Now Reading
“আমাদের বিলুমামা”



“আমাদের বিলুমামা”

……আমাদের বিলুমামা…..

কমলাপুর রেলস্টেশন আসতে আর হয়তো কয়েকটা মিনিট লাগবে..রেল এর গতি যত কমতে থাকে আমাদের চার ভাইবোনের তিরিংবিরিং যেন বিপরীত গতিতে বাড়তে থাকে,আম্মুর চিল্লাচিল্লি তখন আমাদের কানের অনেক দুরে।।
কে আগে দেখবে বড়ামামা কোথায় দাঁড়িয়েছে,এই ভাইবোনদের খুনসুটি,দৌড়ে গিয়ে জানালার বাইরে মাথা বের করে রাখা,আর প্রতিবারই যেই দেখুকনা কেন ক্রেডিটটা নিতো আসিফ ভাইয়া(আমার বড় ভাই)আহা তার সেই কি দাদা গিরী।।
বড়ামামার দেখা পেয়ে আমরা যেন বিশ্বজয়ের আনন্দে মেতে উঠতাম।
আম্মু সব মালপত্র সমেত আমাদের দুই কাজের মেয়ে কে নিয়ে নামার আগেই আমরা চারভাইবোন ঠেলাঠিলি করে নেমে পরতাম,বড়ামামার টুডোর পাবলিকা গাড়িটা যে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় যানবাহন।এটাকে মুরিরটিন বানিয়ে চাপাচাপি করে বসার মজাটা বোধহয় আমাদের জেনারেশনের বাচ্চারাই জানে(৯০ই দশকের কিডস)নানুর বাড়ি পৌঁছাতেই গেটের বাইরে অপেক্ষায় থাকতো বিলু মামা। হ্যা আমাদের সবার রাজা বিলুমামা।।
আমরা গাড়ি থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামতাম আর সে গুনতে থাকতো আমাদের।

–পঙ্গের পাল নিয়ে হাজির হইসে রোজী,আম্মা জলদি আস বলেই নানুকে চিৎকার দিয়ে ডাকতো বিলুমামা !!(রোজী আমার আম্মুর নাম)

–বিলু তুই বদমাইশি বাদ দিয়ে সব ভিতরে নেতো,আম্মু ধমক দেয়!

সেদিন সবার দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কি যে জমপেস আড্ডা হতো,এই আড্ডার মধ্যমনি থাকতো আমাদের বিলুমামা।সে আমাদের সবাইকে কী যে অদ্ভুদ সব নামে ডাকতো,এটা তার স্বভাবের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক, কোন এক আজব কারণে বিলুমামা কাউকেই তার নিজের নাম ধরে ডাকতো না, সে তার নিজের মতো করে একটা করে নাম রেখে দিত। বিকেল হলেই সে আমাদেরকে হোমওয়ার্ক দিত সিনেমার নাম খুঁজে বের করা,আমরা নাইট সো কি দেখবো সেটার লিস্ট বানানো,(ভিসিয়ার এ মুভি দেখা)
মানুষটা যে এতো মজা করতে পারতো, সারাক্ষণ বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখতো তার মজার মজার কান্ডকারখানা দিয়ে।আমার আর নাতাশার(খালাতোবোন) মধ্যে মারামারি লাগানোটায় সে এতো মজা পাইতো সেটা তখন যতটা রাগ উঠতো এখন চিন্তা করলে ভীষণ হাসি পায়। সে ক্লিকবাজী করে আমাদের মধ্যে ঝগড়া লাগায় দিত আর আমরা গাধারা মারামারি করতাম এদিকে বিলুমামা হইতো রেফারি,নাতাশার গায়ের রং ফরেনারদের মতো বলে ওকে ফিরীঙ্গি নামে ডাকতো,আর আমি ছিলাম সেই ছোটকাল থেকেই বিরাট রংঢং করা টাইপ বাচ্চা তাই আমার নাম করণ করেছিল “রঙ্গু” নামে,সে আমাকে কখনই নামধরে ডাকছে বলে আমার মনে পরেনা,আমাকে সে ডাকতো “রঙ্গু”বলে।।
আমি আর নাতাশা যখন জানালা ধরে ঝুলতাম তখন সে প্রায়ই পেছনে এসে সুন্দর সুন্দর কথা বলতো।যখন চলে যেত একটু পরেই টের পেতাম সে আমাদের দুইজনের চুলের বেণী একসাথে গিট্টু দিয়ে চলে গেছে।
কখনও তো স্কার্টের পেছনে মিষ্টির বক্সের দড়ি দিয়ে লেজ লাগিয়ে দিত,কি যে যন্ত্রণা করতো বাড়ির সবগুলো বাচ্চাকে।আবার সবচেয়ে বেশী আদরও করতো সে।তাই আমরা কেউ ওর উপর কখনই রেগে থাকতে পারতামনা,বরঞ্চ যখন নানুবাড়ি আসতাম সে যদি দেশের বাইরে থাকতো সেইদিনগুলো কি যে বোর হতাম আমরা, সে কবে আসবে সেই অপেক্ষার প্রহর গুনতাম।
কোন এটারী, কোন নিনটেনডু,প্লেবয়,সেগাম্যাগা গেমস,কখন কোনটা কাকে কিনে দিতে হবে কোন ডিভাইসটা মার্কেটে নতুন আসছে সে খুব ভালো খবর রাখতো এবং জানতো।আম্মু সবসময় বকা দিত বিলুমামাকে “কি শিখাশ তুই বাচ্চাগুলারে?? এতো গেমস কিনে কি হবে???”

—রোজী তুমি কিচ্ছু জানোনা,বাচ্চাদের স্মার্ট করতে হলে এসব সম্পর্কে ধারনা দিতে হয়,বলতো বিলুমামা।

বরাবরই ভ্রমন পিপাসু আমাদের বিলুমামাটা কোন দেশে না বেরিয়েছে।আর আসার সময় নিয়ে আসতো আমাদের সবার জন্য গিফট।
কি ভয়ঙ্কর চুজি একটা মানুষ ছিল সে,কারো পছন্দ যে এতো ভালো হতে পারে সেটা ওকে না দেখলে আমার অজানা রয়ে যেত।
বিলুমামাটাই আমাদের শিখিয়ে ছিল স্টাইল কিভাবে করতে হয়,ব্র্যান্ড কি জিনিস,জগতের অদ্ভুদ নিয়মে কিভাবে যে অনেক গুলো বছর কেটে গেল আমরা সবাই বড় হয়ে গেলাম,আস্তে আস্তে প্রিয় মানুষগুলো প্রকৃতির নিয়মে দূর আকাশের তারা হয়ে গেল।।একে একে নানাভাই,নানু,খাও(আমাদের খালুকে আমরা খাও ডাকতাম) তারপর আম্মু,আব্বু।সবাই চলে গেল আমাদেরকে পৃথিবীতে রেখে।
রঙিন পৃথিবীটা কেয়কটা বছরের মধ্যে বিবর্ন হয়ে গেল।হয়ে গেল ভীষণরকম নিষ্ঠুরও।

আব্বু আম্মু চলে যাওয়ার পর বিলুমামা আমাদের চারটা ভাইবোন কে একটা ছায়ার মতো ঘিরে রাখছিল।তার কাছে আসলে মনে হতো এখনও বোধহয় আমরা সেই ছোট।তার দুষ্টুমি এতটুকু কমেনি,মুমু (আমার ছোটবোন)কে সে ডাকতো ব্যঙ্গা বলে।
দেশের বাইরে যাবার আগে মুমুকে বলতো কি লাগবে জানাও,মুমুও মহা আনন্দে লিষ্ট বলতে থাকতো।
আমাদের কমন জিনিস মাথা ব্যথার সময় লাগানো মাথার বাম,ব্যাঙ্কক স্পেশাল।।
সেটা সে আনতে কখনও ভুলতোনা,এই হাস্যজ্জ্বল দুষ্টু মানুষটা কেন যে বিয়েটা করলোনা এই রহস্যটা আর কোনদিন জানা হলোনা।

নিজের এতো কিছু থাকতে, এতো লাক্সারিয়াস ভাবে সে দেশের বাইরে গেলে থাকতো অথচ নানুর বাসায় সে একটা বেডরুম পর্যন্ত করেনি,সারাটা জীবন হেসে হেসে ড্রইংরুমকেই নিজের রুম বলে চালিয়ে গেল।

বিলুমামার শরীরে যে কখনও ক্যান্সার বাসা বাঁধবে আমরা কেউ কল্পনাও করিনি।আস্তে আস্তে সে একা থাকতে ভয় পাওয়া শুরু করলো সেটা হয়তো অসুস্থতার জন্য,সারাটাক্ষণ সে চাইতো সবাই তার আসে পাশে থাকুক।
মেসিথেলিওমার মতো এগ্রেসিভ ক্যান্সার নিয়ে সে একদিকে ব্যথায় কোকাচ্ছে পর মুহুর্তে আমাদের সবার সাথে দুষ্টুমি করছে আহারে আমার বিলুমামা।
আমার বাচ্চাটা (ওর নাম রাই)জন্মের পর থেকে শুকনা ছিল তাই ওকে ডাকতো টিকটিকি বলে ইদানিং একটু মটু হয়ে গেছে বলে ওকে বলতো,টিকটিকি তো এখন কুমির হয়ে গেল রে।আমি যখন আসতাম বলতো পান্ডারে(মুনমুনআপু আমার আরেক খালাতোবোন) ডাক দে,তোরা দুইটা গ্যাস বেলুনের মতো ফুলতেছিস কেন???বলে গালটা গোল করে দেখাতো।আহারে।।

মানুষটা গত ৪ টা মাস ধরে ব্যাঙ্কক হসপিটাল থেকে যখন ক্যমোথ্যরাপী নিয়ে ফিরত এতোটা কস্ট হয়নি দেশে আসার পর মারা যাবার আগের ৩ দিন যা হয়েছে।হ্যা সে আর আমাদের সাথে নেই,চারটা মাস ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে আমাদের বিলুমামা পারি দিয়েছিল ঐপারে যেখানে তার জন্য অপেক্ষায় ছিল তার খুব কাছের মানুষগুলো।।

৮ই অক্টোবর ২০১৬ সালের বিকেলবেলায় মিরপুর বুদ্ধীজীবি কবরস্থানে আমাদের প্রিয় বিলুমামাকে শোয়ায় দিয়ে আসছে বড়মামা।
সে এখন নানুর কবরে শুয়ে আছে,তার ব্যথাটা নিশ্চই এখন আর তাকে ডিসটার্ব করছেনা তাইনা?আর কখনও বমি হবে না নিশ্চই,শ্বাসকষ্টটাও পালিয়েছে এতক্ষনে।শেষেরদিকে রাতের বেলা
বড়াম্মা(বড় খালা)মাথায় হাত না বুলালে নাকি ঘুম আসতোনা তার এখন আর সেটার দরকার হবেনা,মাইমনিকে ও (বড়মামী)কি রান্না করবে বিলুমামার জন্য সেটা নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না আর।

মানুষটা ঘুমাচ্ছে,শান্তির ঘুম,হুম অবশ্যই শান্তির!!! না হলে,কি প্রশান্তির হাসি ছিল তার চেহারায় যেন সে হাসতে হাসতে আমাদের বিদায় জানাচ্ছে,বলছে”রঙু, পান্ডা,আবরা,এলসি,ফিরিঙ্গি,ব্যঙ্গা, টিকটিকি,কেবলা,কেবলি আমি যাই রে তোরা ভালো থাকিস,খুব ভালো।।
আমার যে কি কষ্ট হচ্ছিল তার নিথর দেহটা দেখতে, মনে মনে চিৎকার করে অসংখ্যবার বলেছি “ভালবাসি তোমাকে অনেক, কেন চলে যেতে হলো এই অসময়ে?”বারবার গলায় দলা বেঁধে যাচ্ছিল,চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছিল, আব্বুআম্মু মারা যাবার পর সেই যে ছিল আমরা চারটা ভাইবোনের অভিভাবক,আমাদের যে আর কেউ রইল না।বিলুমামা চলে যাবার পর হলাম আমরা প্রকৃত পক্ষে এতিম।সে চলে যাবার পর দিনগুলো বড্ড অন্যরকম হয়ে গেল কিভাবে যেন আমরা সবাই বয়সের চেয়ে আরো বড় হয়ে গেলাম, দায়িত্বগুলো বেড়ে গেলে একেওপরের উপর।সে বেঁচে থাকতে জানতামইনা কতটা সহজ করে রেখেছিল আমাদের জীবনযাত্রা।কখনও মাথা ঘামাতে হয়নি বাসার কমন ফ্যাসেলিটি,ইউটিলিটি বিল কাকে দিয়ে কোথায় পাঠাতে হবে,গাড়ির ট্যাক্স, ফিটনেস,ব্যাংকের টাকা উঠানো,বাসায় কার কখন কোনটা দরকার সব কিছুর খেয়াল খবর সে রাখত।এখন আর কেউ নেই আমাদেরকে ওভাবে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যাওয়ার মতো।
আমি প্রায়ই তাকে স্বপ্ন দেখি,স্বপ্নের মধ্যেই মাঝে মাঝে ঝগড়া করি কেন সে বিয়ে করলো না?বিয়ে করলে তার জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতে পারতো।রাতের বিশাল খোলাআকাশের নীচে থেকে যখন কোন জ্বলজ্বলে তারা দেখি নিজের অজান্তেই বলে উঠি “ভালো থেকো বিলুমামা,অনেক ভালো অনেক অনেক ভালো।
ভালো যে তোমাকে থাকতেই হবে,সেটা যে তোমার পাওনা।।

©আদনীন কুয়াশা

About The Author
Adneen Kuasha
Adneen Kuasha
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment