Now Reading
পেরুর রহস্যময় ‘ফুটন্ত নদী’ নামলেই মৃত্যু অনিবার্য



পেরুর রহস্যময় ‘ফুটন্ত নদী’ নামলেই মৃত্যু অনিবার্য

যুগ যুগ ধরে রহস্য আর বিচিত্র সব কিংবদন্তির জন্ম দিয়ে আসছে আমাজন। আমাজনের গহিন জঙ্গল যে গভীর রহস্যে মোড়া, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তবে দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে আমাজন জঙ্গলের রহস্যজনক গরম পানির নদীএই তো কিছু দিন আগেও এ মহাবনের বিপুল সাম্রাজ্যের সবটুকু অংশে পা ফেলতে পারেনি মানুষ। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়ন আর অনুসন্ধিৎসুদের দুর্নিবার আগ্রহের ফলে আমাজনের অনেক রহস্যেরই উদঘাটন হয়েছে। এ যেমন আমাজনের গভীরে একটি রহস্যময় নদীর সন্ধান পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন এক ভূ-বিজ্ঞানী।রূপকথার এক নদী, যেখানে গরম পানিতে পড়ে সিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় পশুপাখির। হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে সেই ফুটন্ত পানির নদীর গল্প। রূপকথায় আছে, স্প্যানিশ বিজেতারা স্বর্ণের খোঁজে আমাজনের গহীনে গিয়ে ফিরে এসে বিষাক্ত পানি, মানুষ খেকো সাপ আর টগবগে ফুটন্ত নদীর গল্প শোনাতেন।

ছবি সূত্র nationalgeography

চার মাইল দীর্ঘ এ নদীর পানি এতটাই গরম যে কোনো কিছু পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধ হয়ে যায়। আমাজনের ভেতরে এ ধরনের নদী থাকার গল্প যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটির জিওফিজিক্সের ছাত্র রুজো দাদার কাছে প্রথমে শুনে বিশ্বাস করেননি । রুজো ভেবেছিলেন, দাদুর অন্য রূপকথার গল্পের মতো এটিও শুধুই গল্প।

রুজোর ধারণা, আমাজনের ভেতরে গরম পানির নদী থাকা অসম্ভব। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, ছোট একটি নদীর পানি গরম করতে ভূমিতে বিপুল পরিমাণ তাপ প্রয়োজন। এ ছাড়া আমাজন অববাহিকায় কোনো সক্রিয় আগ্নেয়গিরি নেই , আর নিকটতম আগ্নেয়গিরি সাতশো কিলোমিটার দূরে । তবু পানির তাপমাত্রা ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস , পানির এতো তাপমাত্রা আন্দ্রে রুজোর মনে প্রশ্ন জাগে এমন নদী রূপকথায় এলো কোত্থেকে ? পেরুর মায়ানটুইয়াসু এলাকার ওই নদীটির গল্পে রুজোর দাদা তাকে বলেছিলেন, ১৬ শতাব্দীতে ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাটকে হত্যা করে স্প্যানিশ বিজেতা আমাজনে যান স্বর্ণের খোঁজে। সেখান থেকে ফিরে আসার পর তার সফরসঙ্গী লোকজন আমাজনের ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে- আমাজনের অধিবাসীরা নাকি নদীর পানিতে সাপ সিদ্ধ করে খায়।এর পর সাউদার্ন মেথোডিস্ট ইউনিভার্সিটির ভূ-প্রকৃতিবিদ্যার পিএইচডি শিক্ষার্থী রুজো সেই গরম পানির নদীটি খুঁজে বের করার সংকল্প করেন। বড় হয়ে বৈজ্ঞানিক কৌতূহলেই স্প্যানিশ এই তরুণ ভূ-বিজ্ঞানী অ্যান্ড্রেস রুজো রূপকথার সেই নদীর সন্ধান খুঁজে বের করলেন পেরুতে। নদীটি চওড়ায় ২৫ মিটার, গভীরতা ছয় মিটার। গরম পানির প্রবাহ আছে সোয়া ছয় কিলোমিটার জুড়ে ।
তবে আমাজনে এ নদী সন্ধানের আগে তিনি অনেকের কাছে জানতে চেয়েছেন, বাস্তবে এ ধরনের কোনো নদী আছে কিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী, সরকারি অফিস , তেল-গ্যাস ও খনি কোম্পানির কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়ে তাকে হতাশ হতে হয়। তাদের সবার কাছ থেকেই এ ধরনের নদীর অস্তিত্বের বিষয়ে কোন উত্তর পায়না তিনি। ফলে একরকম সংশয় ঘিরে ধরে তাকে। এরও ১২ বছর পর পারিবারিক এক নৈশভোজে সেই নদীর কথা আবার আলোচনায় আনেন তার চাচি। রুজোর মা জানান, তিনি ও তার বোন সাঁতার কেটেছেন এই নদীতে। চাচি বলেন , তিনি ওই নদী পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু সংশয় সত্ত্বেও রুজো গরম জলের নদীর খোঁজে আমাজন ভ্রমণে বের হন। দিকনির্দেশনায় ছিলেন তার চাচি।
২০১১ সালে রুজোর ভুল ভাঙে , চাচিকে দেখে আসেন রহস্যময় সেই নদী।। তিনি নিজ চোখে দেখে আসেন আমাজনের সেই ফুটন্ত জলের নদী।

ছবি সূত্র Amazon boiling river project

অবশেষে চার মাইল দীর্ঘ সেই ফুটন্ত জলের নদীর সন্ধান পান রুজো। নদীটি প্রস্থে ২৫ মিটার এবং গভীরতা ৬ মিটার। চার মাইল লম্বা এই নদী থেকে ধোঁয়া উঠছে_ যেমন ফুটন্ত পানি থেকে ওঠে । আর নদীর পানিতে পড়ে রয়েছে নানা রকম পশু-পাখির মৃতদেহ। জল খাওয়ার আশায় নদীতে নেমে পশু পাখিগুলো আর ফিরে যেতে পারেনি। এর পানি এতই গরম যে চা বানিয়ে খাওয়া যায়। টেড ডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে রুজো বলেন, নদীর জলে হাত ডোবানোর আধা সেকেন্ডের মধ্যে তিন ডিগ্রি মাত্রার জ্বলুনি পাই আমি। তিনি আরো বলেন, এ নদীর পানিতে পড়ে কোনো জীবজন্তুই বেঁচে থাকতে পারে না। ব্যাঙের মতো অনেক প্রাণীকে এই নদীতে আমি পড়তে দেখেছি। পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা রান্নার মতো সেদ্ধ হয়ে যায়।

ছবি সূত্র Amazon boiling river project

রুজোর দাবি, বিশ্বে এমন নদী এই একটাই। যার স্থানীয় নাম শানায়-তিমপিশকা অর্থাৎ সূর্যের তাপে টগবগে।

গবেষণায় রুজো দেখেছেন বৃষ্টির মতো একটি ঝর্ণার পানি এই নদীতে পড়ে প্রবাহিত হচ্ছে উল্টো দিকে। তাতেই প্রকাণ্ড এক জলবিদ্যুৎ তৈরির মতো করে পৃথিবীর ভূ-তাপীয় শক্তিতে গরম হয়ে উঠছে পানি। এমন প্রাকৃতিক কাণ্ড আর কোথাও দেখেনি এখনও। তিনি জানান, নদীর কাছাকাছি এলাকায় যথেচ্ছ গাছ কাটা হচ্ছে। উপজাতিরা চাষের জন্য জমি তৈরি করছেন। তাই বিশ্বের বিস্ময় ওই ফুটন্ত নদীকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান রুজো। না হয় অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে মায়ানতুইয়াসু ।

সূত্র গিজমড

About The Author
Sharmin Boby
Sharmin Boby
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment