Now Reading
নেবুলা সম্পর্কিত অজানা বিষয়গুলি



নেবুলা সম্পর্কিত অজানা বিষয়গুলি

সত্যি বলতে আকাশ বলতে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই ফলে এটি ছোঁয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু এর পরও এই আকাশের খুঁটিনাটি জানতে তার পিছু নিয়েছে মানুষ। তাইতো এই আকাশ-মহাকাশ নিয়ে মানুষের কল্পনা আবর্তিত। এই মহাকাশের একটি অংশ নেবুলা নিয়ে লিখছি যাকে বাংলায় নীহারীকা বলা হয়। এই নেবুলাকে আকাশের ডাস্ট বলা হয় অর্থাৎ মহাকাশের ধুলিকণা একত্রে মিলিত হয়ে নেবুলা বা নীহারীকার সৃষ্টি করে। মহাকাশে গ্যাস কিংবা ধূলিকণা একত্রে মিশে মেঘের মত আকার ধারণ করে নেবুলার সৃষ্টি করে যা রাতের আকাশে স্পষ্ট দেখা মিলে। এই গ্যাসের মধ্যে আছে ইন্টারস্টেলার ক্লাউড ,হিলিয়াম গ্যাস, হাইড্রোজেন গ্যাস এবং সাথে অন্যান্য আয়নিক গ্যাসসমূহ। সাথে আরো রয়েছে প্লাজমা যা রয়েছে নীহারিকার মধ্যে। গ্যাস প্লাজমা অবস্থায় থাকার কারন হচ্ছে উচ্চ তাপ। মুলত নেবুলা  হচ্ছে ছায়াপথ সহ অন্য সকল মহাজাগতীক বস্তুর সাধারন নাম যা মিল্কি ওয়ের বহির্ভাগে অবস্থিত। চলুন জেনে নিই এমন কিছু নেবুলা সম্পর্কে…

হ্যালিক্স নেবুলাঃ

পৃথিবী থেকে ৭০০ আলোকবর্ষ দূরে অ্যাকুয়ারিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জে অবস্থিত নির্জীব প্রাণহীন এই তারাটিকে বিজ্ঞানীরা যেভাবে এতদিন ভেবে আসছিলেন, স্পিটজার টেলিস্কোপের পাঠানো সে চিত্র পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীদের এতদিনের সকল ধারণা নিমেষেই নস্যাৎ হয়ে গেছে। ছবিটি দেখেই মনে হয় বিশালাকার এক রক্তচক্ষু জীব তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। সে যেন নিভে যাওয়ার আগে নিজের খোলস থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে উচ্চ মাত্রার বিকিরণ জনিত শক্তি। তাপমাত্রা ১১০,০০০ ডিগ্রি কেলভিন। সাদা বামন সদৃশ এই তারাটির বিচ্ছুরিত বিকিরণ এক্স –রে ছাড়া কিছুই নয়। এর নাম হ্যালিক্স নেবুলা। ব্যাস ২.৫ আলোকবর্ষ। একে ঘিরে থাকা ধূম্রজালের আবরণের ছবি পাঠিয়ে স্পিটজার টেলিস্কোপ সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এর আগে ধূলোর এই আবরন সমেত তথ্য বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল না। ইনফ্রা রেড ক্যামেরা দিয়ে ধরা এ আলোকচিত্র মহাকাশের ক্যানভাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৩৫ থেকে ১৫০অ্যাস্ট্রনোমিকাল ইউনিট দূর পর্যন্ত এই ধূম্রজাল বিস্তৃত।

[ সূর্য হতে পৃথিবীর দূরত্ব কে বলে এক অ্যাস্ট্রনোমিকাল ইউনিট=৯৩ মিলিয়ন মাইল=১৫০ মিলিয়ন কি.মি.]

কিন্তু কোথা হতে আগমন এই ধূম্রবলয়ের? অনেক ভেবে চিন্তে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে নেবুলার পাশ দিয়ে নিশ্চয়ই কোন ধূমকেতুর সবেগে মন্থন ঘটেছিল যার কারণে এই ধূম্রবলয়ের সৃষ্টি। আমাদের সৌরমন্ডলের সূর্য নামক নক্ষত্রটিও একদিন নিস্প্রভ হয়ে পড়বে। পর্যায়ক্রমিক রূপান্তরের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি হতে ৫ বিলিয়ন বছর আরো যদিও বাকী, তখন আমাদের সূর্যও প্রচণ্ড শক্তি নির্গত করে আলোর তীব্র ছটায় আলোকজ্জ্বল হয়ে মহাকাশের গর্ভে নিস্প্রভ হয়ে সমস্ত শক্তি হারিয়ে সাদা বামন সদৃশ পিন্ডে পরিণত হবে। ইনার প্ল্যানেটসমূহ যেমন বুধ শুক্র পৃথিবী মঙ্গল অর্থাৎ যাদের কক্ষপথগুলো সূর্যের কাছাকাছি তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে সূর্যের এই বিস্ফোরণে। আর সৌরবলয়ের আউটার প্ল্যানেটগুলো যারা কিনা মঙ্গল হতে দূরে অবস্থিত যেমন বৃহস্পতি ইউরেনাস নেপচুন প্লুটো এবং কিছু অবশিষ্ট ধূমকেতুসমূহ বলয় আকারে ঘুরতে থাকবে অনন্তকাল এই নিভে যাওয়া তারাটিকে ঘিরে। মানব প্রজাতি হয়তো বা এরমাঝে অন্য কোন গ্রহে আবাস স্থাপন করবে। শুরু থেকে শুরু হবে মানব সভ্যতার নতুন ইতিহাস, নতুন অগ্রযাত্রা। ভেবে ভেবে একদিন হয়তোবা আবিষ্কার করে বসবে মানুষের পূর্ব আবাসস্থল ছিল পৃথিবী নামক এক গ্রহে সূর্য নামক সৌরমণ্ডলের অধীনে মিল্কিওয়ে নামক ছায়াপথে।

কারিনা নেবুলাঃ

ইওরোপীয়ান সাউদার্ন মান মন্দির,নভোমন্ডলের অন্যতম বৃহত ও উজ্জ্বল যে নেবুলার জটিল গঠনের বিস্তৃত বর্ণনা আমাদের কাছে উন্মোচন করেছে তার নাম কারিনা নেবুলা। আমাদের হতে ৭৫শত আলোকবর্ষ দূরে কারিনা নক্ষত্র মন্ডলে এটি অবস্থিত। ১০০ আলোকবর্ষ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত অরাইওন নেবুলা হতে এটি ৪ গুণ বড় এবং উজ্জ্বলতর।

নক্ষত্র উতপাদনের কারখানা হিসেবে এ নেবুলাটি একটি উপযুক্ত স্থান। ঘন মেঘপুঞ্জ দ্বারা আবৃত নেবুলাটির আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত তৈরী হচ্ছে নক্ষত্রগুচ্ছ। তবে নবজন্ম লাভকারী ভয়ঙ্কর আকৃতির নবীন নক্ষত্রগুলো যে তীব্র বিকিরণ জনিত শক্তির বিচ্ছুরণ ঘটায় তার কারণেই এত উজ্জ্বল আভাময় দেখায় কারিনাকে। লালচে রক্তিমাভ আভার জন্য হাইড্রোজেন ও আলট্রা ভায়োলেট রশ্মির সংমিশ্রণই দায়ী। প্রায় ডজন খানেক নক্ষত্রের সন্ধান এ নেবুলাতে সহজেই পাওয়া যাবে, যারা আমাদের সূর্য হতে ৫০ থেকে ১০০ গুন বেশী ভর বিশিষ্ট। অত্যাধিক ভারী বলেই কয়েক মিলিয়ন বর্ষেই তারা তাদের জীবনচক্র সমাপ্ত করে। সেখানে কিনা আমাদের সূর্যের আয়ুষ্কাল ১০ বিলিয়ন বছর। এই দশ বিলিয়ন দীর্ঘ সময়ের সাথে তুলনা করলে কারিনা নেবুলার ঐ ভারী নক্ষত্রগুলোর আয়ুষ্কাল সূর্যের জীবদ্দশার এক পল মাত্র।

কারিনা শব্দটি ল্যাটিন, যার অর্থ keel of a ship. Keel মানে জাহাজের তলি। জাহাজ যেন এদিক ওদিকে বারবার দুলে না উঠে অর্থাত জাহাজকে স্থিতিশীল রাখার নিমিত্তে নির্মিত ধাতব খন্ড বিশেষ। বা আক্ষরিক অর্থে নয় বরং আলঙ্কারিক অর্থে এর অর্থ হতে পারে জাহাজ। দক্ষিণ গোলার্ধের আকাশে একটি নক্ষত্রমন্ডলীর নাম ছিল Argo Navis. Argo মানে জাহাজ। নামকরণ করেছিলেন টলেমি। অসম্ভব বড় আকৃতি বিশিষ্ট হওয়ার দরুণ এর নাম বিলুপ্ত করে এই নক্ষত্রমন্ডলীকে তিন ভাগে বিভক্ত করে তিনটি নামকরণ করা হয়। যেমনঃ

১ carina (keel) অর্থ জাহাজ

২ puppis অর্থ জাহাজের পশ্চাতভাগের ডেক

৩ vela অর্থ পাল

নেবুলাটির মধ্যস্থিত অতিউজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ইটা-কারিনা। সূর্যের চেয়ে প্রায় ১০০ গুন ভরবিশিষ্ট ও চার মিলিয়ন গুন বেশী উজ্জ্বল বলেই এই নক্ষত্রটি আমাদের ছায়াপথ মিল্কওয়েতে অবস্থানকারী জ্যোতির্ময় সৌন্দর্য্যে সর্বোচ্চ খ্যাত ও হৃদয়গ্রাহী বৈশিষ্ট্যে মন্ডিত। তাই ইটা-কারিনা এতটা নজড়কাড়া। এটি খুব অস্থিতিশীল হওয়াতে প্রচন্ড গতিশক্তি সম্পন্ন বহিঃ বিস্ফোরণের নমুনা বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছিলেন ১৮৪২ সালে।কয়েকবছর ধরেই ইটা-কারিনা ছিল দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।

সুপারনোভা বা অতিকায় নব-নক্ষত্র বিস্ফোরণের সময় উতপন্ন প্রচন্ড আলোর ছটা যেমন চারিদিক ঝলসে দিয়ে নভোমন্ডলকে আলোকজ্জ্বল করে তুলে, ইটা কারিনা ঠিক তেমন উদাহরণ স্থাপন করলেও বিস্ফোরণে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি।এর একটি সঙ্গী নক্ষত্র আছে যে কিনা একে প্রদক্ষিণ করে ৫.৫৪ বছরে। প্রদক্ষিণ কালে কক্ষপথের খুব কাছাকাছি এলে প্রবল শক্তি সম্পন্ন বায়ু প্রবাহের সংঘর্ষ তখন বিস্ময়কর ঘটনার সৃষ্টি করে। ২০০৯ এর জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তারা দুজন সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার দরুণ অনন্য এক নভোমন্ডলীয় অবস্থার উতপত্তি হয়েছিল যা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রদুটির গ্যাসীয় পরিমন্ডলের ধরণ ও গঠণ সম্বন্ধে ব্যাপক ধারণা লাভে সক্ষম হন। সেই সময়টুকুতে ইউরোপীয়ান সাউদার্ন মান মন্দির পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল অসংখ্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রাংশের সমাহারে। হঠাতই মনে হতো এ মান মন্দির যেন ছোটখাটো এক রণতরীর অন্য আরেক রূপ।

বাবল নেবুলাঃ

ঐ দূরের আকাশে আমাদের অজান্তেই গ্যসীয় ধূম্রকুন্ডলী প্রলেপে প্রলেপে আবৃত হয়ে অধিকার করে ফেলেছে এক বিশাল অঞ্চল যা ধীরে ধীরে প্রায় ৬ আলোকবর্ষ স্থান জুড়ে গ্যাসীয় বুদবুদ আর ধোঁয়াটে অথচ মনোমুগ্ধকর লালচে আভার এক অপূর্ভ শোভা হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের চোখে। নক্ষত্র বানাবার এক বিশাল কারখানা এ যেন। নাম বাবল নেবুলা NGC 7635.

এর কেন্দ্রে জ্বলজ্বল করছে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। অসম্ভব উত্তপ্ত এ নেবুলা সারাক্ষণ ছড়িয়ে দিচ্ছে উত্তপ্ত গ্যাসীয় কণা সমগ্র মহাকাশে। তাপমাত্রা ২৫ হাজার ডিগ্রী কেলভিন ছাড়িয়ে তারও বেশী হতে পারে , প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রী কালভিনের মতন। আসলে ঐ নক্ষত্রটি থেকে শক্তিশালী বিকিরণ চারিদিকের গ্যাসীয় মন্ডলীকে বিদ্যুতায়িত করে তৈরি করেছে এই উজ্জ্বল রক্তিম আলোকচ্ছটা।সাবানের বুদবুদের মতো সমতল ও মসৃন নয় এই গ্যাসীয় বুদবুদের পৃষ্ঠভাগ। কিছুটা ঢেউ খেলানো এবড়ো থেবড়ো বহির্ভাগ নির্দেশ করে বিভিন্ন ঘনত্ব সমৃদ্ধ গ্যাসীয় আস্তরণ।

ঘন্টায় ৪ মিলিয়ন মাইল বেগে প্রসারনরত এই নেবুলাটি তার উত্তপ্ত বিক্ষিপ্ত গ্যাসীয় মন্ডল নিয়ে তৈরি করছে এ মনোমুগ্ধকর আলোকচিত্র, ক্যসিওপিয়া নক্ষত্রমন্ডল বরাবরে। পৃথিবী হতে প্রায় ৭ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এ নেবুলাটি আমাদের কাছে অনন্ত বিস্ময়ের বিষয়।

About The Author
MP Comrade
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment