Now Reading
পৃথিবীর বিতর্কিত কিছু মুর্তির গল্প



পৃথিবীর বিতর্কিত কিছু মুর্তির গল্প

মুর্তি আর বিতর্ক – এ যেন একা অপরের পরিপুরক। মুর্ত বানানো হয় কোন বিখ্যাত মানুষ কিংবা কোন বিখ্যাত ঘটনাকে কেন্দ্র হয় যার সাথে জড়িয়ে আছে কোন সংঘর্ষ বা কোন মতানৈক্য। মাঝে মাঝে প্রতিবাদের ঘটনাকেও মুর্তিতে রুপান্তরিত হয় হয়। মুর্তি তৈরী নিয়ে জল ঘোলা হয়নি এমন ঘটনা খুব কমই আছে।  আমেরিকাতে, কনফেডারেট নেতাদের মুর্তি আর জেনারেল দের মুর্তি গুলো সবসময় নতুন নতুন বিরোধের সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও স্ট্যাচু অর ডেভিল, স্ট্যাচু অফ হিটলার এবনকি কুকুরের মুর্তি নিয়েও কাদা ছুড়া ছুড়ি কম হয় নি। আজ আমরা কথা বলল এমন কিছু মুর্তি নিয়ে যা বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সুপরিচিত।

 

লুসিফার অফ লিইজ

বেলজিয়ামের সেইন্ট পল ক্যাথেড্রাল এর ভিতরে লুসিফার অফ লিইজ এর অবস্থান। এর অফিসিয়াল নাম হলো – Le Genie Du Mal (The Genius of Evil). এটা ১৮৪৮ সালে নির্মিত হয়েছিল Guillaume Geefs এর হাতে।

বর্তমানে যেই মুর্তিটি আছে যেটি চার্চে বানানো লুসিফারের আসল মুর্তি না। আসল মুর্তিটির নাম ছিল L’ange du mal(The Angel Of Evil) যা বানিয়েছিলেন Guillaume এর ভাই Joseph, ১৮৪২ সালে। কিন্তু এঞ্জেল অফ ইভিল জনসম্মুখে উন্মোচিত হবার আগেই নানান বিতর্কের সুচনা হয়।চার্চের নেতারা মনে করেন ডেভিল এত সুন্দর হলে এটা মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক করবে না আর মানুষ ডেভিল এর দেখা পাবার জন্য পাপ করতে শুরু করবে । তারা Guillaume কে তলব করে এই মুর্তির রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নতুন মুর্তির তৈরী করার জন্য। Guillaume নতুন করে মুর্তি বানান যার শরীর পাখা দ্বারা আবৃত। এর মাথায় দুইটি ছোট শিং আছে আর নখ খুব চোখা। এই মুর্তির হাতে একটি আধ খাওয়া আপেল আছে

 

ব্রাউন ডগ স্ট্যাচু

ব্রাউন ডগ স্ট্যাচু লন্ডনের বেটার সীর ট্রাফালগার এ অবস্থিত যা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বর্তমান মুর্তিটি সেই বিতর্কিত মুর্তির রিপ্লেসমেন্ট। কারন আসল মুর্তিটি সরিয়ে ফেলতে হয়েছিল দুই পক্ষের প্রতিবাদের মুখে । এই দুই পক্ষে এক পক্ষ হল যারা প্রাণীদের উপর বৈজ্ঞানিক পরিক্ষা করার পক্ষে যাদের বলা হয় ভিভিয়ে সেকশনিস্ট , আরেক পক্ষ হলো যারা চায়না যে প্রাণীদের উপর পরীক্ষা করা হোক যাদের বলা হয়  এন্টি- ভিভিয়ে সেকশনিস্ট। আসল মুর্তিটি উন্মোচিত হয়েছিল এন্টি ভিভিয়ে সেকশনিস্ট এর দ্বারা ১৯০৬ সালে। সেই সকল কুকুরদের স্মরনে যারা ১৯০৩ সালের ইউনিভার্সিটি কলেজে সিরিজ সার্জারির মধ্যে দিয়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছিল। আসল মুর্তির নিচে একটি ফলক লাগানো হয়েছিল যা এই নির্বিচারে প্রাণী হত্যার বিপক্ষে কথা বলে।

 

ভিভিয়ে সেকশনিস্টদের কাছে এই ফলকের লেখা অযৌক্তিক এবং অপমান জনক মনে হয়েছে। তার ১৯০৭ সাler ১০ ডিসেম্বর ১০০০ মেডিকেল শিক্ষার্থী ট্রাফালগার স্কোয়ারে এসে প্রতিবাদ করে এবং আরো ১০০ জন ভিভিয়ে সেকশনিস্ট প্রতিবাদ গড়ে তোলে বেটারসী তে। তারা মুর্তির ক্ষতিসাধন করতে পারে ভেবে পুলিশ দিনরাত মুর্তির পাহারায় নিজেদের নিযুক্ত করে। ১৯১০ সালে সিটি কাউন্সিল এর আদেশে রাতের আধারে পুলিশ মুর্তি সরিয়ে ফেলে এবং এন্টি – ভিভিয়ে সেকশনিস্টরা ১৯৮৫ সালে রিপ্লেসমেন্ট মুর্তি হিসেবে বর্তমান মুর্তি স্থাপন করে যা এখনো অক্ষত আছে।

 

ব্লু ম্যাস্টাং

৩২ ফিট উচু নীল রঙ্গের এই মুর্তিটি ডেনভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাহিরে অবস্থিত যার নাম ব্লু ম্যাসট্যাং।এটি একটি বিতর্কিত এবং কুখায়ত মুর্তি যার নাম  দেয়া হয়েছিল ব্লুসিফার। মুর্তিটি দেখলেই বোঝা যায় কেন এটি এত ঘৃনার পাত্র। এর গায়ের রঙ নীল কিন্তু চোখগুলো গাড় লাল। এর স্থপতি Luis Jimenez এটি স্থাপন করেন পশ্চিমের বন্য প্রানীকে উৎসর্গ করে কিন্তু অনেকেই মনে করেন এই মুর্তিটি দানবিক এবং কুৎসিত। এমনকি Luis Jimenez মারাও গিয়েছেন যখন তার মুর্তির একটি অংশ তার নিজের গায়ের উপর পড়ে গিয়েছিল।

 

১৯৯৩ সালে তিনি মুর্তি স্থাপনের কাজ পেয়েছিলেন যা ২০০৬ সালে মৃত্যুর আগে তিনি শেষ করতে পারেননি। সার ছেলেরা এটি শেষ করেছিল। ২০০৮ সালে বিমানবন্দরের সামনে সর্বসাধারনের জন্য এটি উন্মুক্ত হরা হয় এবং এর কিছুদিনের মধ্যেই এটি নেতিবাচক মন্ত্যব্যের মুখে পড়ে। সাধারন জনগন বলেছিল এটি এয়ারপোর্টের অন্য একটি স্থানে সরিয়ে নিতে যাতে অনিচ্ছাপুর্কব এটি কারো চোখে না পরে। কিন্তু বিমান বন্দর কতৃপক্ষ এটি সরায় নি এই ভেবে যে মানুষ একসময় অভ্যন্সত হয়েই যাবে।

 

স্ট্যাচু অফ ইউনিটি

এতক্ষন আমরা কথা বলছিলাম সেই সকল মুর্তি নিয়ে যা তৈরী হবার পর সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। এবার আমরা এমন একটী মুর্তি নিয়ে কথা বলব যার নির্মান শেষ হবার আগেই সমালোচিত হচ্ছে। বিধাতাই জানে, এর কাজ শেষ হলে কতটা সমালোচিত হবে এই কাজ।

 

স্ট্যাচু অফ ইউনিটি তৈরী করছে ভারত। এটা ৫৯৭ ফুট লম্বা হবে যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উচু বলে বিবেচিত। বর্তমানে সবচেয়ে উচু উন্মুক্ত মুর্তি আছে বুদ্ধার যা ৫০২ ফুট উচু এবং স্ট্যাচু অফ লিবার্টি যা ৩০৫ ফুট(বেইজ সহ)। স্ট্যাচু অফ ইউনিটি তৈরী হচ্ছে “সর্দার বল্লভ ভাই পাটেল” এর আদলে যিনি ভারতের প্রথম ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার ছিলেন এবং যিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন।

 

মুর্তিটি বানাতে ২০০ মিলিয়ন ইউরো খরচ হচ্ছে যা সমালোচক রা বলছেন এই টাকা দিয়ে দেশ সেবার কাজ করলে আরো ভাল হত। তারা আরো বলছেন সর্দার বল্লভ ভাই নিজের মুর্তির জন্য এত টাকা কোনদিন খরচ করতেন না। সমালোচকরা আরো বলছেন – বর্তমান চিফ মিনিস্টার নরেন্দ্র মোদি মুর্তি তৈরির অনুমোদন দিয়েছেন নিজের দল এর নাম অক্ষুন্ন রাখার জন্য। মুর্তিটি শীঘ্রই সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

 

হিম

“শিশু এডলফ হিটলার প্রার্থনারত অবস্থায় হাটু গেড়ে বসে আছেন” এটিই “হিম” মুর্তির কনসেপ্ট। হিটলার নিজের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন বলে তিনি একটি সমালোচিত ব্যাক্তি একথা আমরা সবাই জানি। মুর্তিটি হয়ত সেই সমালোচনা এটি যেতে পারত যদি না এটির স্থপতি Maurizio Cattelan এর স্থাপনা ২০১২ সালে পোল্যান্ড এর ওয়ারসো তে করতেন। প্রায় ৩ লক্ষ ইহুদি সেনা নিহত হয়েছিল হিটলারের নাজি বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই ওয়ারসোতেই। The Simon Wiesenthal Center ,  একটি ইহুদি প্রচারণা মুলক সংস্থা দাবি করে মুর্তিটি প্রহসনামুলক ইহুদিদের প্রতি যারা নাজিদের হাতে নিহত হয়েছে। ইসরাইলি সংস্থাটির পরিচালক Efraim Zuroff এর ভাষ্য অনুযায়ী -”হিটলারের প্রার্থনার একমাত্র চাওয়া ছিল যে যেন দুনিয়া থেকে ইহুদিদের নাম মুছে ফেলতে পারে”। অপরদিকে স্থপতি এবং তার অনুসারীদের বক্তব্য হলো -”আমরা শুধু দেখাতে চেয়েছি কিভাবে নিষ্পাপ হিটলার ও একদিন শয়তানে পরিনত হয়েছে। ”

About The Author
Kazi Mohammad Arafat Rahaman
পড়াশোনা - ব্যাচেলর করছি কম্পিউটার সায়েন্সে। ভাল লাগা - গান, ফুটবল আর বই। খারাপ লাগা - নাই। খারাপ লাগেনা। অনুভূতিহীন। শখ - অনেক আছে। লক্ষ্য - ইন্টারপ্রেনার হতে চাই।
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment