Now Reading
লজ্জা



লজ্জা

লজ্জা-১

স্কুলে পড়ার সময়টা পারিবারিক ভাবে কিছুটা অর্থকষ্টে ছিলাম।সরকারী গার্লস স্কুলে পড়তাম।পড়ালেখায় নিজের চেষ্টায়ই ভালো ছিলাম এবং ইংরেজী প্রিয় সাবজেক্ট ছিলো।আগ্রহ দেখে টেস্ট পরীক্ষার কয়েক মাস আগে আম্মু স্কুলের খুব নামী একজন টিচারের কাছে ব্যাচে ইংরেজী পড়তে দিলেন।বেতনের বিষয়টা আম্মুই দেখতো।সবসময় পড়া পারতাম তাই স্যারও আদর করতেন খুব।
একদিন হঠাৎ স্যার কেন যেন আমার উপর ভীষণ রেগে গেলেন।পড়া পারা শর্তেও খুব গালিগালাজ করলেন।আমি লজ্জায় সিটিয়ে যাচ্ছিলাম।ছোট মনটায় ভীষণ আঘাত লাগছিলো।একসময় স্যার এতোগুলো মেয়ের সামনে আমার মুখে খাতা ছুঁড়ে মারলেন।তাতেও মনে হয় স্যারের রাগ কমে নি,আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দিলেন।প্রচন্ড অবাক হয়ে আমি কিছুক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।তারপর কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় হাঁটছিলাম।ভাবছিলাম, আমি এতো বড় অন্যায় করেছি বাসায় গিয়ে আম্মুকে কি বলবো।রাস্তায় অনেকটা সময় কাটিয়ে বাসায় গেলাম।আম্মু সন্দেহ করে নি।পরের কয়েকদিন স্যারের পড়ার সময় হলেই আমি রাস্তায় বের হয়ে হাঁটতাম,কাঁদতাম আর আমার অন্যায়ের কথা ভাবতাম।যে স্যারকে আমি এতোটা পছন্দ করতাম তাকে আমি রাগিয়ে দিলাম!!একটা অপরাধবোধে আমার ছোট্ট মনের ভেতরটায় ঝড় বইছিলো।আম্মু একদিন আমাকে ডেকে বলল চল স্যারের বেতন দিয়ে আসি।আমার ভেতরে মনে হচ্ছিলো কেউ হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছিলো।আম্মুকে কি বলবো কিছুই মাথায় আসছিলো না।মনে হচ্ছিলো বললে আম্মু যদি,অনেক রাগ করে।ভয়ে কিছুই না বলে আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে স্যারের বাসায় গিয়ে স্যার বাসায় নেই।আম্মু স্যারের ওয়াইফের কাছে টাকা বুঝিয়ে দিয়ে বারবার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছিলেন।আমার শুধু মনে হচ্ছিলো যে করেই হোক স্যার আসার আগেই পালাই।বাসায় গিয়ে আম্মুকে বললাম আমার প্রিপারেশন শেষ।আর না পড়লেও হবে।হয়তো টাকার সমস্যার কারনে আম্মুও আর জোর করেন নি।
আমার আস্তে আস্তে সবচেয়ে প্রিয় স্কুলের প্রতিওও অনীহা চলে আসলো।স্কুলে গেলেই মনে হতো সবাই তো বিষয়টা জানে।সবাই মনে হয় আমাকে নিয়ে হাসছে।কেউ কথা বলতে এলেই মনে হতো এটা নিয়ে কথা বলবে।খুব চঞ্চল আমি হঠাৎ করেই গুটিয়ে গেলাম।স্যারের ক্লাসে মাথা নিচু করে লুকিয়ে থাকতে চাইতাম।সবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইতাম আমাকে নিয়ে কি ভাবছে। আমার মধ্যে একটা চোর চোর ভাব চলে এলো।যেখানেই যেতাম নিজেকে চোর মনে হতো।অথচ এতো কিছুর পরও বাসায় কাউকে বিষয়টা জানাতে পারিনি।
পড়ায় মন বসতো না।ফলাফলা,আশানুরূপ রেজাল্ট করতে পারিনি টেস্টে।
টেস্টের পরে খুব কাছের এক বান্ধুবী একদিন জোর করেই বিষয়টা নিয়ে আমার সাথে কথা বললো এবং জানালো যে আমি সেদিন বেরিয়ে আসার পর আমার সাথে এমন করার কারনটা স্যার ওদের বলেছেন।
এবং কারনটা ছিলো আমার দুমাসের বেতন বাকি পড়ে গিয়েছিলো।
কারনটা শুনে প্রচন্ড হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।নিজের অন্যায়ের জন্য লজ্জা পাব নাকি স্যারকে নিয়ে লজ্জা পাবো ভেবেই পাচ্ছিলাম না।সে ঘটনার আজ ১৫ বছর পরও সে সময়কার প্রতিটা ফিলিংস আমার পরিষ্কার মনে আছে।আজও যতবার ভাবি কেবল অবাকই লাগে।বিষয়টা খুব ছোট হলেও ছোট্টো একটা মানুষের উপর কতটা প্রভাব পড়েছিলো তা এতো বড় একটা মানুষ কোনদিনও বুঝতেই পারেন নি।আমার আজও খুব ইচ্ছে করে স্যারের সামনে গিয়ে কথাগুলো বলি।
একবার গিয়েওছিলাম।কিন্তু শ্রদ্ধার সাথে কুশল বিনিময় করে চলে এসেছি।লজ্জায় বলতে পারি নি।
-আমাদের বড় লজ্জা।লজ্জার কারনে আমরা কাঁদি,খাই না,ঘুমাতে পারি না,কষ্ট পাই তবুও লজ্জাকে আমরা লালন পালন করি।

লজ্জা-২

একবার আম্মুর সাথে বেড়াতে গিয়েছিলাম বড়লোক খালার বাসায়। খালাতো বোনের রুমে বসিয়ে পেয়েরা কেটে খেতে দিয়েছিলেন খালা।লোভে পড়ে অনেকগুলো পেয়েরা খেয়ে ফেলেছিলাম। কিছুক্ষণ পর খালা আবারও পেয়েরা কেটে নিয়ে আসে আর আমাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে খালাতো বোনকে খেতে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। সেদিন বন্ধ দরজার পাশে বসা আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের খাই খাই স্বভাবের জন্য প্রচণ্ড লজ্জা লাগছিলো।
-আমাদের বড় লজ্জা।লজ্জার কারনে আমরা কাঁদি,খাই না,ঘুমাতে পারি না,কষ্ট পাই তবুও লজ্জাকে আমরা লালন পালন করি।

লজ্জা-৩
তখন ক্লাস টু তে পড়ি। বড় আপুর পরে ছুটি হলে একসাথে বাসায় যেতাম।তাই ছুটির পর কিছু বান্ধুবিসহ অপেক্ষা করতাম। সে সময় ওরা এটা সেটা কিনে খেত। আমার ইচ্ছে করলেও টাকা থাকতনা আবার লজ্জায় চেয়েও খেতাম না। পাশের দোকান থেকে লবন মরিচ মেশানো এনে খেতাম.বান্ধুবিরা নিষেধ করলে বলতাম এটাই আমার খুব প্রিয়।ওরা আর কিছু বলত না।একদিন খালি পেটে অনেক বেশি লবণ খেয়ে ভীষণ বমি করে আমি হাসছিলাম।বোঝাতে চাইছিলাম এটা কিছু না।ওরা অবাক হয়ে তাকিএ ছিল।আমার সেদিন খুব লজ্জা লাগছিলো।
আসলেই লজ্জা আমাদের মজ্জাগত।আমাদের রক্তে ঢুকে গেছে।এক জামা তিন-চার বার পরেছিলাম বলে পাশের বাসার ছেট্টো মেয়েটিও একদিন হঠাৎ বলে বসলো,”তোমার কি আর কোন জামা নাই?” এক জামা দুবার পরাও আমাদের লজ্জা এবং ছোট বাচ্চাটাও জানে কিভাবে দিতে হয় লজ্জা।আমরা লজ্জা বয়ে বেড়াবো।প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে লজ্জা বিলিয়ে বেড়াবো।সেই লজ্জাকে মজ্জাগত করে দিতেও আমাদের কোন লজ্জা করবে না। -আমাদের বড় লজ্জা।লজ্জার কারনে আমরা কাঁদি,খাই না,ঘুমাতে পারি না,কষ্ট পাই তবুও লজ্জাকে আমরা লালন পালন করি।

About The Author
Tamanna Tabassum
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment