধরাও পড়েনি। কোল ইয়ার্ডে নতুন মজুদ যোগ না হওয়ায় এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতির বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। আর বিষয়টি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পেট্রোবাংলাকে জানালে কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার বিষয়টি জনসম্মুখে আসে। খনি হতে উত্তোলিত কয়লার সবচেয়ে বড় গ্রাহক বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হলেও স্থানীয় ইট ভাঁটা এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, চা বাগান ও অন্য ব্যবহারকারীরাও কয়লা কিনে থাকে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের অনুসন্ধানী রিপোর্ট বলছে, খনির কয়লা বিপননের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ইটভাটা মালিকদের কাছে কয়লা বিক্রিতে অধিক সাছন্দ্য বোধ করেন। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি টন কয়লা বিক্রি হয় ১১ হাজার টাকা দরে বিপরীতে ইটভাটায় কয়লা বিক্রি হয় প্রতি টন ১৭ হাজার টাকায়। জানা যায় কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী কর্মকর্তারা বিক্রয়ের লভ্যাংশের উপর কমিশন পান ফলে বেশি দামে কয়লা বিক্রিতে কমিশনও বেশি পাওয়া যায়। তাই খনির কয়লা বিপনন কর্মকর্তাদের কাছে ইট ভাঁটাই কয়লা বিক্রির উত্তম ক্ষেত্র। বিশেষ করে ইট তৈরির সিজনে খনির এই বিপনন কর্মকর্তারা দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা না করেই অধিক হারে ইট ভাঁটায় কয়লা বিক্রি করে থাকেন। কথা হচ্ছে তাও ঠিক থাকত অথবা মেনে নেয়া যেত যদি সরকারী নথিতে আদৌ তা বিক্রি হিসেবে উল্ল্যেখ থাকত। কিন্তু কাজীর গরু খাতায়ও নেই আবার গোয়ালেও নেই। বিভিন্ন প্রাপ্ত সুত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী কয়লা ক্রয়ের পূর্বে ক্রেতা টাকা জমা দিয়েই কর্তৃপক্ষ হতে দুই কপি ডিও (বিলি আদেশ) প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যার একটি ডিও কয়লা ইয়ার্ডে জমা দেওয়ার পর সে অনুযায়ী ক্রেতা কয়লা সরবরাহ পেয়ে থাকেন। আর জোচ্চুরি করার সুযোগটা থাকে এখানেই। স্থানীয় সিন্ডিকেট এবং কয়লা বিপননকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তৈরি করা হয় দুই রকম ডিও। যার একটিতে পরিমাণে দেখানো হয় কম এবং অন্যটি বেশি। স্বাভাবিকভাবেই কারো বুজতে অসুবিধা হবেনা যে, কম পরিমাণ ডিওটাই সরকারি নথিপত্রে উল্ল্যেখ করা হয়। বাকী যে ডিওটি থাকে সেটি হচ্ছে জাল ডিও যেটি ডিপোর ক্লিয়ারেন্স হিসেবে দেখানো হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, সরকারি ডিওতে ১০ টন কয়লা উল্লেখ থাকলেও জাল ডিওতে অাদেশ থাকে ৫০ টন কিংবা তারও অধিক কয়লা সরবরাহের। আর এভাবেই হয়ত লোপাট হয়ে গেল ১৪ হাজার ট্রাকে ধারণ সম্পন্ন এক লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা। তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ দয়া করে আবার বলবেন না যেন, কয়লা উড়ে গেছে কিংবা শ্রাবণের বৃষ্টি ধারায় ক্ষয়ে গেছে। এমন দায়সাড়া বক্তব্য বা রিপোর্ট জনগণের প্রত্যাশার ধারে কাছেও নেই।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment