Now Reading
চট্টগ্রাম শিপ ইয়ার্ড ব্রেকিং কি সচল হবে ?



চট্টগ্রাম শিপ ইয়ার্ড ব্রেকিং কি সচল হবে ?

জাহাজ ভাঙ্গা মানে হচ্ছে পরিত্যক্ত জাহাজ কে কিনে ফুল স্পীডে ইন্জিন চালিয়ে মাটির উপরে তোলা হয় এবং তারপর কেটে বিভিন্ন স্টীলের মিলে নিয়ে নতুন লোহা উৎপাদন করে| বাংলাদেশে এই রকম ১২০ টির মতো শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড আছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারি তে । এইসব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড কন্টেইনার জাহাজ, ট্যাংকার, কার্গো জাহাজ, পেসেঞ্জার জাহাজ কাটা হয় এবং যা বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ লোহার চাহিদা পূর্ণ করে । কেউ যদি চায় তাহলে lifejacket, আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিস , বা বিভিন্ন Antiques কিনতে পারবেন ভাটিয়ারি থেকে । অবিশ্বাস্য চোখে দেখবেন কিভাবে ১০০-৩০০ মিটারের জাহাজ মাটির উপরে তুলে এবং জাহাজ কাটার দৃশ্য , মাথা উচু করে তাকিয়ে দেখতে হবে ।

চট্টগ্রাম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প এর উৎপত্তি

চট্টগ্রাম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প , চট্টগ্রামের উত্তর-পশ্চিমে ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) ১৮ কিমি (১১ মাইল) সীতাকুন্ড উপকূলীয় ফালা বরাবর ফৌজদারহাট, সীতাকুন্ড উপজেলায় অবস্থিত। বিশ্বব্যাপী মোট পঞ্চমাংশের পরিচালনায় একশ টির অধিক ইয়ার্ড, দুই লক্ষেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থান । এটা পৃথিবীর বৃহত্তম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিএসবিএ-র দাবি, সীতাকুন্ডুর জাহাজ ভাঙ্গার এসব ওয়ার্কশপই বিশ্বে খোলা আকাশের নিচে ওয়ার্কশপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ।

চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড নিয়ে একটি ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬০ সালে, একটি গুরুতর ঘূর্ণিঝড়ের পরে, গ্রিক জাহাজ এম ডি অ্যালপাইন নামের চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডের তীরে বিধ্বস্ত হয়েছিল। এটি পুনরায় চালু করা যায়নি এবং তাই বহু বছর ধরে সেখানে ছিল। ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রাম স্টিল হাউস জাহাজটি কিনে নেয় এবং এটি ভেঙ্গে দেয়। জাহাজটি কেটে ফেলতে বছর লেগেছিল, কিন্তু কাজটি বাংলাদেশের শিল্পকে জন্ম দেয়।

বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি জাহাজ আল আব্বাস বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে রাশিয়ান একটি দল জাহাজটি দলের মাদ্ধমে উদ্ধার করা হয়, রাশিয়ান দলটি তখন চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করছিল এবং জাহাজটি ফৌজদারহাট সমুদ্রবন্দরে আনা হয়েছিল। একটি স্থানীয় সংস্থা, কারনায়েজ মেটাল ওয়ার্কস লিমিটেড এটি ১৯৭৪ সালে স্ক্র্যাপ হিসাবে কিনেছিল এবং বাণিজ্যিক জাহাজ ভাঙ্গা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ।

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি শিল্পটি ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি আমাদের দেশটি টনেজের দ্বারা বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করে। ২০০৮ সালে, এ অঞ্চলে ২৬ টি জাহাজ ভাঙা গজ ছিল, এবং ২০০৯ সালে ৪০ টি ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত, এই অঞ্চলটি বিশ্বের বৃহত্তম জাহাজ ভাঙা গজ ছিল। তবে, ২০১২ সালের মধ্যে এটি বিশ্বব্যাপী জাহাজ ভাঙনের অর্ধেক থেকে পঞ্চমাংশে নেমে আসে ।

এক পর্যায়ে চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড শিল্পটি একটি পর্যটক আকর্ষণ হয়ে যায় , চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে বিগত বছর গুলোতে সকল স্তরের বিভিন্ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে এক হাজার তিনশত জনেরও বেশী । আবার অনেকেই অক্ষম ও পঙ্গু হয়ে গেছে সারা জীবনের জন্য । লক্ষ লক্ষ টাকা চাঁদা নেওয়ার পরও বি এস বি ও প্রতিশ্রুত শ্রমিকদের জন্য হাসপাতাল এখনও চালু হয়নি । বর্তমানে এই শিল্প পুরনো যন্ত্রপাতি , নানা রকম মূল্যবান সামগ্রী ও প্রক্রিয়াজাতকরনের জন্য লক্ষ লক্ষ টন লোহা সরবরাহ করছে । দেশের লোহার চাহিদার ৮০ শতাংশই জোগান দিচ্ছে এই জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প , যা দেশের নির্মাণ শিল্পে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান । কিন্তু জাহাজ ভাঙ্গার মত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হাজার হাজার শ্রমিকের আর্থিক ও স্বাস্থ্য তো বটেই জীবনের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর নিশ্চয়তা নেই শিল্প মালিকদের ।এই শিল্পে কাজ করার বেশিরবভাগ শ্রমিকই আসছে বরিশাল , কুমিল্লা , চাঁদপুর , ময়মনসিং , বগুরা ও নোয়াখালি সহ বিভিন্ন দারিদ্রপীড়িত অঞ্চল থেকে । যাদের নেই কোন প্রশিক্ষন এবং শ্রমিক হিসেবে সম্পূর্ণ অদক্ষ ।

ছবি সূত্র ঃ theVintagenews.com

আর তাই বহিরাগতরা এর দুর্বল নিরাপত্তা রেকর্ডের কারণে আর স্বাগত জানায় না , স্থানীয় পাহারাদার দল দাবি করে যে সপ্তাহে একজন করে কর্মী গড় হারে মারা যায়।শ্রমিকদের কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম বা আর্থিক নিরাপত্তা নেই। আভাবেই অসচল হয়ে গেছে চট্টগ্রাম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প ।

শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

জাহাজ ভাঙ্গার কর্মকাণ্ডটি প্রথম থেকেই অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছে । উন্নত বিশ্বে যেখানে পরিবেশ বান্ধব উপায়ে জাহাজ ভাঙ্গা হয় সেখানে আমাদের জাহাজ ভাঙ্গা হয় সনাতন বা বিচিং পদ্ধতিতে । এই পর্যায়ে জোয়ারের সময় জাহাজের সাথে মিশে থাকা দুষিত পদার্থ সহজেই সমুদ্রের পানিতে মিশে যাচ্ছে । এতে করে সামুদ্রিক মাছ সহ ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের ।

বিবেচনার বিষয় সমূহ

শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড শিল্পের মাদ্ধমে যদিও দেশের প্রচুর রাজস্ব আসছে কিন্তু এর ক্ষতিকর দিকও বিবেচনাই আনা খুব দরকার । সনাতন পদ্ধতিতে অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে জাহাজ কাটার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে একদিকে শ্রমিক মারা যাচ্ছে আবার অন্যদিকে পরিবেশ মারাত্মক ভাবে দুষিত হচ্ছে । এসব সমাধানের লক্ষে দেশের শিল্পে শ্রমিকের প্রশিক্ষন এবং পরিবেশ দুষণ দূর করতে সরকারের পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন । এসব পদক্ষেপ এর মাদ্ধমেই সচল হতে পারে চট্টগ্রাম জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প ।

About The Author
Sharmin Boby
Sharmin Boby
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment