আন্তর্জাতিক

পরস্পর বিরোধী তিন দেশের প্রত্যেকেই চীনের পরম মিত্র

মধ্যপ্রাচ্যের তিন শক্তিধর দেশ ইরান, সৌদি আরব আর ইসরায়েল পরস্পর বিপরীত শিবিরে অবস্থান করছে দীর্ঘদিন ধরেই। শুধু বিপরীত শিবিরে বলা হলে কম বলাই হবে এরা প্রত্যেকেই একে অপরের ঘোরতর শত্রু। ব্যাপারটা এমনযে তাদের ভেতর আদতে কোন সুসম্পর্কই নেই আর যা দেখা যায় তা বেশ বৈরী ভাবাপন্ন। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো এই তিনটি রাষ্ট্রই চীনের সাথে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। হিসেব যদিও কিছুটা জঠিল কিন্তু সাধারণের বুজতে অসুবিধা নেই এই বৈপরীত্যের।  মধ্যপ্রাচ্যে চীনের তিনটি লক্ষ্য – জ্বালানি নিরাপত্তা, হাই টেক সেক্টরে বাণিজ্যের সুযোগ, এবং বেল্ট এ্যান্ড রোড উদ্যোগে বিনিয়োগ। এগুলোর সাথে ইরান, ইসরায়েল এবং সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারটা মিলে যায়। বিশ্ব বেশ পূর্ব হতেই দুই শিবিরে বিভক্ত যার একটার নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যটির রাশিয়া ও চীন। কোন দেশ যদি অন্যদেশের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে কিংবা যুদ্ধংদেহীভাব প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে দেখা যায়যে কোন পক্ষকে দুই শিবিরের কেউ সমর্থন দিলে অন্য পক্ষকেও শিবিরের অপর পক্ষ সমর্থন প্রদান করে। এটা কেবল যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করা দেশ সমূহতেই প্রযোজ্য হয়। আসুন ফেরা যাক মূল জায়গায় যেটা নিয়ে শুরুতেই আলোকপাত করেছি। সৌদি আরব, ইরান আর ইসরায়েল প্রত্যেকেরই মধ্যে রয়েছে অপরের সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস এবং তিক্ততা। তারা একে অপরকে যেভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে শাসিয়ে থাকে তাতে যেকোন মুহূর্তে পরস্পরের ভেতর একটি যুদ্ধের সম্ভাবনা বিরাজ করে।  দেখা যায়যে পরস্পর বিরোধী দুই দেশের মধ্যে ইরান হচ্ছে শিয়া আর সৌদি আরব হচ্ছে সুন্নি মতাদর্শের মুসলিমদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু অপর তিন মুসলিম প্রধান দেশ সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনে তারা তাদের মিত্রদের দিয়ে পেছন থেকে প্রক্সি যুদ্ধ লাগিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে ইরান এবং সৌদি আরব দুটি দেশই ইসরায়েলের কট্টর সমালোচক এবং এই ইহুদী রাষ্ট্রটির সাথে কোন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কই রাখেনি। অন্যদিকে ইরানের দাবী করা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে এক প্রকার হুমকি বলেই মনে করে ইসরায়েল আর সৌদি আরব। সৌদি আরব এবং ইসরায়েল আবার আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরানের প্রধান শত্রুতে পরিণত আজ। চীন আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শীতল যুদ্ধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ইরানের সাথে চীনের সুসম্পর্ক দেখে অনেকেই ভাবেন অপর দুইদেশের পক্ষেতো রয়েছে আমেরিকা। এটা একদমই ভুল ধারণা, মধ্য প্রাচ্যের এই বিষয়টিতে চীন একটু অন্যভাবে রাজনীতি খেলছে। সৌদি আরব এবং ইসরায়েল এর সাথেও রয়েছে চীনের সুসম্পর্ক। এই তিন শক্তির আঞ্চলিক বৈরিতা চীনের সম্পর্কের উপর কোনরুপ প্রভাবই ফেলে নি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে চীন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিধর দেশগুলোর ক্ষেত্রে দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেছে। চীন মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করলেও চীনের মত কোন শর্ত জুড়ে দেয়নি। চীন বারবারই বলে এসেছে কোন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিংবা মতাদর্শ পরিবর্তনে তারা প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী নয়।

এদিকে দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দেশগুলোর সাথে চীনের রাষ্ট্রীয় সফর বিনিময় হয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি জুন মাসের শুরুতেই চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং এর সাথে সাক্ষাৎ করে এসেছেন । উল্লেখ্য যে, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর আন্তর্জাতিক যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছিল ঠিক সেসময়ই চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এমনকি ইরাক-ইরান যুদ্ধকালীন চীন ছিল ইরানের অস্ত্রের প্রধান উৎস। এছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে চীন এগিয়ে এসেছে ইরানকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিতে। বিনিময়ে চীনও সুবিধা আদায় করে নিয়েছে, তারা ইরানের তেল আমদানির পথ প্রসস্থ করেছে। ইরানকে বন্ধু ভাবা কিংবা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেয়ার পেছনে চীনের কিছু নীতিগত বৈশিষ্ট স্পষ্ট। প্রধান কারণ হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য ইরানের অবস্থান এমন এক জায়গায় যেখানে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যখান বরাবর এবং  তা চীনের ‘বেল্ট এ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ নামে বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীন এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা বিবেচনা করে এটিকে বাণিজ্যের নতুন করিডোর বানাতে তৎপর। এদিকে “ইরান ডিল” নামক পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাম প্রত্যাহারে কার্যত লাভ হয়েছে চীনেরই। কেননা ইরানে পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ফলে তাদের সে শূন্যস্থান পূরণ করতে মরিয়া চীনা কোম্পানিগুলো। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগের নতুন কৌশলও নির্ধারণ করতে চলেছে চীন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চিত্রটা একটু ভিন্ন বটে, জাতিসংঘে উত্তাপিত অনেক বিষয়ে যদিও চীন বরাবরই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমানে ইসরাইলেও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে চীন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও চীনের সাথেও দ্রুত গতিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলও ভিসা অবমুক্ত করে দিয়েছে চীনা পর্যটকদের জন্য, ফলে বছরে গড়ে প্রায় লক্ষাদিক চীনা নাগরিক সেখানে ভ্রমণ করছেন। উচ্চ প্রযুক্তি সেক্টরে ইসরায়েলে প্রায় ১৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। গত বছর চীন সফর করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বিনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি তার বাণিজ্যিক এই সফরে দুদেশের মধ্যে ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের চুক্তি সম্পাদন করেছেন।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই নীতি অনুসরণ করছে চীন যদিও তারা ভালভাবেই জানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের পরম মিত্র। চীন মধ্যপ্রাচ্যে তার বিনিয়োগ বাড়াতে সৌদি আরবে অবকাঠামোগত প্রকল্পে আগ্রহী। ইতিমধ্যেই সৌদিআরবের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে চীন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রায় সবক্ষেত্রেই মতৈক্য নেই। যেমন ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থক সরকারকে চীন হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমর্থন দিচ্ছে, কিন্তু সিরিয়ায় তা উল্টো। সেখানকার গৃহযুদ্ধে চীন আবার বাশার আল-আসাদ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে যা সৌদি আরবের চরম শত্রু। সবকিছুর পরও গত বছর সৌদি বাদশা সালমান চীন সফর করেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সাক্ষাতকার করেন। বলা হচ্ছে এটাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের সাথে সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশের প্রধানের সাক্ষাৎ।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জায়ান্ট রাশিয়া’কে রুখতে ব্যাস্ত বিশ্ব, তবে কি তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রস্তুতি?

MP Comrade

নেতৃত্ব পরিবর্তন অতঃপর নতুন মোড়কে কিউবা

MP Comrade

কাঁদলে চোখ দিয়ে পানির বদলে ক্রিস্টাল ঝরে!

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: