ঢাকা

বিউটি বোর্ডিং-পুরান ঢাকার হলদে দালান

বিউটি বোর্ডিং!
নামটির সাথেই জড়িয়ে আছে কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া পুরান ঢাকার জনপ্রিয় বোর্ডিং ব্যবস্থার একটি স্থিরচিত্র। বাঙ্গালীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি,সাহিত্যের মিশ্রণ তথা মহান ভাষা আন্দোলনের মত ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত এই ‘বিউটি বোর্ডিং প্রায় দেড়’শ বছর ধরে আজও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে।

বাংলাবাজার, ১নং শ্রীশদাশ লেনের এই জমির উপর নির্মিত ভবনটির প্রকৃত মালিক ছিলেন জমিদার সুধীর দাস।তখন জমিদার বাড়িটি দৈনিক ‘সোনার বাংলা’র অফিস হিসেবে ব্যবহ্রত হতো যেটি পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়। দেশভাগকে কেন্দ্র করে জমিদারবাবু নানা অর্থনৈতিক টানাপোড়নে পড়ে বাড়িটি বিক্রি করে দেন এবং তৎকালীন ব্যবসায়ী প্রহল্লাদ সাহা এবং নলীনী মোহন সাহা সেটি কিনে নিয়ে বোর্ডিং হিসেবে ভাড়া দিয়ে দেয়। নলীনী মোহন দাশের বড় মেয়ে বিউটি’র নামেই নামকরণ করা হয় এই বোর্ডিংটির।

নামকরা কবি, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পী, গায়ক, অভিনেতা, চিত্রপরিচালক সহ নানা প্রতিথযশা ব্যক্তিত্বের পদচারণায় প্রতিনিয়ত মুখর হয়ে থাকত এই বোর্ডিং প্রাঙ্গন। নেতাজি সুভাস চন্দ্র বসু থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পল্লীকবি জসীম উদ্দিন প্রমুখ হানা দিয়েছিলেন এটির দোরগোড়ায়। সেসময় নবাব বাড়ী, ঢাকা প্রকাশের কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও নানা বিশ্ববরেণ্য আর বাঙ্গালী জাতির ইতিহাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিত্বের পদচিহ্ন বহন করে আত্নঅহমিকায় বলিয়ান হয়ে আছে এই বিউটি বোর্ডিং।

নিয়মিত আসর জমতো সাহিত্যচর্চা, বিতর্ক সহ নানা মতবিনিময়সভার আর সেগুলোর নিয়মিত আগন্তুক ছিলেন কবি শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, জিয়া আনসারী, মাহবুব কবীর, মোস্তফা মনোয়ার, নিতুন কুণ্ডু প্রভৃতি সহ বহু জ্ঞানীগুণী মহল।

সত্যিই এই প্রজন্মের কাছে বাঙ্গালীর ইতিহাসের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষদর্শী আর কিংবদন্তি মানুষদের এমন এক মিলনমেলার দৃশ্যের অবলোকন করতে পারা আসলেই চির অধরা থেকে যাবে।

তবে কালের সব থেকে নৃশংস ঘটনার বলি এই বিউটি বোর্ডিং’র ও হতে হয়েছিল। নানা পেশার বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিয়ত আনাগোণার দরুণ ৭১’র ২৮শে মার্চ পাক হানাদার বাহিনী বাড়ির মালিক প্রহল্লাদ সাহা,বোর্ডার, স্টাফসহ মোট সতের জনকে নির্মমভাবে ব্রাশফায়ারের মাধ্যমে হত্যা করে। এরপর সাহা পরিবারটি কলকাতায় পাড়ি জমান। আর এভাবেই বোর্ডিংটি মুক্তিযুদ্ধকালীন বাকি সময়টায় এমন নিভৃতে বুকে একরাশ অভিমান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যেন!

পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের পর পারিবারিক বন্ধুর ডাকে সাহা পরিবারের দুই সহোদর তারক সাহা এবং সমর সাহা দেশে এসে পুনরায় বিউটি বোর্ডিং চালু করে দেন। মুহূর্তেই যেন প্রাণ সঞ্চারিত হলো বোর্ডিং‘র মাঝে যেটি আজো টিকে আছে।

শ্রীশদাশ লেনে ঢুকলেই চোখে পড়বে এটির ঘষামাজা করা প্রধান ফটক,ভেতরে হলদে রঙের দোতলা বাড়ি খানিকটা শ্যাওলা পড়ে যাওয়া।এ যেন কোলাহলপ্রিয় এই নগরীর বুকে এক ফোঁটা নির্মল শ্বাস নেয়ার স্থান,পাখির কিচিরমিচির গুঞ্জন বাজতে থাকে সমস্ত বাড়িটিকে ঘিরে। এছাড়া বৃষ্টিস্নাত দিনগুলোতে এটি যে কি এক অপার্থিব মহিমা সৃষ্টি করে তা বলে কিংবা লিখে ধারণা দেয়া ভার।

এখন আর আগের মত আড্ডা নেই কিন্তু বোর্ডিং‘র বারান্দা,আঙ্গিনা ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় এক অন্যরকম শিহরণ জেগে ওঠে মনের ভেতরটায়।বারংবার মনে হতে থাকে এই জায়গাটিতেই বুঝি নেতাজি এসেছিলেন, এই চেয়ারেই বসে বুঝি বঙ্গবন্ধু তাঁর ঝাঁঝালো ভরাট গলায় কোনো এক আলোচনাসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন!

তবে এতসব অনুভূতির মাঝে এই জায়গাটির আরেকটি অন্যতম বিশেষত্ব হলো খাবার ঘরটি যা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেন না।প্রিন্টিং প্রেসের কর্মচারী,নানা পেশাজীবী মানুষদের ভিড় লেগেই থাকে এই হেঁশেল ঘরটায়।‘ষোলোয়ানা বাঙ্গালিআনা’র যথার্থ পরিচায়ক এই ঘরটায় খাবার পরিবেশনের জন্য এখনো স্টিলের বাসন-কোসন ব্যবহার করা হয়। খাবারের মেন্যুতে সরষে ইলিশ,বাইলা, পাবদা,মুড়িঘন্ট,সরপুটি,হরেক রকম ভর্তা,বোয়াল,আইড়,বাতাসি,মলা,মেনি মাছ সহ প্রভৃতি খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছে যেনো।

নৈসর্গিক এক অপার মহাকাব্য যেন লুকিয়ে আছে বাড়িটির দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে।জীবন সায়াহ্নে এসে বহু বয়োজ্যৈষ্ঠই পুরনো স্মৃতি রোমন্থনের নিমিত্তে এখনো ছুটে আসে এই বিউটি বোর্ডিং’র আঙ্গিনায় কেননা শিকড়ের টান সমূলে ছিন্ন করা যে দুঃসাধ্য জিনিস।
তাইতো পুরান ঢাকার অসংখ্য অলি গলির ভিড়ে এই এক টুকরো জমিটির ভিতর নিজেকে ক্ষনিক অবগাহন করার মোহ যে কি পরিমাণ তীব্র তা এই অর্বাচীন জনগোষ্ঠীর কখনো অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

ঘুরে আসুন আহসান মঞ্জিল

Rohit Khan fzs

ঢাকার মধ্যে একদিনের আনন্দ ভ্রমণ – পর্ব ১ম

Rohit Khan fzs

ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদ !

Rohit Khan fzs

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: