সমসাময়িক চিন্তা

চট্টগ্রামে সড়ক কতটা নিরাপদ?

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম কিন্তু এখানকার রাস্তাঘাট দেখলে কেউ বুজবে না আদৌ কি এটা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিভাগীয় শহর নাকি অন্য কিছু! দেশের আমদানি রপ্তানির সিংহভাগই পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। ফলে সারাদেশের সাথে যুক্ত চট্টগ্রাম সড়ককে বাংলাদেশের লাইফ লাইন বলা হয়। ব্যাপারটা এমন যে কোন কারণে গোটা দেশ হতে চট্টগ্রাম বিচ্ছিন্ন হলে দেশে পণ্যের যোগান স্থবির হয়ে যায় এবং তার বিরুপ প্রভাব পরে। অর্থনীতি নিয়ে আলোচনাটা এখানে মুখ্য নয় তবুও প্রসঙ্গটা টেনেছি এই কারণে যে, দেশের এই অর্থনৈতিক প্রাণ সচল রাখতে এখানকার সড়ক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বও অনেক বেশি। যদিও শহরের ভেতর উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, তৈরি হচ্ছে বিশালাকার ফ্লাইওভার, বাইপাস, মেরিন ড্রাইভ ইত্যাদি। কিন্তু যেই বন্দর নিয়ে আমরা গর্ব করি সেই বন্দর কানেক্টিং রোড, এক্সেস রোড সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কের বেহাল দশা। এসব রোড দিয়েই চলে বন্দরের সকল কাভারড ভ্যান, লড়ি, ট্রাক ইত্যাদি। প্রায়শই চোখে পড়ে এসব যানবাহনের দুর্ঘটনার চিত্র, দেখা যায় রাস্তার পাশে একেকটা চিৎপটাং হয়ে উল্টে আছে। এসব রাস্তাঘাটে খানা খন্দরে এতটাই পরিপূর্ণ যে গাড়ীর ভারসাম্য রাখাটাই কঠিন হয়ে পড়ে। চৈত্র ও বৈশাখ মাসের অকাল ভারী বর্ষণ, জোয়ার ও পানিবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামের বেশিরভাগ সড়ক, রাস্তাঘাট খানাখন্দে চরম বেহাল দশায় পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে হালিশহর এলাকার রাস্তাঘাটের করুন দশায় মানুষের নাভিশ্বাস চরমে উঠেছে। পূর্বের ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, সড়কগুলো আরো ভেঙে গিয়ে বর্তমানে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যা অবশিষ্ট আছে তা খানাখন্দে ভরে গেছে অনেক জায়গায়। এতে করে সড়কে দিন-রাত যানজট লেগেই থাকছে যা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফলে মানুষ রাস্তায় অলস বসে সময় কাটাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর চকবাজার-কাপাসগোলা-বাদুরতলা, বহদ্দারহাট-সিঅ্যান্ডবি-চান্দগাঁও হয়ে কাপ্তাই রাস্তার মাথা ও কালুরঘাট সড়ক, মুরাদপুর-বিবিরহাট-অক্সিজেন-হাটহাজারী সড়ক, অন্যদিকে আগ্রাবাদ-বারিক বিল্ডিং, বন্দর-সল্টগোলা-সিমেন্ট ক্রসিং হয়ে কাঠগড় বাজার ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সড়কসহ চট্টগ্রাম মহানগরীর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুরবস্থা প্রকট। ফলে প্রতিদিনই অসহনীয় দুর্দশা পোহাচ্ছে লাখ লাখ শ্রমজীবী ও কর্মমুখী মানুষকে। 

যদিও বিভিন্ন জায়গায় সড়ক সংস্কারের কাজ চোখে পড়ছে কিন্তু তা শ্লথ গতিতে এগুচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সারা বছর বাদ রেখে কেন এসব কাজ বর্ষা মৌসুমে করতে হবে? চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি সড়ক স্থানে স্থানে বিপজ্জনক ফাটল, ভাঙন ও খানাখন্দে ভরে গেছে যা সংস্কারে পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কেননা যে কাজ টানা করলে দ্রুত শেষ করা সম্ভব সে কাজ চলছে বিরতি দিয়ে এবং স্বল্প পরিমাণে ইকুপমেন্ত ব্যবহার করে। রাস্তার পাশেই জড়ো করা হচ্ছে ইট, বালি ইত্যাদি যা যানবাহন ও মানুষ চলাচলের অন্যতম প্রতিবন্ধক হিসেবে দৃশ্যমান। আবার অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে কাজের মান অত্যন্ত নিন্ম মানের হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে কাজ শুরু করাতে অনেক ক্ষেত্রেই অসুবিধা দেখা দিচ্ছে সংস্কার কার্যক্রমের কেননা জমে থাকা পানিই অন্তরায় সৃষ্টি করছে। প্রাক-বর্ষায় সাপ্রতিক অতিবর্ষণ ও পানিবদ্ধতা, জোয়ার ও পাহাড়ি ঢলের তোড়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলজুড়ে সড়ক-মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়কসহ স্থানীয় রাস্তাঘাটের মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এসব সড়কে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে চলেছে। জরাজীর্ণ এসব সড়ক- মহাসড়কে যানজট নিত্য দিনের সঙ্গী। বিপর্যস্ত সড়ক-মহাসড়কে জ্যাম লেগে থাকার দুর্দশাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর পরিবহন মালিক-শ্রমিক যথেচ্ছ হারে ভাড়া হাতিয়ে নিচ্ছে যাত্রী সাধারণ থেকে। বাস-মিনিবাস, কোস্টার, কোচ, সিএনজি অটোরিকশা, রাইডার, টেম্পো, লেগুনার হেল্পার ও ড্রাইভারদের কাছে বাড়তি ভারার কৈফিয়ত চাওয়াতে তারা যাত্রীদের সাথে দুরব্যাবহারও করছে। সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের এসব ভোগান্তি দেখার কেউ নেই। আসলে সবার মাঝেই কেমন যেন এক অস্থিরতা বিরাজ করছে, মন মেজাজ ঠিক জায়গায় ধরে রাখতে না পেরে সবাই খেইল হারিয়ে ফেলছে। এর প্রধান কারণ সড়কের মারাত্মক অব্যবস্থাপনা। সড়কের ট্রাফিক সিস্টেম সন্ধ্যার পর কোনভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা পুলিশ, কেননা এই সময়টাতে অফিস ও বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে ছুটি হয় ফলে রাস্তায় মানুষের আদিক্য দেখা দেয়। গাড়ী শ্লথ গতিতে চলে কারণ অধিকাংশ সড়কেরই বেহাল দশা। সড়কের উপরিভাগের পিচ উঠে গিয়ে ছাল-বাকল, আস্তর-ইট-কঙ্কর পর্যন্ত উঠে গেছে, অসংখ্য গর্ত, ফাটল ও খানাখন্দে ভরে গেছে সড়ক। আর এসব সড়কের উপর দিয়ে কাদা-পানি জমে আছে। এ অবস্থায় যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে মহানগরীর অনেক সড়ক। সরকারের প্রতিশ্রুতি এবং জনপ্রতিনিধিদের কথার ফুলজুরিতে প্রায়ই শোনা যায় চট্টগ্রাম এখন উন্নয়নের শহর। স্বাধীনতার ৪৭বছর পরে এসে দেশের এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ শহরকে সাজাতে যে সময় লাগছে তা হতাশাজনক বটে। কেননা এখানকার মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মুল্যায়ন ঠিক মত হয়নি, সঠিক পরিকল্পনার প্রয়োগও যথাযতভাবে ঘটছেনা। আমরা ধরে নিচ্ছি সরকারের স্বদিচ্ছা আছে, কিন্তু নগর পরিকল্পনাবিদ যারা আছেন তারা তাদের মেধার সঠিক বিচার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। বুজতে হবে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব ছাড়াও এই অঞ্চল পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। ইট সিমেন্টে গোটা শহরকে মুড়িয়ে দিলে এখানকার স্বকীয়তা ও সৌন্দর্য অনেকাংশে ম্লান হবে। তবে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এবং তা করতে হবে সদুরপ্রসারি চিন্তা ও পরিকল্পনা করে যেন চট্টগ্রামের ভাবগাম্ভীর্যতা নষ্ট না হয়। নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাস্তবায়নকারীদের বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা এবং সদুরপ্রসারি পরিকল্পনায় চট্টগ্রামের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি পাবে এই আশা করছি।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সেলফি আসক্তিঃ একটি মানসিক ব্যাধি?

Ferdous Sagar zFs

একটি কন্সার্ট জয় এবং শিরোনামহীন !!

Ahmmed Abir

বাচ্চাদের জন্য আমরা নাকি আমাদের জন্য বাচ্চারা?

nasrin shahid

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy