Now Reading
সাদা মনের মানুষ



সাদা মনের মানুষ

আমাদের আশেপাশে অনেক মানুষ বসবাস করে, যারা নিজের স্বার্থ ছাড়াই সমাজের জন্য, দেশের জন্য অনেক ভালো কাজ করে যাচ্ছে। যাদেরকে সাদা মনের মানুষ বলা যেতে পারে। এই সকল সাদা মনের মানুষরা নিজের সবটুকু দিয়ে তাদের আশেপাশের মানুষের জীবন আলোকিত করতে কাজ করে যায়। এই সকল সাদা মনের মানুষরা কখনও নিজের কথা ভাবে না। তাদের উদ্দেশ্য থাকে অন্যের জীবন আলোকিত করা। এই সকল সাদা মনের মানুষ অনেক সময় মূল্যায়ন পায়, আর বেশির ভাগ সময় পায় না। কিন্তু আমাদের সমাজে এই রকম যে সকল সাদা মনের মানুষ আছে তাদেরকে সমাজের পক্ষ থেকে এবং দেশের পক্ষ থেকে মূল্যায়ন করা উচিত। আজকে এই রকম একজন সাদা মনের মানুষের কথা বলব। যিনি তার শিক্ষকতা দিয়ে তার সমাজের অনেক মানুষের জীবন আলোকিত করেছেন।

আমাদের দেশে এখন শিক্ষার হার অনেকটাই বেড়েছে। কিন্তু তারপরও শহরে আমরা অনেক পথ শিশু দেখি যারা কর্ম জীবনে পা দিয়ে দিয়েছে। এই শিশুদের বেশির ভাগের পরিবারের পক্ষে তাদের শিশুদের পড়ালেখা করানোর মত অর্থ নাই। তাই শিশুগুলো কর্ম জীবনে পা দিয়েছে। আর অনেক ছেলেমেয়ে আছে যাদেরতো মা বাবাই নেই। আর গ্রামের অবস্থা অনেক বেশি খারাপ। গ্রামে দারিদ্রতার হার বেশি, তাই শিক্ষার আলো সবার কাছে পৌঁছাইতে পারে না।

কিন্তু আব্দুল মালেক হাওলাদার নামে একজন ব্যক্তি সমাজে ঝরে পড়া শিশুদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কাজ করে গেছেন। আব্দুল মালেক হাওলাদারের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে। দুধখালী ইউনিয়নের মিঠাপুর বাজারে ১৯৪৩ সালে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুল মালেক। পরবর্তীতে স্কুলটি ‘আব্দুল মালেক হাওলাদারের পাঠশালা’ নামে এলাকাজুড়ে খ্যাতি লাভ করে। তিনি দীর্ঘ ৬৭ বছর ধরে মানুষ গড়ার কাজ করে যাচ্ছেন।

আব্দুল মালেক হাওলাদারের প্রতিটি দিন শুরু হয় মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত নিয়ে। আব্দুল মালেক হাওলাদারের জীবনের সকল ধ্যান ও জ্ঞান হচ্ছে, তার নিজের হাতে তৈরি একমাত্র পাঠশালা। আর এই পাঠশালা নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন তার জীবনের বেশির ভাগ সময়। দুধখালী ইউনিয়নের মিঠাপুর বাজারে আব্দুল মালেক হাওলাদারের পাঠশালা দেখতে খুব একটা ভালো না। কিন্তু এই পাঠশালার মাধ্যমেই দিনের পর দিন অসংখ্য মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন আব্দুল মালেক হাওলাদার। তিনি তার পাঠশালার ছেলেমেয়েদের পাঠ্য বইয়ের শিক্ষার পাশাপাশি দিতেন ভালো ও সত্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা। তিনি তার সমাজের অনেক ছেলেমেয়েকে অন্ধকারের পথ থেকে তুলে এনে, তার পাঠশালায় তাদের দিয়েছেন আলোর শিক্ষা। আব্দুল মালেক হাওলাদারের পাঠশালার শিক্ষায় আলোকিত হয়ে আজ অনেকই সমাজে, দেশে সু প্রতিষ্ঠিত। অনেকই হয়েছেন ডাক্তার, ব্যাংকার, শিক্ষক ইত্যাদি। আব্দুল মালেক হাওলাদার একাই তার পাঠশালায় শিক্ষা প্রদান করতেন। আব্দুল মালেক হাওলাদার তার পাঠশালায় পড়াশুনার পাশাপাশি নাচ, গান, কৌতুক, বিভিন্ন বিষয়ে ট্রেনিং দিতেন। আব্দুল মালেক হাওলাদার তার প্রতিটি ছাত্রকে দিতে চান জীবনের পাঠ। তিনি এক ১৬ বছরের নিরক্ষর ছেলেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছর তার পাঠশালায় পড়াশুনা করিয়ে মাধ্যমিক পাশ করান। ছেলেটির নাম হচ্ছে মোঃ শহিদুল ইসলাম। তিনি এখন তার এলাকাতেই একটি বিদ্যালয়ে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে চাকুরী করেন। এই রকম অসংখ্য ছেলেমেয়েকে তিনি তার বিদ্যালয়ে এনে, শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে জীবনের আলো দেখিয়েছেন।

আব্দুল মালেক হাওলাদারের পাঠশালায় নিধারিত কোন বেতনের নিয়ম ছিল না। ছেলেমেয়েরা যে যা পারত তাই তাকে দিত। আর বেশির ভাগ ছেলেমেয়েই টাকা দিতে পারত না। কিন্তু তিনি কখন কোন ছেলেমেয়েকে এই বিষয়ে কিছু বলতেন না। কারন তার মূল উদ্দেশ্যই ছিল শিক্ষার আলোয় মানুষের জীবনকে আলোকিত করা। মহান এ মানুষটির কাছে তার মহৎ কর্ম ও জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি শীর্ষ নিউজ ডটকমকে বলেন, প্রাপ্তির জন্য তিনি কোনো কিছু করেননি। তিনি মনে করেন এটা তার মানসিক তৃপ্তি ও নৈতিক দায়িত্ব। ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের একটি সামাজিক ও দেশপ্রেমমূলক কার্যক্রম দেশব্যাপী ‘সাদা মনের মানুষ’ নির্বাচন ২০০৬ সালে ১০ জনের মধ্যে তাকে নির্বাচিত করেছিলেন সাদা মনের মানুষ হিসেবে। ইউনিলিভারের পক্ষ থেকে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন ১ লাখ টাকা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আ. মালেক হাওলাদারের পাঠশালার সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি তার নিজ জেলাতেই কোনো সংবর্ধনা পাননি। এমন কি নিঃস্বার্থ এ মানুষটির খবরও কেউ রাখেন না।

About The Author
MD BILLAL HOSSAIN
MD BILLAL HOSSAIN
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment