Now Reading
ব্ল্যাক মিররের যে ভবিষ্যতবানী গূলো বাস্তবে রুপান্তরিত হয়েছে !



ব্ল্যাক মিররের যে ভবিষ্যতবানী গূলো বাস্তবে রুপান্তরিত হয়েছে !

সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে বর্ণিত ভবিষ্যত-পৃথিবীর চিত্র বাস্তবে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞানের এমন অনেক আবিষ্কারই আছে, যেগুলো আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগে প্রথমে চিত্রায়িত হয়েছিল সাহিত্যিকদের কল্পনায়। কিন্তু অধিকাংশক্ষেত্রেই এ ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবায়িত হতে সময় লেগে যায় দশকের পর দশক। অনেক সময়ই দেখা যায় মূল স্বপ্নদ্রষ্টার মৃত্যুর বহু বছর পর তার কোনো বইয়ের ভবিষ্যদ্বাণী আংশিক বাস্তবে রূপ নেয়।
এদিক থেকে ব্রিটিশ অ্যান্থলজি টিভি সিরিজ ‘ব্ল্যাক মিরর’ এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম। ব্ল্যাক মিররের প্রতিটি পর্বে মূলত নিকট ভবিষ্যতে প্রযুক্তির প্রভাবের বিভিন্ন নেতিবাচক দিকের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। নিকট ভবিষ্যতের চিত্র তুলে ধরার কারণে এর ভবিষ্যদ্বাণীগুলো বাস্তবে রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। কিন্তু তারপরেও ২০১১ সালে শুরু হওয়া এবং এখন পর্যন্ত মাত্র ২২টি পর্ব প্রচারিত হওয়া এই সিরিজটির বিভিন্ন পর্বের যতগুলো ভবিষ্যদ্বাণী এর মধ্যেই বাস্তবে রূপান্তরিত হয়েছে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

ব্ল্যাক মিররের বিভিন্ন পর্বে দেখানো অনেকগুলো ক্ষুদ্র প্রযুক্তি ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। যেমন পিৎজা হাটের অটোম্যাটিক পিৎজা ডেলিভারি ট্রাক, আইফোনের অ্যানিমোজি ফিচার, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রবোটিক মৌমাছি, এদের প্রতিটিই হয়েছে ব্ল্যাক মিররে প্রদর্শিত হওয়ার পরে। কিন্তু ব্ল্যাক মিরররের বিভিন্ন পর্বের ভেতরে দেখানো এ ধরনের ক্ষুদ্র প্রযুক্তিগত আবিষ্কারের কথা বাদ দিলেও এর এমন কয়েকটি পর্ব পাওয়া যায়, যেখানে পুরো পর্বটি আবর্তিত হয়েছে যে প্রযুক্তি বা ঘটনার উপর, সেই সময়ের প্রায় অবিশ্বাস্য সেই প্রযুক্তি বা ঘটনাও পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

চলুন দেখে নিই ব্ল্যাক মিররের এ ধরনের পাঁচটি ভবিষ্যদ্বাণী, যা ইতোমধ্যেই বাস্তবে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

এন্টায়ার হিস্ট্রি অব ইউ : স্যামসাংয়ের স্মার্ট লেন্স
ব্ল্যাক মিররের প্রথম সিজনে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল এর তৃতীয় এপিসোডটি। দ্য এন্টায়ার হিস্ট্রি অব ইউ শিরোনামের ঐ এপিসোডে নিকট ভবিষ্যতের একটি চিত্র আঁকা হয়, যেখানে সবার মস্তিষ্কে একটি করে মেমোরি ইমপ্ল্যান্ট বসানো থাকে। ঐ মেমোরি ইমপ্ল্যান্টটি সারা দিনে মানুষের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি মুহূর্তের ভিডিও রেকর্ড করে রাখতে পারে। পরে যেকোনো সময় চোখের লেন্সের মধ্য দিয়ে কিংবা টিভির স্ক্রিনে প্রজেকশনের মাধ্যমে যেকোনো ঘটনা প্লে-ব্যাক করা যায়।

২০১১ সালে এটি ছিল সত্যিকার অর্থেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী। কিন্তু ২০১৪ সালে স্যামসাং ঠিক এরকমই একটি প্রযুক্তির প্যাটেন্ট করে। প্যাটেন্টের বিবরণ অনুযায়ী তারা এমন একধরনের স্মার্ট লেন্স নির্মাণ করবে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারী চোখের ইশারায় তার সামনের দৃশ্যের ছবি তুলে ফেলতে পারবে। এই ছবি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীর মোবাইল ফোনে গিয়ে জমা হবে এবং সেখান থেকে যে কেউ সরাসরি ব্যবহারকারীর চোখের সামনে থাকা দৃশ্য উপভোগ করতে পারবে।

শুরুটা স্যামসাং করলেও ২০১৭ সালে সনিও একটি স্মার্ট কন্টাক্ট লেন্সের প্যাটেন্টের জন্য আবেদন করে। সনির লেন্সটি হবে স্যামসাংয়ের চেয়েও ব্ল্যাক মিররের বেশি কাছাকাছি। এটি শুধুমাত্র ছবি তোলার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী তার চোখ দিয়ে যেকোনো দৃশ্য সরাসরি ভিডিও করে তা এক্সটার্নাল ড্রাইভে সংরক্ষণ করে রাখতে পারবে।

সনি এবং স্যামসাং, উভয়েরই পরিকল্পনা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জীবনকে আরো সহজ করে তোলা। কিন্তু সত্যি সত্যিই যখন এই প্রযুক্তি মানুষের হাতের নাগালে আসবে, তখন ব্ল্যাক মিররের মতোই সেটা যে পারিবারিক সম্পর্ককে আরো জটিল করে তুলবে না, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে?
বি রাইট ব্যাক : মৃত ব্যক্তিকে ফিরিয়ে আনা

ব্ল্যাক মিররের দ্বিতীয় সিজনের প্রথম এপিসোডটির শিরোনাম ছিল বি রাইট ব্যাক। এই পর্বে দেখানো হয়, মার্থা নামের এক তরুণী তার ছেলেবন্ধু অ্যাশের মৃত্যুর পর এক নতুন প্রযুক্তির শরণাপন্ন হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঐ প্রযুক্তির মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পরেও তার সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট, পুরাতন ছবি এবং ভিডিও ব্যবহার করে হুবহু তার মতো একটি ভার্চুয়াল চরিত্র সৃষ্টি করা যায়, যে ঠিক তার গলার স্বরে এবং তার স্টাইল অনুযায়ীই কথা বলে।
সে সময় অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি এখন মোটেও আর সায়েন্স ফিকশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পর্বটি প্রচারের মাত্র এক বছর পরেই এক পর্তুগিজ ডেভেলপার হেনরিক হোর্গে ইটার-নাইন (ETER9) নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া চালু করেন (eter9.com)। এই সাইটে অ্যাকাউন্ট চালু করে নিয়মিত পোস্ট দিতে থাকলে সাইটটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর পোস্টগুলো বিশ্লেষণ করে তার চরিত্র সম্পর্কে ধারণা অর্জন করে এবং পরবর্তীতে ব্যবহারকারীর মৃত্যু ঘটলেও তার পরিবর্তে তার মতো করেই বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে যেতে থাকে!
তবে ইটার-নাইনের চেয়েও ব্ল্যাক মিররের সাথে বেশি মিল আছে আরেকটি অ্যাপের, এর নাম রেপ্লিকা (replika.ai)। বি রাইট ব্যাক পর্ব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বন্ধু রোমানের মৃত্যুর পর তার সাথে চ্যাট করার উদ্দেশ্যে অ্যাপটি তৈরি করেছিলেন ইউজিন কুইদা। বর্তমানে যে কেউ অ্যাপটি ব্যবহার করে একটি চ্যাটবটের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করলেই বটটি তার কথাবার্তার ধরন আয়ত্ত করে ফেলতে পারে এবং সে অনুযায়ী তার সাথে কথাবার্তা চালিয়ে যায়। শুধু তা-ই নয়, প্রয়োজনে এটি ব্যবহারকারীকে ভয়েস কলও করতে পারে।
ব্ল্যাক মিররের বি রাইট ব্যাক পর্বটি অবশ্য চ্যাট এবং ভয়েস কলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে প্রযুক্তি এত বেশি উন্নতি লাভ করেছিল যে, অ্যাশের মৃত্যুর পর হুবহু তার মতো দেখতে একটি কৃত্রিম শরীরের সাথে অ্যাপটির সমন্বয় সাধন করে তাকে প্রায় হুবহু জীবন্ত মানুষের মতো আকৃতি এবং সচেতনতা দেবার চেষ্টা করা হয়েছিল। এই অংশটুকু অবশ্য এখনও ফিকশনই রয়ে গেছে। কিন্তু হুমাই নামের একটি প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিয়েছে, তারা আগামী ৩০ বছরের মধ্যে ঠিক এভাবেই মৃত মানুষকে পুনরুত্থানের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

ব্ল্যাক মিরর একটি নেটফ্লিক্স প্রযোজিত সায়েন্স- ফিকশন সিরিজ

About The Author
Raihan Yasir
Raihan Yasir
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment