Now Reading
প্রিয় সন্দ্বীপ



প্রিয় সন্দ্বীপ

হিংস্র ঢেউ আর ভয়ংকর জলরাশি। এর নাম বঙ্গোপসাগর। যার সাথে মিশে আছে লাক্ষ মানুষের জীবিকা আর জীবনের গল্প। বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে, বঙ্গোপসাগরের উত্তর পূর্ব কোণে, মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত, চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত, চারদিক পানি বেষ্টিত, গাছ গাছালিতে ভরা সবুজের সমারোহ, পাখিদের কলতান ধ্বনি, ভাঙ্গন কবলিত, প্রাকৃতিক সাজে সজ্জিত, নতুন নতুন চরে ব্যাষ্টিত এক মনোরম মনোমুগ্ধকর এবং আদি বাংলার জনপ্রিয় কবি আবদুল হাকিমের দ্বীপ মায়াময় এই সন্দ্বীপ।

ভৌগোলিক ভাবে চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলার বাসিন্দারা। ঝড় তুপান তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এ দ্বীপ। ক্ষুধার্থ সাগরের দীর্ঘ ঢেকুরে যেমন হজম হয়ে যাচ্ছে সন্দ্বীপের এক একটি অঙ্গ পতঙ্গ, তেমনি ধীরে ধীরে আড়াল থেকেও আড়াল হয়ে যাচ্ছে এই দ্বীপের গৌরব উজ্জ্বল এবং সেই সংস্কৃতির কথা, যা ছিল এ দ্বীপের অহংকার, যা থাকবে ভবিষ্যতেও, যা ভুলতে বসেছি কিংবা শিখতে ভুলে গেছি। ভুলে যাওয়াটায় স্বাভাবিক, যে ভাবে মেঘনার করাল গ্রাসে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সন্দ্বীপ। মেঘনার উত্তাল ঢেউয়ের চোবলে শুধু সন্দ্বীপের ভূমি হারায় না, হারিয়ে যায় ভূমিতে থাকা সেই মানুষ গুলোও। যার কারণে ধীরে ধীরে ইতিহাস গুলোও হারিয়ে যাচ্ছে খুব নিখুঁতভাবে।

সন্দ্বীপঃ প্রায় তিন হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দ্বীপে লোক বসতি বিদ্যমান। এমনকি এককালে এই দ্বীপের সাথে সংযুক্ত থাকা নোয়াখালীতে বসবাস শুরু হওয়ার পূর্বেই এই দ্বীপে তথাকথীত এই সন্দ্বীপে জনবসতি গড়ে উঠে। প্রাচীন বঙ্গের বৃহত্তম চন্দ্র দ্বীপের ইতিহাস খ্যাত সামুদ্রিক বন্দর নারকেল সুপারির সবুজ বনানী ঘেরা সন্দ্বীপের খ্যাতি ছিল সুদূর ইউরোপ পর্যন্ত।

হাজার বছরেরও পুরোনো এই দ্বীপ, ধীরে ধীরে নদীর হিংস্র থাবার কবলে পরে ছোট থেকেও ছোট হয়ে আসছে। বিলীন হয়ে যাচ্ছে সন্দ্বীপের অনেক অতিহ্য, হারিয়ে যাচ্ছে গৌরব উজ্জল সেই ইতিহাস, যে ইতিহাস ‍দ্বীপের মানুষকে স্বস্তির একটা শ্বাস নিতে সাহায্য করে, সাহায্য করে অনেক দিন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে। আবার কখনো কখনো জেগে উঠছে নতুন চর। নিয়তির এই খেলা অনেক পরিবারকে সন্দ্বীপ ছাড়তে বাধ্য করছে। জেগে উঠা নতুন চর গুলোর মায়া তাদেরকে আবার সন্দ্বীপের দিকে হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু জেগে উঠা চর গুলোর দর কশাকশি নিয়ে সন্দ্বীপ থেকে বিশাল একটি অংশ নিয়ে ছিনিমিলি খেলার চেষ্টায় বিভোর হয়ে আছে অনেকে। হ্যাঁ! বলছিলাম সন্দ্বীপ থেকে আলাদা হয়ে জেগে উঠা নতুন চর, বর্তমান ঠেঙ্গার চর নামে পরিচিত সেই দ্বীপের কথা। যা সন্দ্বীপের একটি অংশ, যা বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ এর কবলে পরে একটা সময় বিলীন হয়ে যাওয়া সেই ভূমি গুলোর একটি অংশ।

বিরতিহীন বয়ে চলা সাগরের সেই উত্তাল ঢেউ গুলো কখনো কখনো চন্দপতন ঘটিয়ে সাগরের বুকে জেগে উঠেছে চর কিংবা দ্বীপ। সেসব দ্বীপের মাঝে প্রান্তিক মানুষ কখনো আবার খুঁজে পেয়েছে আশার প্রদীপ। কিন্তু বাহিরের হিংস্র থাবায় সেই প্রদীপ যখন নিভু নিভু করে, তখন দ্বীপের মানুষের কলিজা উপচে ফেলার মত এক যন্ত্রনা অনুভব করে এই দ্বীপের মানুষ। শব্দহীন চিৎকার, যা কর্ণপাত করার ক্ষমতা কেউ রাখে না। কিন্তু এ দ্বীপের মায়া কোন বাধা বিপত্তিকে পরোয়া করেনা, ভয় করে না কোন হিংস্র থাবাকে। ৬০ মৌজাকে উদ্ধার করার জন্য এই দ্বীপের মানুষ দেহের সর্বোচ্ছ দিয়ে দিতে প্রস্তুত। প্রস্তুত না হওয়ার বা কি আছে? এই দ্বীপের মাটির খুশবুতে মিশে আছে মায়া, ভালবাসা, হাজার বছরের পুরোনো সেই গৌরবউজ্জল ইতিহাস, যা এই দ্বীপের মানুষকে দ্বীপ রক্ষার্থে যেকোন কিছু করতে উৎসাহ করে।

দ্বীপের নামকরণঃ এই দ্বীপের নামকরণ নিয়ে রয়েছে অনেকের অনেক মত, রয়েছে মধু মিশ্রিত কিছু রহস্যও, কেউ কেউ আবার ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন এই দ্বীপের নামকরণের তথ্যগুলো। ১২ জন আউলীয়া চট্টগ্রাম যাওয়ার সময় তাদের যাত্রা পথের একটি অংশ হিসেবে বেচে নিয়েছিল এই দ্বীপকে, ১৩ শতকে ১২ জন আউলীয়া বাগদাদ হতে মৎস পৃষ্ঠে আহোরণ করে চট্টগ্রামের উদ্যেশ্যে রওনা হওয়ার কথা করো অজনা নয়, অন্তত সন্দ্বীপের মানুষের তো অজানা থাকার প্রশ্নই উঠেনা। যাত্রাপথে নামাযের সময় হলে একটি দ্বীপ চোখে পড়ে, যেখানে কোন মানুষ ছিলেন না, জনমানুষহীন অবস্থায় আবিষ্কার করা এই দ্বীপকে ১২ জন আউলীয়ারা নাম দিয়েছিলেন শুণ্যদ্বীপ, যা পরবর্তীতে সন্দ্বীপ নামে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

আবার অনেকে বলেন দ্বীপের উর্বতা ও প্রাচুর্যের কারণে উক্ত দ্বীপকে স্বর্ণদ্বীপ বলে আক্ষায়িত করা হয়েছিল, উক্ত স্বর্ণদ্বীপ কালের পরিবর্তনে সন্দ্বীপ হয়ে উচ্চারিত হওয়া শুরু করে বলেও জানা যায়। আবার কোন এক ইতিহাস লেখকের মতে চন্দ্র দেবতা সোম এর নাম অনুসারে এ দ্বীপের নাম সোম-দ্বীপ দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সন্দ্বীপ নামে প্রাধান্য পায়। দ্বীপের নাম করণের আরো একটি মত হচ্ছে, পাশ্চাত্য ইউরোপীয় জাতিগণ বাংলাদেশে আগমনের সময় দূর থেকে এই দ্বীপটিকে দেখে বালির স্তুপ মনে করেছিলেন, যা তাদের ভাষায় স্যান্ড হীপ (Sand-Heap) নামে অভিহিত করেন এবং এই স্যান্ড-হীপ থেকে বর্তমান সন্দ্বীপ নামের উৎপত্তি হয় বলেও ধারণা করা হয়েছে।

সন্দ্বীপের আয়তনঃ ১৯১৩ সালের ম্যাপ অনুযায়ী সন্দ্বীপের সর্ব উত্তরের সীমানা ছিল নোয়াখালীর ”খসির হাট” এবং সর্ব দক্ষিণের সীমানা ছিল ”চর কচ্ছপিয়া”। ১৯১৩ সাল থেকে ১৯১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী সন্দ্বীপের উত্তর দক্ষিণে ছিল ৩৮ মাইল এবং পূর্বে পশ্চিমে ছিল ২৮ মাইল। সেই অনুযায়ী তৎকালীন সন্দ্বীপের আয়তন ছিল ১০৬৪ বর্গমাইল। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকেও সন্দ্বীপের আয়তন ২০০ বর্গমাইলের অধিক ছিল। যা বর্তমানে শুধু ৬৫ বর্গমাইলের একটি ক্ষুদ্র দ্বীপে রূপান্তরিত হয়েছে। ৬০ মৌজার এই দ্বীপে বর্তমানে অর্ধেকটি মৌজাও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। আগুনে পুরে গেলে পোরা মাটিটা অন্তত থাকে, কিন্তু নদী ভাঙ্গনে মানুষের পায়ের তলায় মাটিটাও যে থাকে না, সেই কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সন্দ্বীপের ৬০ মৌজাঃ (উত্তর দিক থেকে)
১। চরবদু, ২। চর পীরবক্স, ৩। চর লক্ষী, ৪। পাইয়াডগি, ৫। সমশেরাবাদ, ৬। কাটগড়, ৭। হুদ্রাখালী, ৮। চর হুদ্রাখালী, ৯। থাক হুদ্রাখালী, ১০। দীর্ঘা পাড়, ১১। চর দীর্ঘা পাড়, ১২। থাক দীর্ঘা পাড়, ১৩। সন্তোষপুর, ১৪। চর সন্তোষপুর, ১৫। থাক সন্তোষপুর, ১৬। আমান উল্ল্যাহ, ১৭। চেউরিয়া, ১৮। গাছুয়া, ১৯। থাক গাছুয়া, ২০। চর গাছুয়া, ২১। চর রহিম, ২২। শফিনগর, ২৩। কালাপানিয়া, ২৪। বাটাজোরা, ২৫। বাঁউয়া, ২৬। কাজীর খিল, ২৭। মুক্তারপুর, ২৮। মোহাম্মদপুর, ২৯। ইজ্জতপুর, ৩০। রুহিনী, ৩১। হরিশপুর, ৩২। দুবলাপাড়, ৩৩। বাউরিয়া, ৩৪। চর বাউরিয়া, ৩৫। কুচিয়া মোড়া, ৩৬। চর কুচিয়া মোড়া, ৩৭। থাক কুচিয়া মোড়া, ৩৮। হারামিয়া, ৩৯। কাছিয়াপাড়, ৪০। থাক কাছিয়াপাড়, ৪১। চর কাছিয়াপাড়, ৪২। মুছাপুর, ৪৩। রহমতপুর, ৪৪। আজিমপুর, ৪৫। শুধারামপুর, ৪৬। আমিরাবাদ, ৪৭। সবিতমহুরী, ৪৮। সৌরভপুর, ৪৯। মিঠাপুকুরিয়া, ৫০। নেয়ামস্তি, ৫১। সুলতানপুর, ৫২। কমলপুর, ৫৩। মাইবুদ্দিনা, ৫৪। মানদীন, ৫৫। মাইটভাংঙ্গা, ৫৬। সারিকাইত, ৫৭। সাতঘরিয়া, ৫৮। চৌকাতলি, ৫৯। মগধরা, ৬০। থাক বাউরিয়া।

দ্বীপের ইতিহাসঃ সন্দ্বীপের লবণ শিল্প, জাহাজ ণির্মাণ কারখানা ও বস্ত্র শিল্প ছিল পৃথিবী খ্যাত। সন্দ্বীপ উপমহাদেশের উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভ্রমণকারীরা এই অঞ্চলে এসে তাদের জাহাজ নোঙ্গর করতেন, সহজ বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং পরিবহন সুবিধাদি থাকায় এই অঞ্চলে ব্যবসা এবং বসতি স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করতেন। লবণ ও জাহাজ ব্যবসা, শস্য সম্পদ ইত্যাদির প্রতি আকৃ্ষ্ট হয়ে ষোড়শ শতাব্দির মধ্যভাগে পর্তুগিজরা সন্দ্বীপে উপনিবেশ স্থাপন করেন। এছাড়া ভ্রমণ ও ধর্ম প্রচারের উদ্যেশ্যে ফরাসি ও ভালোন্দাজ পরিব্রাজকরা প্রায় সন্দ্বীপে আগমন করতেন। ১৬১৫ সালে পর্তুগিজদের সাথে আরকান রাজ্যেও যুদ্ধে ২০০ জন সৈন্যসহ পর্তুগিজ সেনাপতি ইমানুয়েল মার্তুস নিহত হয় এবং পর্তুগিজরা সন্দ্বীপ ত্যাগ করলে ১৬১৬ সালে মগরাজ সন্দীপ দখল করে। এরপর সন্দ্বীপে আরকান ও মগদের প্রাধান্য থাকলেও তাদের পরাধীনতাকে অস্বীকার করে একে প্রায় অর্ধশতাব্দি শাসন করেন দেলোয়ার খাঁ। ১৬৬৬ সালে তার রাজত্বের পতন ঘটে এবং মোগল সরকারের অধীনে জমিদারি প্রথার সূচনা ঘটে। যা পরবর্তিতে ব্রিটিশ রাজত্বের অবশানের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়। রূপে মুগ্ধ হয়ে যুগে যুগে অনেক কবি সাহিত্যিক ঐতিহাসিক পর্যটক এসেছেন এখানে। ১৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে পর্যটক ইবনে বতুতা সন্দ্বীপ আসেন। ১৫৬৫ সালে ডেনিশ পর্যটক সিজার প্রেডরিক সন্দ্বীপে আসেন এবং এর বহু প্রাচীন নিদর্শনের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন। ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দের ২৮ শে জানুয়ারি মোজাফ্ফর আহম্মদের সাথে সন্দ্বীপে আসেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সন্দ্বীপে ভ্রমণের সময়কার স্মৃতির পটভূমিতেই কাজী নজরুল ইসলাম তার মধুবাল গীতিনাট্য রচনা করেন। সন্দ্বীপে বৃক্ষের ছায়াতলে বসে নজরুল তার চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের অনেকগুলো কবিতা রচনা করেন। ১৭৭৬ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি বছর সন্দ্বীপে উৎপাদিত প্রায় এক লক্ষ ত্রিম হাজার লবণ, তিনশ জাহাজে করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হত। সন্দ্বীপ এককালে কম খরচে মজবুত ও সুন্দর জাহাজ নির্মাণের জন্য পৃথিবী খ্যাত ছিল। ইউরোপের বিভিন্ন এলাকায় এই জাহাজ রপ্তানী করা হত। তুরস্কের সুলতান এই এলাকার জাহাজের প্রতি আকৃ্ষ্ট হয়ে এখান থেকে বেশ কিছু জাহাজ কিনে নেন। ভারতবর্ষের মধ্যে সন্দ্বীপ ছিল একটি সমৃদ্ধশালী বন্দর।

 

বর্তমান সন্দ্বীপঃ প্রথমত এই সন্দ্বীপ থানা নোয়াখালী জেলার অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ১৯৫৪ সালে সন্দ্বীপকে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সন্দ্বীপ থানাকে শুধুমাত্র থানায় সীমাবদ্ধ না রেখে এই দ্বীপকে তথাকথিত সন্দ্বীপ থানাকে উপজেলায় রূপান্তরিত করা হয় ১৯৮৪ সালে। ১৯৯৯ সালের সন্দ্বীপে একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এর আগে সন্দ্বীপে কোন পৌরসভা ছিল না। এই উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম গুলো এই সন্দ্বীপ থানার আওতাধীন। এই উপকূলীয় দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ৪,৫০,০০০ (চার লাক্ষ পঞ্চাশ হাজার) মানুষের বসবাস। প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি, নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি, মূল ভূ-খন্ড থেকে আলাদা এই সন্দ্বীপ চ্যানেলটি ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট বিস্ময়!!

সন্দ্বীপ টাউন, টিএন্ডটি ভবন, আবহাওয়া অফিস, ফুলবিবি সাহেবানি মসজিদের মত অনেক মূল্যবান এবং ঐতিহাসিক অনেক কিছু হারালেও গর্ব করার মত অনেক কিছু রয়ে গেছে কিংবা তৈরি হয়েছে এবং আরো অনেক কিছু হবে ইনশা’আল্লাহ্ এ দ্বীপে। ৬০ মৌজার এই দ্বীপে বর্তমানে ৩৫ টি গ্রাম, ৩৯টি মৌজা, ১৫টি ইউনিয়ন, ১ টি পৌরসভা, ১টি সরকারি এতিমখানা সহ মোট ১০ টি এতিমখানা রয়েছে। এ দ্বীপে ১৫৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সহ মোট ২৮ টি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। রয়েছে ১টি সরকারি কলেজ সহ মোট ৫টি কলেজ এবং একটি মহিলা কলেজ, ২১টি কেজি স্কুল, ২৯ টি মাদ্রাসা, অগণিত অসংখ্য মসজিদ এবং মন্দির সহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান বর্তমান এ দ্বীপে। আপনার হইতো জানা নেই এ দ্বীপের শিক্ষার হার ৭২% শতাংশ। ৩৪ টি হাট-বাজার সহ এ দ্বীপে রয়েছে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং একাধিক মেডিকেল সেন্টার। দ্বীপের হারামিয়া ইউনিয়নের মালেক মুন্সি বাজারের পাশে আরো একটি বেসরকারি হাসপাতালের কাজ চলছে। সব ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষের দিকে কার্যক্রম এবং চিকিৎসা সেবা শুরু হতে পারে ”স্বর্ণদ্বীপ ফাউন্ডেশন হাসপাতালে”।

এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এই দ্বীপে অবস্থিত থাকলেও, ২০১৮ সালের শেষের দিকে সীতাকুন্ড উপকূল থেকে সমুদ্র তলদেশে ১৫ কিলোমিটার ক্যাবেলের মাধ্যমে, উপমহাদেশে প্রথম বারের মত সাবমেরিন ক্যাবলে বিদ্যুৎ সংযোগে সফল যাত্রা হলে, দ্বীপের মানুষ কারেন্টের আলোর শিখা প্রজ্জলন করেন। সন্দ্বীপে চার পাশে ব্লগ বসানোর কাজ চলতেছে, এতে করে মেঘনার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পেতে পারে সন্দ্বীপ। দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে সন্দ্বীপ উপজেলা হতে পারে একটি উত্তম স্থান। কারণ এখানে বিশাল বিশাল কিছু চর হয়েছে, যেখানে কোন চাষাবাদ হয় না। কাজেই এই চর গুলো অথনৈতিক দিক দিয়ে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে।

অহংকারঃ হিংস্র ঢেউয়ের কবলে হারিয়ে যেতে যেতেও শেষ হবে না সন্দ্বীপের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, গৌরবময় ইতিহাস গুলো। দ্বীপের প্রতিটা মাটির টুকরোতে মিশে আছে ইতিহাস, থাকবে ভবিষ্যতেও। গর্ববোধ করার মত একটি দ্বীপের নাম সন্দ্বীপ। নানান প্রতিকূলতার মাঝে আমরা আমাদের সর্বোচ্ছ স্থান তৈরি করে, চলেছি বিশ্ব জুড়ে। বঙ্গোপসাগরের ভয়ংকর ঢেউ গুলো অনেক সন্দ্বীপ বাসিদেরকে বিতরিত হতে বাধ্য করছে। বর্তমানে বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই, যেখানে সন্দ্বীপের লোক নেই, এবং তারা সু-প্রতিষ্ঠিত, শিক্ষায়, সেবায়, রাজনীতি অর্থনীতি, সমাজনীতি কোন দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই এই দ্বীপের মানুষ। বরং অন্যান্য এলাকার তুলোনায় এই দ্বীপের মানুষের সুনাম ছড়িয়ে আছে যেখানে সেখানে।

নিউইয়র্ক সিটির ‘ব্রুকলিনে’ এত বেশি সন্দ্বীপী বসবাস করে যে, একে দ্বিতীয় সন্দ্বীপও বলা হয়ে থাকে। রক্তের সাথে মিশে আছে এই দ্বীপের মায়া, ভালবাসা। আপনি জানেন কি? বৈদাশিক মূদ্রা অর্জনের জন্য এই দ্বীপের আলাদা খ্যাতিও রয়েছে। বাংলাদেশের মোট বৈদাশিক মূদ্রা আয়ের প্রায় সাড়ে ১১ শতাংশ যোগান দিচ্ছেন এই দ্বীপের মানুষ এবং উপজেলা ভিত্তিক সন্দ্বীপ প্রথম। বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ২৫-৩০ জন শিক্ষক শিক্ষকতা করছেন, সেই সাথে অগণিত ছাত্র-ছাত্রী তো আছেই। এরা এই সন্দ্বীপেরই কৃতি সন্তান। শত শত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক, আমলা, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিল্পপতি, ব্যাংকারের জন্ম দিয়েছে এই সদ্বীপ। অতিথি পরায়ণের দিক দিয়ে এ দ্বীপের রয়েছে আলাদা সুনাম। এমনও নজির আছে, অচেনা পথিক খাবার পানি চাইলে, ডাবের পানি দিয়ে তৃষ্ণা মিটিয়েছেন এই দ্বীপের মানুষ। এ দ্বীপের মানুষের উদার মনের বিশালতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। ইউনিট ২৮ টাকা করে ব্যবহার করতে এই দ্বীপের মানুষের কলিজা একটুও কাঁপে না। সন্দ্বীপ শিবের হাটের বিনয় সাহা’র মিষ্টির সুনাম বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে আছে। নানা জাতের পাখি, নারকেল গাছ, সুপারি গাছ আর মৌসুমি ফলের গাছে ভরা বাগান, পুকুর ভর্তি মাছ, প্রতিদিন সাগরের তাজা মাছ, শীতকালে রসের সমাহার এসব এই দ্বীপের অহংকার। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এখান থেকে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফার প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন। ১৯৭১ সালে এ উপজেলা ১নং সেক্টরের অধীনে ছিল। সবমিলিয়ে এই দ্বীপ আমার অহংকার, এ দ্বীপ আমার মাতৃভূমি।

About The Author
Md Meheraj
Md Meheraj
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment