কেইস স্টাডি

যেইভাবে তৈরি করা হচ্ছে কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল

কর্ণফুলী নদীর তলদেশে চলছে টানেল নির্মাণের কাজ, নির্মাণ হলে বদলে যাবে চট্টগ্রাম বদলে যাবে বাংলাদেশ ।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রাম শহরকে দুইভাগে বিভক্ত করেছে। এক ভাগে রয়েছে নগর ও বন্দর এবং অপর ভাগে রয়েছে ভারী শিল্প এলাকা। কর্ণফুলী নদীর উপর ইতোমধ্যে ৩ (তিন) টি সেতু নির্মিত হয়েছে, যা বিরাজমান প্রচুর পরিমাণ যানবাহনের জন্য যথেষ্ট নয়। নদীর মরফলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কর্ণফুলী নদীর তলদেশে পলি জমা একটি বড় সমস্যা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যকারীতার জন্য বড় হুমকি। এই পলি জমা সমস্যার মোকাবেলা করার জন্য কর্ণফুলী নদীর উপর আর কোন সেতু নির্মাণ না করে এর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকার চট্টগ্রাম জেলার দুই অংশকে সংযুক্ত করার জন্য কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
চট্টগ্রাম হলো বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর এবং বৃহত্তম বাণিজ্যিক নগরী। কর্ণফুলী নদীর মুখে অবস্থিত চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই অধিকাংশ দেশের আমদানি এবং রপ্তানি কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। প্রস্তাবিত টানেল চট্টগ্রাম বন্দর নগরকে কর্ণফুলী নদীর অপর অংশের সাথে সরাসরি সংযুক্ত করবে এবং পরোক্ষভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের মাধ্যমে সারা দেশের সাথে সংযুক্ত করবে। প্রস্তাবিত টানেল সাইটে নদীর প্রস্থ ৭০০.০০ মিটার এবং পানির গভীরতা ৯-১১ মিটার। প্রস্তাবিত টানেলের দৈর্ঘ্য ৩৪০০ মিটার।

কর্ণফুলী নদীর নেভাল একাডেমী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৩.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১০ মিটার প্রশস্ত নদী টানেল । এই দৈর্ঘ্যটুকুকে এখন চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্নের সমান বলা যায় । এখানেই নদীর তলাদেশ ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীর দিয়ে চলবে সারি সারি গাড়ি ।

কিভাবে প্রকল্পের শুরু

চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রথম টানেল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০০৮ সালে। বাংলাদেশের জন্য ‘প্রায় অসম্ভব’ মনে করে বিষয়টিকে ‘শুধুই জনসভার প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে ভেবেছে সাধারণ মানুষ। ২00৯ সালেই সরকার ৮,৪৪৬ কোটি টাকার আনুমানিক ব্যয় অনুসারে প্রস্তাবিত ৩.৪ কি.মি টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। । সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সমীক্ষার কাজ চললেও প্রতিশ্রুতি নিয়ে শঙ্কা দূর হয়নি চট্টগ্রামবাসীর। তবে ২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলে হাসি ফোটে সবার মুখে। দূর হয় সব কানা ঘষা। প্রকল্পটি বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ।এরপর জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজে অর্থছাড় করাতে যতটুকু সময় লাগে, ততটুকুই। এর পরই শুরু হয় নির্মাণকাজ।

এশিয়া মহাদেশের প্রথম টানেল সড়ক

ভারতে সড়ক যোগাযোগে স্থলভাগে টানেল থাকলেও নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম। বাংলাদেশের জন্য খুব গর্বের বিষয় ।

টানেল নির্মাণের আনুমানিক ব্যয়

২0১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট জিসিনপিং প্রকল্প উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বলেছিলেন , চীন কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশনস কোম্পানিগুলি বেশিরভাগ নির্মাণ কাজ করবে ।
চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংয়ের অক্টোবরে ঢাকায় কর্ণফুলি টানেল প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে একটি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলো।
চীনের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করার ঘোষণা দেন, তবে তহবিল বিলম্বের জন্য প্রকল্পটি দ্বিধাগ্রস্ত ছিল । স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জটিলতা দূর করার জন্য একটি মারাত্মক প্রচেষ্টা করে ।
ইআরডি সূত্র জানায়, বাংলাদেশকে প্রতিশ্রুত ঋণের ০.২৫ শতাংশ বা ১,৪০২,৩৯০ ডলার অর্থ প্রদানের জন্য পরিচালন ফি প্রদান করা হয়।
চীন দুই ধরনের লোন প্রদান করে থাকে, ঋণের উভয় ধরনের কিছু পরিচালনার খরচ আছে এবং চীন এক্সিম ব্যাংক সুদের হার ব্যতীত পরিচালনা ফি ধার্য করে এবং ফান্ড রিলিজের আগে ফি দিতে হবে।
২00৯ সালে সরকার ৮,৪৪৬ কোটি টাকার আনুমানিক ব্যয় অনুসারে প্রস্তাবিত ৩.৪ কি.মি টানেল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
ঋণ চুক্তির মতে, চীনা সরকার জি 2 জি ভিত্তিতে এই প্রকল্পের জন্য ৭০৫ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫,৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, বাকি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে।

টানেল দেখতে কেমন হবে ?

নকশা অনুযায়ী দৈর্ঘ্য হবে তিন কিলোমিটারের চেয়ে সামান্য বেশি। চট্টগ্রাম নগরীর নেভাল একাডেমি পয়েন্ট দিয়ে তলদেশে থেকে ঢুকে তা বের হবে ওপারে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কম্পানি (কাফকো) এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) মাঝামাঝি স্থান দিয়ে। নদীর তলদেশে এর গভীরতা হবে ১৮ থেকে ৩১ মিটার। মোট দুটি টিউব নির্মিত হবে। এর একটি দিয়ে গাড়ি শহরপ্রান্ত থেকে প্রবেশ করবে, আরেকটি টিউব দিয়ে ওপার থেকে শহরের দিকে আসবে। টানেলের প্রতিটি টিউব চওড়ায় হবে ৩৫ ফুট এবং উচ্চতায় হবে প্রায় ১৬ ফুট। একটি টিউবে বসানো হবে দুটি স্কেল। এর ওপর দিয়ে দুই লেনে গাড়ি চলাচল করবে। পাশে হবে একটি সার্ভিস টিউব। মাঝে ফাঁকা থাকবে ১১ মিটার। যেকোনো বড় যানবাহন দ্রুত স্বাচ্ছন্দে চলতে পারবে এই টানেল দিয়ে।

টানেল বাস্তবায়নে দেশের লাভ কি কি হবে ?

টানেল নির্মাণকে কেন্দ্র করে কর্ণফুলী নদীর ওপারে বিনিয়োগ শুরু করেছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে কর্ণফুলী নদীর ওপারে আংশিক চালু রয়েছে কোরিয়ান ইপিজেড। পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে কিছু শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে।
টানেল নির্মাণের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সরকার আনোয়ারায় একটি ইকোনমিক জোন স্থাপন করছে। পাশাপাশি চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ ‘চায়না ইকোনমিক জোন’ বাস্তবায়িত হচ্ছে।প্রকল্প এলাকার সাংসদ এম এ লতিফ বলেন, ‘দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে চট্টগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিনিয়োগ ধরে রাখার মতো জমি এখন আর চট্টগ্রাম শহরে নেই। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্ণফুলী নদীর ওপারকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি করতে টানেলটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’এইটাকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল হবে সেখানে। আর এশিয়ান হাইওয়ে ও নতুন সিল্ক রুটে প্রবেশ করবে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম হয়ে উঠবে অর্থনৈতিক করিডর ।
কর্ণফুলী নদী টানেল প্রকল্পটির বিশাল অগ্রগতি দেখায় চীনের এক্সিম ব্যাংক তার তহবিলগুলির প্রথম কিস্তি প্রদান করে, মেগা স্কিমের সমস্যা দূর করে দেয়।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানান, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্র্যাফিক সংকোচন সহজতর করার জন্য পরিকল্পিত অর্থের প্রথম তহবিল হিসেবে চীন এক্সিম ব্যাংক সম্প্রতি ১৩৭.৬ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।
চীনা ঋণ সংস্থার সাথে ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও প্রকল্পটিকে শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের পরিমাণ না পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি অর্থায়ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছিল।
“ইআরডি সচিব কাজী শফিকুল আজম মন্তব্য করেন “প্রকল্পের দীর্ঘদিনের জটিলতার মুখোমুখি হয়েছিল কারণ ফান্ডটি মুক্তি পাচ্ছে না। কিন্তু এখন ইসিডি’র চীনের এক্সিম ব্যাংকের সাথে সফল আলোচনার পর সমস্যাটি চলে গেছে,
তিনি আরও বলেন, “আমরা আশা করি প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন কোন সমস্যা হবে না এবং প্রকল্পটির কাজটি আরও বাড়বে”।

কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ২৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শনিবার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণকাজ পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেছেন ।
২0১৫ সালের নভেম্বরের প্রকল্পটি ২0২২ সালের জুনে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে ।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সুস্থতার চাবিকাঠি “খাদ্যাভাস পরিবর্তন”

MP Comrade

স্বাধীন চাকুরী – ফ্রিল্যান্সিং

হিটলার পার্ট ওয়ান

Sharmin Boby

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy