Now Reading
পথ শিশু



পথ শিশু

প্রতিটি মা বাবা তার ছেলেমেয়েদের স্নেহ মমতা দিয়ে আস্তে আস্তে বড় করে তোলে। নিজে না খেয়ে হলেও সন্তানদের খাওয়। সন্তানদের শখ পূরনে নিজেদের সাধ্য মত চেষ্টা করে। সন্তানের আনন্দই হয়ে যায় তাদের আনন্দ। নিজের সন্তান কষ্ট করুক কোন মা বাবাই চায় না। মা বাব চায় তার সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করেতে। প্রতিটি মা বাবাই চায় তাদের সন্তানদের সকল ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে। পড়াশুনা শিখিয়ে তাদের জীবন গড়ে দিতে চায়। মা বাবা নিজেরা যতই দুঃখ কষ্টে থাকুক না কেন কিন্তু সব সময় তারা তাদের সন্তানদের মঙ্গল কামনা করে।

আমাদের যাদের মা বাবা আছে আমরা কত সৌভাগ্যবান। আমাদের কত যত্ন সহকারে আমাদের মা বাবা আমাদের লালন পালন করেছেন।
কিন্তু যাদের মা বাবা নেই, সেই সন্তানদের কি হয়? যারা এতিম তাদের কি হয়?
রাস্তা ঘাটে আমরা অনেক পথ শিশু দেখি যাদের বেশির ভাগেরই মা বাবা নেই। তাদের কত কষ্টের জীবন। কখন সকালে খেলে দুপুরে খেতে পায় না আবার কখন দুপুরে খেলে রাতে খেতে পারে না। রাতে রাস্তা ঘাট যেখানে সেখানে ঘুমায়। এক জামা কাপড়ে তাদের মাসের পর মাস চলে যায়। তারা ভুগে পুষ্টি হীনতায়। বলতে খুব খারপ লাগতেছে, এতিম শিশুদের অনেকেই মানুষ হয়েও পশু পাখির মত জীবন যাপন করে।

আমাদের দেশে কিছু সরকারি এবং বেসরকারি এতিমখানা আছে। কিন্তু তাও পর্যাপ্ত নয়। আর আমরা সাধারণ মানুষতো নিজেদের নিয়েই ভাবি। কিন্তু একজন ব্যক্তি এই এতিম শিশুদের জন্য নিজের সব কিছু উজার করে দিয়েছেন।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গরগড়ি ইউনিয়নের সড়ের হাঁট গ্রামে একটি শিশু সদন রয়েছে। যেখানে রয়েছে ১২০ টি অনাথ শিশুর একটি পরিবার। যাদের পরম স্নেহে লালন পালন করছেন ডাক্তার শামসুদ্দিন সরকার ও তার স্ত্রী মেহুরন নেসা।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা। মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের অনেক শিশু মা বাবা পরিবার হারিয়ে এতিম হয়ে যায়। আর এই দিকে শামসুদ্দিন সরকার যুদ্ধ শেষ করে যখন ফিরে এসে এই শিশুদের দেখেন তখন তার মন কষ্টে কেঁদে উঠে। স্বাধীন এই দেশে এই শিশুদের নেই কোন অভিবাবক, নেই কোন পরিবার। তখন না খেয়ে পড়ে বেড়ে উঠছিল এই শিশুরা। তখন থেকেই এই অনাথ শিশুদের জন্য কিছু করার প্রয়োজন বোধ করলেন শামসুদ্দিন সরকার। গ্রামের মানুষ তাকে সমেস ডাক্তার নামেও চিনে। এই অনাথ শিশুদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন এই সমেস ডাক্তার। আর এই স্বপ্ন রুপ নিতে শুরু করলো ১৯৮৪ সালে। স্বাধীনতার ১৩ বছর পরে। স্ত্রী মেহুরুন নেসার মোহরানার স্বর্ণ দিয়ে বাঘা উপজেলার সরের হাঁট গ্রামে কিনলেন ১২ শতাংশ জমি। আর তিনি গড়ে তুলেন সরের হাঁট কল্যাণ শিশু সনদ। যেখানে তিনি অসংখ্য অনাথ এতিম শিশুর দায়িত্ব নেন। আর এই ভাবেই টানা ১০ বছর এই শিশুদের দেখাশোনা করেন, কোন সরকারি বেসরকারি সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া। আর এই এতিম অনাথ শিশুদের দেখভার করতে গিয়ে একে একে বিক্রি করেন তার নিজের ১৭ বিঘা জমি। অনেক কষ্টে থাকা সত্ত্বেও শিশুদের মুখের দিকে চেয়ে বন্ধ করেত পারেন নি এই শিশু সনদ।

এক সময় অনিশ্চিত হয়ে পরে এই শিশুদের খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা। এই অবস্থায় সমেস ডাক্তার বিক্রি করে দেন তার শেষ সম্বল টুকু, মাথা গোজার ঠাই ঘরবাড়ী। তারপর তিনিও এসে উঠেন এতিমদের মতই কল্যাণ শিশু সনদে। এই ভাবে তিনি আশ্রয় হীন শিশুদের আশ্রয় দিতে গিয়ে নিজেরাই হয়ে পরেন আশ্রয় হীন।

সমেস ডাক্তারের স্ত্রীও এই শিশুদের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সমেস ডাক্তারের স্ত্রীর সকাল হত চুলায় উনুন জ্বেলে। শিশুরা ঘুম থেকে উঠার আগেই তিনি সবার সকালের খাবার তৈরি করে ফেলতেন। তিনিও তার স্বামীর মত এই অনাথ শিশুদের খুব ভালবাসতেন।

এই এতিম খানায় ৫৮ জনের জন্য খাবার তৈরি করা হত আর বাকি ৪৯ জনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন গ্রামের কিছু সহৃদয় বান ব্যক্তি। আর ১৩ জনের খরচ আসে সরকার থেকে।
এতিম খানার কাজ করার পাশাপাশি সমেস ডাক্তারের স্ত্রী সেলাই কাজ করে যেই টাকা পান এবং সমেস ডাক্তার মানুষের সেবা করে যা পান, তাদের দুইজনের সব টাকাই এই এতিমখানায় ব্যয় করতে হয়।

একটা সময় এই এতিম খানার অবস্থা খুব খারপ হয়ে যায় তখন সমেস ডাক্তারের স্ত্রী স্ত্রী মেহুরন নেসা ১ বছর বাহিরে ভিক্ষা করেন।

এই ভালো কাজ করতে গিয়েও অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন সমেস ডাক্তার, কিন্তু তিনি পিছনে ফিরে যান নি।

আমাদের সমাজে অনেক কোটি কোটি টাকার মালিক আছেন, তারা যদি আমাদের আশেপাশের পথ শিশু, এতিম শিশুদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তাহলে এই শিশুরাও সাধারণ শিশুদের মত বেড়ে উঠতে পারবে। আমাদের সকলেরই উচিত যার যতটুকু সম্ভব তা দিয়ে অন্যকে সাহায্য করা। তাহ্লেই আমাদের সমাজ দেশ সুন্দর হয়ে উঠবে।

About The Author
MD BILLAL HOSSAIN
MD BILLAL HOSSAIN
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment