Now Reading
লাতিন আমেরিকায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে কিশোরী মাতৃত্ব যা রোধে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার……



লাতিন আমেরিকায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে কিশোরী মাতৃত্ব যা রোধে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার……

শহরের নাম ইস্তেবানিয়া। দেশটির দক্ষিণ উপকূলের শহরটি পরিচিত ‘লা ভিলা দে লাস বেলাস’ বলে, অর্থাৎ ‘সৌন্দর্যের শহর’ নামে। তবে জলরাশিঘেরা অপরূপ শহরটিতে কলঙ্কের দাগের মতো বসে আসে কিশোরী মাতৃত্ব। বিশ্বজুড়ে কিশোরী মাতৃত্বের বিরুদ্ধে যে এত লড়াই, এর কোনো প্রভাব নেই সেখানে। বেশির ভাগ মেয়ে কৈশোরে পা দিয়েই মাতৃত্বকে বরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছে। দুই-পঞ্চমাংশ মা সেখানে কিশোরী। আফ্রিকার পর কিশোরী মাতৃত্ব হারের দিক দিয়ে এই শহরের অবস্থান।
শহরের এক নার্সের ভাষায়, এত কম বয়সে মা হওয়া মানে এটা বোঝায় না যে শহরের মেয়েরা দারুণ সুন্দর। এর জন্য যৌনতা নিয়ে যথাযথ জ্ঞানের অভাব এবং যথেচ্ছ মেলামেশাকে দায়ী করেন তিনি।

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কমবেশি ইস্তেবানিয়ার মতোই দশা! লাতিন আমেরিকার এক-তৃতীয়াংশ নারী ২০ বছর বয়স পেরোনোর আগেই মা হন। সাব-সাহারা আফ্রিকা ছাড়া আর কোনো অঞ্চলে এত বেশি হারে কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা ঘটে না। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক শাখা প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থা (পিএএইচও), জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কিশোরী মাতৃত্বের উচ্চহার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এতে এই পরিস্থিতির জন্য জন্মনিরোধক পাওয়ার ঘাটতি ও নারীর প্রতি সহিংসতাকে দায়ী করা হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি এক হাজার কিশোরীর সন্তান জন্মদানের হার ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই বয়সী কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার প্রতি হাজারে ৪৬ শতাংশ।

লাতিন আমেরিকা একমাত্র অঞ্চল, যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে মাতৃত্বের হার বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মা হওয়ার হার ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের তুলনায় তিন গুণ বেড়েছে।
এই অঞ্চলের সরকারগুলো এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে এটা একটি সমস্যা। কিশোরী মাতৃত্বের হার কমাতে এক দশক ধরে জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এ খাতে ধীরগতিতে অগ্রগতি হচ্ছে। কম বয়সী মা ও শিশু দেশের জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনে। ১৬ বছরের কম বয়সের মায়ের মৃত্যুহার ২০ বছর বয়সী মায়ের তুলনায় চার গুণ বেশি। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় লাতিন আমেরিকার নারীরা দেরিতে বিয়ে করেন। ফলে, সামঞ্জস্যহীনভাবে কিশোরী মায়েদের একাকী মা হতে হয়। মেক্সিকোতে গড়ে ২৭ বছর বয়সে নারীরা বিয়ে করেন। তবে সেখানে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় এক–চতুর্থাংশ একাকী মা রয়েছেন।

লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিতে কৈশোরে মা হওয়াকেই উৎসাহিত করা হয়। এই অবস্থা পরিবর্তনে সরকারের তরফ থেকে পদক্ষেপ খুব কম। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেয়েরা পড়াশোনার চেয়ে মা হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এক-তৃতীয়াংশ ডমিনিকান নারী মা হওয়ার জন্য বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়।
লাতিন আমেরিকায় ক্যাথলিক গির্জার প্রভাব রয়েছে। তাই সেখানে যৌনতা নিয়ে সেভাবে খোলামেলা আলোচনা করা হয় না। হন্ডুরাসে ক্যাথলিক ও ইভানজেলিকাল গির্জাগুলো গত বছর দেশটির পাঠ্যপুস্তকে যৌনবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে। জন্মনিয়ন্ত্রণেরও বিরোধিতা করে গির্জাগুলো। এসব কারণেও সরকারগুলো কিশোরী মাতৃত্ব হ্রাসে জোরালো ভূমিকা রাখতে চায় না।

লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো জানিয়েছে, তারা কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের হার কমানোর চেষ্টা করছে। গত ১৫ বছরে এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা তারা প্রকাশ করেছে। তবে সেগুলোর বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরকে লক্ষ্য করেই নেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কখনো কখনো সরকারগুলো তাদের পরিকল্পনার কোনোটাই বাস্তবায়ন করে না। আর্জেন্টিনা ও চিলির দুই প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের পাঠ্যসূচি যৌনবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর্জেন্টিনায় অর্ধেকেরও কম প্রদেশে তা গ্রহণ করা হয়েছে। আর চিলির বিদ্যালয়গুলোয় যৌনবিষয়ক শিক্ষার কথা শোনাই যায় না। মেক্সিকো এ বিষয়ে ২০১৫ সালে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানালেও তা বাস্তবায়নে এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর অব্যাহতভাবে দায়িত্ব চাপিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ২০১৩ সালে পরিকল্পনা নিলেও বাস্তবায়ন করেনি। আর এখন দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। সরকার বিনা মূল্যে জন্মনিরোধক সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।

About The Author
salma akter
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment