সাধারন জ্ঞান

স্কাউটিং কি ও কেন? (পর্ব ১)

স্কাউটিং হল একটি সামাজিক আন্দোলন যার প্রধান উদ্দেশ্য আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষা দান করা। স্কাউটিং এর মাধ্যমে একজন ছেলে বা মেয়ে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠার  প্রয়াস লাভ করে। স্কাউটিং এর মধ্যে লুকিয়ে থাকে অপার আনন্দ যার স্বাদ নিতে হলে যোগদান করতে হবে এই আন্দোলনে। ১৯০৭ সালে স্যার রবার্ট স্টিফেন্সন স্মিথ লর্ড ব্যাডেন পাওয়েল অফ গিলওয়েল সংক্ষেপে বি.পি এই আন্দোলনের শুরু করেন। আসুন জেনে নিই বাংলাদেশের স্কাউটিং মুভমেন্ট কিভাবে পরিচালিত হয়।

বাংলাদেশ স্কাউট আন্দোলন প্রধানত তিনটি শাখায় বিভক্ত। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৬ থেকে ১০+ বয়সী শিশুদের কাব স্কাউট, স্কুল ও মাদ্রাসার ১১ থেকে ১৬+ বয়সী বালক-বালিকাদের স্কাউট এবং কলেজ বিশ্ববিদ্যলয়ের ১৭-২৫ বয়সী যুবক রোভার স্কাউট বলে। তবে রেলওয়ে, নৌ এবং এয়ার অঞ্চলের চাকরিজীবিদের জন্য এই বয়সসীমা কিছুটা শিতীলতা করে ৩০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে মুক্তদল। স্কাউটিং-এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিশু, কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং সামাজিক গুণাবলী উন্নয়নের মাধ্যমে তাদেরকে পরিবার, সমাজ দেশ তথা বিশ্বের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। উৎসাহী বয়স্করা বিভিন্ন ট্রেনিং নিয়ে ইউনিট লিডার এবং অন্যান্য কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকমন্ডলী বাংলাদেশ স্কাউটসের অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট রয়েছেন।

স্কাউট কার্যক্রমে কতকগুলি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়: হাতেকলমে কাজ শেখা;  ছোট-দল পদ্ধতিতে কাজ করা; ব্যাজ পদ্ধতির মাধ্যমে কাজের স্বীকৃতি প্রদান; মুক্তাঙ্গনে কাজ সম্পদান, তিন আঙ্গুলে সালাম ও ডান হাত করমর্দন, স্কাউট পোশাক, স্কার্ফ ও ব্যাজ পরিধান এবং সর্বদা স্কাউট আইন ও প্রতিজ্ঞা মেনে চলা। স্কাউটদেরকে আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ব্যাডেন পাওয়েলের নির্দেশিত নিয়ম অনুসারে অনুশীলন, প্রতিজ্ঞাপাঠ ও দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে স্কাউট আন্দোলনে সদস্য হতে হয়। স্কাউটদের মটো বা মুলমন্ত্র হচ্ছে: কাব- যথাসাধ্য চেষ্ট করা; স্কাউট- সদা প্রস্ত্তত; এবং রোভার- সেবাদান। স্কাউট কার্যক্রমে রয়েছে: সাপ্তাহিক ক্লাশ, ক্যাম্প ও হাইকিং, কমডেকা এবং বড় সমাবেশ যথা ক্যাম্পুরি (কাবদের), জাম্বুরি (স্কাউটদের) ও মুট (রোভারদের) আয়োজন করা হয়ে থাকে জাতীয়, আঞ্চলিক, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে (এগুলি আন্তর্জাতিকভাবে) বিশ্ব স্কাউট সংস্থাও করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন সমাজ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বিভিন্ন গ্রুপ ও জেলা পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপন, টিকাদান, স্যানিটেশন ও পরিবেশ সংরক্ষণ, জ্বালানি-সাশ্রয়ী চুলা, এবং বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় স্কাউটদের সেবাদান কর্মসূচি বাংলাদেশের মানুষ সর্বদাই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

বাংলাদেশ স্কাউটস  বাংলাদেশের জাতীয় স্কাউটিং সংস্থা। ১৯৭২ সালের ৮-৯ এপ্রিল সারাদেশের স্কাউট নেতৃবৃন্দ ঢাকায় এক সভায় মিলিত হয়ে গঠন করেন বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি। ঐ বছরের ৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ১১১ নং অধ্যাদেশ বলে (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭২, সোমবার) উক্ত সমিতি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্ব স্কাউট সংস্থা (WOSM) ১৯৭৪ সালের ১ জুন বাংলাদেশ স্কাউট সমিতিকে ১০৫ তম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে ১৯৭৮ সালের ১৮ জুন পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিল সভায় সমিতির নাম বদলে রাখা হয় বাংলাদেশ স্কাউটস। বাংলাদেশ স্কাউটস কার্যক্রম শুরু করেছিলো মাত্র ৫৬,৩২৫ জন সদস্য নিয়ে। ১৯৭৮ সালে সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে সকল স্তরের জন্য ট্রেনিং কোর্সসমূহ পরিচালনার মাধ্যমে ১৯৮৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৫ লাখে উন্নীত হয়। এরপর বাংলাদেশ স্কাউটস ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে গ্রহণ করে স্ট্রাটেজিক প্ল্যান- ২০১৩। এ প্ল্যানে স্কাউটদের শুধু সংখ্যাবৃদ্ধিই নয়, গুণগত মান অর্জনেরও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়। ৬টি অগ্রাধিকার ভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভলেন্টিয়ার লিডার ও স্কাউটারবৃন্দ সমন্বিতভাবে ২০১৩ সালের মধ্যে ১৫ লক্ষ স্কাউট তৈরির চেষ্টা করেছেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৩ সালের মধ্যে স্কাউটের সংখ্যা ১২,৮৫,৬০৭ এ পৌঁছেছে যা বাংলাদেশকে বিশ্ব স্কাউট সংস্থায় ৫ম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশ স্কাউটসের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পরিষদ হচ্ছে জাতীয় স্কাউট কাউন্সিল। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও চিফ স্কাউট এ কাউন্সিলের প্রধান। স্কাউট জাতীয় কাউন্সিলের সভা প্রতিবছর সদর দফতরে আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে প্রতি তৃতীয় বছরের সভায় প্রধান জাতীয় কমিশনার ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্যান্য সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন।

প্রধান জাতীয় কমিশনার হচ্ছেন বাংলাদেশ স্কাউটসের প্রধান নির্বাহী রয়েছেন ১৫ জন জাতীয় কমিশনার এবং ৩০ জন জাতীয় উপ-কমিশনার। দেশব্যাপি স্কাউট আন্দোলনের সার্বিক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত প্রায় ৫০ জন স্কাউট এক্সিকিউটিভ রয়েছেন। বাংলাদেশ স্কাউটসের যাবতীয় কার্যক্রম, যথা: নীতিনির্ধারণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, মনিটরিং, মূল্যায়ন, যোগযোগ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ইত্যাদি কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় অবস্থিত জাতীয় সদর দফতর, স্কাউট ভবন থেকে পরিচালিত হয়ে থাকে। অবশ্য দেশব্যাপি সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো সুষ্ঠু পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্কাউসকে ১২টি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেটে ৮টি, শিক্ষা বোর্ডভিত্তিক এবং রোভার, রেলওয়ে, নৌ এবং এয়ার  এই বিশেষ অঞ্চল ৪টির দফতর ঢাকায় অবস্থিত। স্কাউটদের এ সকল কার্যক্রম এবং বিভিন্ন ট্রেনিং এর জন্য বিভিন্ন ব্যাজ প্রদানের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেয়া হয়। স্কাউটের তিনটি শাখার জন্য সর্বোচ্চ ব্যাজ হচ্ছে: শাপলা কাব, প্রেসিডেন্ট’স স্কাউট এবং প্রেসিডেন্ট’স রোভার স্কাউট। অ্যাডাল্ট লিডারদের স্কাউটিং এ অবদান রাখার জন্য তাঁদেরকেও বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ হচ্ছে রৌপ্য ব্যাঘ্র এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হচ্ছে রৌপ্য ইলিশ। বিশ্ব স্কাউট সংস্থাও বিভিন্ন দেশের অসাধারণ স্কাউটারদের দিয়ে থাকে ব্রোঞ্জ উলফ ব্যাজ। তবে এ ব্যাজ খুব কম সংখ্যক স্কাউটই পেয়ে থাকেন। ১৯৩৫ সনের ২ আগস্ট লর্ড ব্যাডেন-পাওয়েলকে সর্বপ্রথম এই ব্যাজ প্রদান করা হয়েছিল।

যোগদান করেই একজন স্কাউট হয়ে ওঠা যায় না। এর জন্য থাকতে হবে একাত্মতা। তাহলেই খুঁজে পাওয়া যাবে এর আনন্দ। কিছুদিন এর শিক্ষার পর শপথ পাঠের মাধ্যমে একজন ছেলে বা মেয়ে হয়ে ওঠে স্কাউট সদস্য, পরতে পারে স্কাউট পোশাক, লাগাতে পারে সদস্য ব্যাজ এবং গলায় নিজ দলের স্কার্ফ। এরপর সে পার করে প্রতিটি স্তর এবং খুঁজে পায় নানান বিষয়।

স্কাউটিং এ রয়েছে অনেক দিক। কিছু দিক যেমনঃ ক্যাম্পিং, হাইকিং, ট্র্যাকিং, ফার্স্ট এইড, দড়ির কাজ, পাইওনিয়ারিং, রান্না, অনুমান, খেলা এবং আরও কত কি। মজার মজার এসব বিষয় শিখে ফেলা যায় নিজের অজান্তেই। এমনকি কিছু বিষয়ে হয়ে ওঠা যায় পারদর্শী। তখন সে অনুযায়ী পোশাকে লাগানো যায় নিত্য-নুতুন ব্যাজ। এই অর্জনকে ব্যাজ নয় স্কাউট পোশাকের অলংকার বলেছেন বি.পি। পাত্র ছাড়া রান্না কিংবা দড়ি দিয়ে কিছু তৈরি করতে পারার মজা আর কোথাও নেই। এমনকি কোন কম্পাস ছাড়াই দিক নির্ণয় অথবা অনুমান করে বলে দিতে পারা যায় কোন কিছুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ কিংবা উচ্চতা। তাঁবুতে থাকার অভিজ্ঞতা আর হেঁটে হেঁটে প্রকৃতির সাথে চলা – এক নুতুন জীবন এর স্বাদ এনে দেয় স্কাউটিং। যান্ত্রিক জীবনের আড়ালে হারিয়ে যায় সকল ইচ্ছা, চলে যায় নতুন এর স্বাদ। স্কাউটিং ফিরিয়ে আনে সেই ইচ্ছাগুলো। আর সকল কাজে এনে দেয় উৎসাহ।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

দীর্ঘায়ু প্রাপ্ত জনপ্রিয় কিছু পোষা প্রাণীর সন্ধানে

MP Comrade

মরুভূমিতে জাহাজের সমাধিক্ষেত্র !

Abdullah-Al-Mahmood Showrav

পেরুর রহস্যময় ‘ফুটন্ত নদী’ নামলেই মৃত্যু অনিবার্য

Sharmin Boby

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy