অন্যান্য (U P)

তৈমুর লং

পৃথিবী শাসন করা বীরদের নাম নিলে প্রথমেই উঠে আসবে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, চেঙ্গিস খান, কুবলাই খান, জুলিয়াস সিজার, তৈমুর লং সহ বহু শাসকের নাম। কিন্তু অন্যান্য শাসকদের ন্যায় তৈমুর কোনো রাজপরিবারের সন্তান ছিলেন না। সামান্য ভূস্বামীর সন্তান তৈমুর ধীরে ধীরে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন, হয়েছেন বিশ্বজয়ী বীর। তৈমুর তার নিষ্ঠুরতার জন্য অন্যান্য শাসকদের নিকট ছিলেন এক মূর্তিমান আতংক। এমনকি মৃত্যুর পরেও তিনি পৃথিবীকে জানান দিয়ে গেছেন তার ফিরে আসার কথা।

তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস (চাগাতাই ভাষায়: تیمور – তেমোর্‌, “লোহা”)। তৈমুর ১৩৩৬ সালের ৯ এপ্রিল ট্রানসোক্সানিয়ার বার্লাসে (বর্তমানে যা উজবেকিস্তান) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা তারাক্বাই বার্লাসের একজন মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। জেরার্ডচালিয়ান্ডের মতে তৈমুর মুসলিম ছিলেন। তার পিতার নাম আমীর তারাগাই এবং তার মাতার নাম তেকিনা খাতুন। তিনি চেঙ্গিস খানের বংশধর না হওয়া স্বত্বেও নিজেকে চেঙ্গিস খানের উত্তরাধিকারী মনে করতেন। একারণে তিনি স্পষ্টতই তাঁর জীবনকালের সব সময় চেঙ্গিস খানের বিজয়কে উত্তরাধিকারসূত্রে দাবী করতে চেয়েছিলেন। তিনি একজন তুর্কি-মংগোলিয় বংশোদ্ভূত শাসক ও রাজ্য বিজেতা ছিলেন। তিনি পারস্য ও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে তৈমুরী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তৈমুরী রাজবংশের প্রথম শাসক ছিলেন । জন জোসেফ সন্দার্সের মতে তৈমুরের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল ইরানে এবং তিনি যাযাবর ছিলেন না। ট্রানসোক্সানিয়ার বার্লাসে (বর্তমানে যা উজবেকিস্তান) ৯ এপ্রিল ১৩৩৬ সালে জন্মগ্রহণকারী তৈমুর ১৩৭০ সালে পশ্চিম চাঘাতাইখানাত এর শাসন নিয়ন্ত্রণে নেন এবং সেটিকে ভিত্তি করে পশ্চিম, দক্ষিণ এবং মধ্য এশিয়া, ককেশাস এবং দক্ষিণ রাশিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি মিশর এবং সিরিয় অঞ্চলের মামলুকের পতন, ওসমানী সাম্রাজ্যের উত্থান এবং দিল্লীর সুলতানি শাসনের উৎখাত করে একসময়য় মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।

মঙ্গল সেনা আক্রমণের মুখে মাত্র নয় বছর বয়সে তৈমুরকে তার মা ও অন্য ভাইদের সাথে যুদ্ধবন্দী হিসেবে সমরকান্দে যেতে হয়। খুব ছোট বয়সেই তৈমুর এবং তার অনুসারীদের একটি ছোট দল ভেড়া, ঘোড়া এবং গবাদি পশু নিয়ে পণ্যদ্রব্যের ভ্রমণকারীদের উপর আক্রমণ চালায়।

কথিত আছে কৈশরের কোন এক সময়ে তৈমুর একটি মেষপালের কাছ থেকে মেষ চুরির চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু শরীরে দুটি তীর বিদ্ধ হওয়ায় তার চুরির চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তীর দুটির একটি তার ডান পায়ে ও আরেকটি তার ডান হাতে বিদ্ধ হয় ফলে তিনি দুটি আঙ্গুল হারান। এরপর থেকে পঙ্গুত্ববরন করে এই আঘাতের চিহ্ন তাকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। অনেকে আবার তার পঙ্গুত্বের পেছনে ভেড়া চুরির এই ঘটনাকে মেনে নিতে নারাজ তাদের মতে তৈমুর সিস্টানের খানের হয়ে খোরাসানে (বর্তমানে যা আফগানিস্তানের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চলে দাশ্তিমার্গো নামে পরিচিত) ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করার সময় আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরন করেন। তৈমুরকে সামরিক প্রতিভা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মধ্য এশিয়া শাসনকালে চরম রাজনৈতিক তারল্য পরিস্থিতিতেও মেধা ও কৌশল দিয়ে তিনি যাদুকরের মতো যাযাবরদের অনুগত করে রাখেন। শুধু স্বতন্ত্রভাবে নয় বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমান হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। শৈশব থেকেই সমরকান্দ সহ অনেক স্থানে ভ্রমণের কারণে তৈমুর অনেক পণ্ডিতের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং ফার্সি, মঙ্গোল এবং তুর্কি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। আহমদ ইবনে আরবা শাহ এর মতে তৈমুর আরবি ভাষা জানতেন না। আরও মনে করা হয় তিনি একজন সুবিধাবাদী মানুষ ছিলেন এবং তিনি তুর্কি-মঙ্গোল পূর্বপুরুষের পরিচয় দিয়ে অনেক সুবিধা ভোগ করতেন। তিনি সামরিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে যেখানে যেমন প্রয়োজন সে অনুযায়ী কোথাও ইসলাম ধর্ম আবার কোথাও মঙ্গোল সাম্রাজ্যের আইনকানুন ব্যবহার করতেন।

এক পা খোঁড়া হয়ে গেলেও তৈমুর দমে যাননি। আহত বাঘের মতো আরও হিংস্র হয়ে ওঠেন তিনি। তৈমুরের সময়ের প্রায় একশত বছর পূর্বে চেঙ্গিস খান পুরো পৃথিবীর শাসন করেছিলেন। তৈমুর মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন, তিনিও চেঙ্গিসের মতো পৃথিবী শাসন করবেন। তাই খোঁড়া পা নিয়ে সমরবিদ্যার প্রশিক্ষণ নেন তিনি। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি অস্ত্র চালনায় বেশ পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

তৈমুর যখন টগবগে যুবক, তখন সমগ্র মধ্য এশিয়া (আমু দরিয়া এবং সির দরিয়া নদীবিধৌত অঞ্চল) জুড়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। বিভিন্ন যাযাবর দল এবং স্থানীয় নেতাদের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ লেগে থাকতো। অপরদিকে স্থানীয় নেতারা অনেকটা পশ্চিমা মতাদর্শে শাসন করতেন। তারা চেঙ্গিস খান, কুবলাই খানের শাসনব্যবস্থা পরিত্যাগ করেছিলেন। এই কারণে স্থানীয় জনগণ তাদের উপর অসন্তুষ্ট ছিল। ১৩৪৭ সালে আমির কাজগান স্থানীয় নেতা চাগতাই খানাতের সর্দার বরলদেকে হটিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করেন।

তৈমুর তার জীবনের পরবর্তী ৩৫ বছর বিভিন্ন যুদ্ধ এবং অভিযান পরিচালনা করে কাটান। তিনি যে শুধু তার শত্রুদের মোকাবিলা করে নিজ সাম্রাজ্যকে সুসংহত করেছেন তাই নয় বরং তিনি এই সময়ের মধ্যে পার্শ্ববর্তী অনেক রাজ্য সীমানা আক্রমণ করে নিজ সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ করতে থাকেন। পশ্চিম এবং উত্তর পশ্চিমে পরিচালিত তার অভিযানে তিনি কাস্পিয়ান সমুদ্র এবং উড়াল ও ভলগা নদীর তীর পর্যন্ত বিজয় করেন। এবং দক্ষিণ পশ্চিমের অভিযানে বাগদাদ, কারবালা, উত্তর ইরাক সহ পারস্যের প্রায় সবগুলো অঙ্গরাজ্য তার দখলে আসে।

১৩৩৫ সালে আবু সাইদ এর মৃত্যুর পর পারস্যে নেতৃত্বশূন্যতা দেখা দেয়। ফলে পারস্য দ্রুত মুজাফফরি, কার্টিজস, ইরেটিনিডস, চবনাইডস, ইনজুয়েড, জালাইরাড এবং সারবারদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৩৮৩ সাল থেকে তৈমুর পারস্যের তার দীর্ঘ সামরিক বিজয় শুরু করেন, যদিও তিনি ১৩৮১ সালে সারবাদার বংশের খাজা মাজুদের পরে ফার্সি খোরসনের বেশিরভাগ শাসন করেছিলেন।

এরপর তৈমুর তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দিকে অগ্রসর করেন হেরাত দিয়ে যা ছিল কার্টিজ রাজবংশের রাজধানী। হেরাত যখন আত্মসমর্পণ করেননি তখন তিনি শহরটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেন এবং তার অধিকাংশ নাগরিককে হত্যা করেন। এরপর তৈমুর জার্গস পর্বতমালা দখলের উদ্দেশ্যে পশ্চিমের দিকে রওয়ানা করেন এবং পথিমধ্যে তেহরান বিজয় করেন।
১৩৮৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব দখলকৃত মিজারদান অঞ্চলে তৈমুর যান এবং সেখানে বিদ্রোহের সম্ভাবনা দেখে সাধারণ মানুষের ওপর ভারী করের বোঝা চাপিয়ে দেন। এরপর পুরোদমে পারস্য আক্রমণ করার জন্য তিনি উত্তরে তার জর্জিয়ান ও গোল্ডেন হর্ডের দিকে চলে যান। ফিরে এসে তিনি দেখেন তার নিযুক্ত সেনাপতি সফলতার সাথে সেই অঞ্চলটি রক্ষা করেছে।

এরপর তিনি দক্ষিণের প্রধান দুটি শহর ইসফাহান ও সিরাজের দিকে অগ্রসর হন। ১৩৮৭ খ্রিষ্টাব্দে যখন তিনি ইসফাহানে পৌঁছেন তখন দ্রুত শহরের শাসনকর্তারা তার কাছে আত্মসমর্পণ করে। একারণে তিনি শহরের জনগণকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন যা তিনি সাধারণত যারা তার কাছে বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে থাকে তাদের করতেন। কিছুদিন পরে সামান্য বিদ্রোহের জের ধরে তিনি ইসফাহান শহরে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানোর নির্দেশ দেন তার সেনাবাহিনীকে যার ফলে সেখানে প্রায় ১০০০০০ থেকে ২০০০০০ সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হয়।১৩৯৮ খ্রিষ্টাব্দে তৈমুর দিল্লীর সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ্‌ তুঘলককে আক্রমণের মাধ্যমে উত্তর ভারত আক্রমণ করেন। আহির এবং জেটরা তাকে সামান্য মাত্রায় প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু দিল্লীর সুলতানদের তাকে থামানোর মত ক্ষমতা ছিলোনা।
৩০ সেপ্টেম্বর ১৩৯৮ সালে ইন্দু নদী পাড়ি দিয়ে তিনি তুলাম্বা আক্রমণ করেন এবং সেখানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালান। তারপর অক্টোবরে তিনি মুলতানের দিকে অগ্রসর হন।
১৭ই ডিসেম্বর ১৩৯৮ সালে তৈমুর লং বনাম সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ্‌ তুঘলক ও মাল্লুইকবালের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। সুলতানের পক্ষে অনেক হাতি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে।মুহুর্তেই তুঘলকদের হস্তি বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায় এবং প্রায় অনায়াসেই তৈমুর দিল্লী জয় করেন। দিল্লীর যুদ্ধে তৈমুর প্রায় ১০০০০০ জনকে যুদ্ধবন্দী করেন।

তৈমুর, যার নাম শুনলে পৃথিবীর যেকোনো রাজার সিংহাসন থর থর করে কাঁপে, তার পরিস্থিতিও বেশ সুবিধাজনক না। তার উপরে আজ সকাল থেকে তার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে গেছে। দলের কবিরাজরা তৈমুরকে পরীক্ষা করেন। তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠে শঙ্কার ছাপ। এই মুহূর্তে পিছু না হটলে তৈমুরকে বাঁচানো সম্ভব নয়। কিন্তু তৈমুর নাছোড়বান্দা। রাগে গজ গজ করে উঠেন তিনি। শেষপর্যন্ত কাজাখস্তানের শীতের কাছে পরাস্ত হবেন! তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল, “পিছু হটা চলবে না। তৈমুর কখনও পিছু হটতে পারে না”। হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না। তাই শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এগিয়ে চললো তৈমুর বাহিনী। কিন্তু পথিমধ্যে শত শত সৈনিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। তৈমুরের নিজের অবস্থারও দিন দিন অবনতি হতে থাকলো।
শেষ পর্যন্ত তৈমুর হার মানলেন। কাজাখস্তানের ওতরার পর্যন্ত এসে ভেঙে পড়লেন তৈমুর। শীতের কারণে পিছু হটাও অসম্ভব হয়ে উঠলো। শেষপর্যন্ত ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ সকালে কাজাখস্তানের শীতের থাবায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন এশিয়ার ত্রাস তৈমুর লং। পৃথিবীর রাজাধিরাজরা যা করতে পারেননি, তা করে দেখালো সামান্য শীত!

দাফনের উদ্দেশ্যে তৈমুরকে সমরকন্দে ফিরিয়ে আনা হলো। শেষ ইচ্ছানুযায়ী তার কবরে বড় বড় অক্ষরে লিখে দেয়া হলো, “আমি যেদিন ফের জেগে উঠবো, সেদিন সমগ্র পৃথিবী আমার ভয়ে কাঁপবে!”

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সৌদি প্রিন্স ‘মোহাম্মদ বিন সালমান আল সাউদ’

Kongkon KS

সরকারী পদে বা কাজে সাজা প্রাপ্তদের সুযোগ না দেওয়া।

Mohammad Abubakker Mollah

বাংলাদেশের ডিজিটাল ম্যাপে মুক্তিযুদ্ধ

Md Motiar Rahaman

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy