Now Reading
প্যারাডক্স



প্যারাডক্স

মা-বাবা,দাদী,আমি আর আমার ভাই,এই পাঁচ জন সদস্যের সংসার আমাদের।আমরা ভাড়া বাসায় থাকি।আমি রুবামা।বয়স তখন বার।আমার ভাই জিব্রান,ওর বয়স নয়।

বাবা কিছুদিন হল কেমন যেন খারাপ আচরণ করে মার সাথে।আমি বুঝি বাবার পরিবর্তন।

এক বিকেলে মা আর দাদী মিলে বিকেলের জন্য নাস্তা বানাচ্ছেন। এমন সময় দরজায় ঠকঠক শব্দ।এই সময় বাসায় কেউ আসার কথা না।কারন বাবা অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে রাত নয়টা- দশটা বেজে যায়। দাদী দরজা খুলতে গেলেন। দরজা খুলে দেখেন বাবা দাড়িয়ে আছে।কিন্তু একা না। সাথে ঘোমটা মাথায় এক মহিলা।

বাবা দাদীকে বল্লেন,”মা তোমার বৌমা।আমি আবার বিয়ে করেছি। ওর নাম রিমঝিম। রিমঝিম যাও,মাকে সালাম কর”।

দাদীর কিছু বলার শক্তি ছিল না। ঐদিন কি জঘন্য বিকেলকে আমরা সরাসরি দেখেছি,শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানেন।

মা সারারাত কেঁদেছেন। সকালে মা বললেন,” রুবামা,তোমার ছোট চাচা আর তোমার মামাকে ফোন করে বাসায় আসতে বল। আমি তাই করলাম। পুরো বাড়ির পরিস্থিতি আমার কলিজায় বারবার সুঁইয়ের মত বিঁধছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় ছোট চাচা আর মামা আসলেন। নানীও এসেছেন মামার সাথে। বাবা ওনাদের সামনে আসতে চাইছিলেন না। অন্য ঘরে তার নতুন বউকে নিয়ে চোরের মত বসেছিলেন।

বাসায় যারা এলো সব শুনল। নানি গুংরে গুংরে কাদছিলেন।কারন নানি জানেন ,মেয়েকে সাহায্য করা বা মেয়েকে নিজের কাছে রাখার মত আর্থিক অবস্থা তার নেই। চাচা কিছুই না বলে দাঁত কড়মড় করতে করতে বাবার ঘরে গিয়ে বাবার কলার ধরে মেঝেতে ফেলে মুখ বরাবর ঘুসি মারতে মারতে রক্তাক্ত করে ফেললেন। সবাই চাচাকে আটকাল। বাবার বউ রিমঝিম গলা উঁচিয়ে বলে,”এরা তোমার আত্মীয়? আমি থাকব না এই খুনিদের সাথে।“আমার মনে হচ্ছিল ডাইনীটার চুল ছিড়ে ফেলি।বউয়ের সাপোর্ট পেয়ে বাবা তো গলার জোর বারিয়ে দিলো। চাচাকে বলে,”তুই কে রে আমার বিষয়ে কথা বলার?আমি কয়টা বিয়ে করবো, সেটা আমার ইচ্ছা।এতদিন লুকিয়ে চলতাম, এখন থেকে আর লুকিয়ে থাকব না।“

এভাবেই চলতে থাকল কিছুদিন।বাবা আমাদের দুই ভাই-বোনের সাথেও কথা কমিয়ে দিয়েছেন। ওনাকে বাবা বলতে আমার ঘৃণা বোধ হয়। বাসায় এত ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও আমি জিব্রানের তেমন কোন পরিবর্তন দেখি না। মেয়েরা একটু তাড়াতাড়ি বোধসম্পন্ন হয়। আর ছেলেরা একটু দেড়িতে। তাই হয়তো আমি যতটা যন্ত্রণা অনুভব করি, জিব্রান ততটা নয়। বাবার নতুন বিয়ের এর মাঝে দুই সপ্তাহ কেটে গেছে। বাসার তো বিরাট পরিবর্তন এসে গেছে। একই বাড়িতে একজন পুরুষের দুই স্ত্রী বসবাস করে। যা মোটেও শোভনীয় নয়। মা আর রিমঝিম(বাবার নতুন স্ত্রী) কেউ কারো সাথে কথা বলেনা। রিমঝিম ধীরে ধীরে তার রূপ প্রকাশ করতে শুরু করে। অবশ্য বাবাকে বিয়ে করেই তিনি তার চরিত্র এবং আচরণের প্যাকেট উন্মোচন করেছেন। সে নিজের এবং বাবার জন্য আলাদা রান্না করে।মাকে উদ্দেশ্য করে খোঁচাত্বক কথা বলে। মা তো বোবা হয়ে গেছে।কিছুই বলে না। বাবা আমাদের খরচের টাকার পরিমাণ কমিয়ে দিলেন।

একদিন মা সহ্য করতে না পেরে ঐ মহিলাকে(রিমঝিমকে) গিয়ে বল্লেন,”কিরে, পৃথিবীতে কি পুরুষের ঘাটতি ছিল রে?বিয়ের জন্য আমার জামাইকেই পেয়েছিস ? বলেই মা ঐ মহিলার ওপর ঝাঁপিয়ে পরলেন।শুরু হল দুইজনার মারামারি। আমি আর দাদী গিয়ে থামালাম সব। বাবা আসতে না আসতেই বাবার সেই মায়াবিনী বাবাকে সব জানাল।বাবা রাগে মাকে চড় মারল। আমি আর সহ্য করতে পারিনি। চিৎকার করে বললাম ,”তুমি একটা কুকুর। রাস্তায় কুকুর দেখলেও আমার এততা ঘৃণা হয়না, যতটা তোমাকে দেখে হচ্ছে।“ বাবা সুযোগ পেয়ে গেল।আমাকে মনভরে থাপ্পর দিলেন।বললেন ,”তোর খরচ আমি আর দেবনা।“

এসব বিষয়ে আমার দাদী নির্বাক ছিলেন।ছেলেকে বোঝাবার চেষ্টা উনি বহুবার করেছেন।কিন্তু দাদীকে অপমান হতে হয়েছে বারবার।বাবা এমন আচরণ করতেন যেন তিনি কোন স্বর্গের দেবীকে হাতে পেয়েছেন। যার নাম রিমঝিম। স্বর্গের সেই দেবীর সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলা এবং শোনা যেন পাপ।

বাবা যখন থেকে আলাদা থাকে তখন থেকে খুব সামান্য পরিমাণ সংসার খরচ দিতেন। অভাবের অভিশাপ কতটা জঘন্য তা আমরা প্রতিটা সেকেন্ডে যেন উপলদ্ধি করতে থাকি।

এভাবে পাঁচ মাস কেটে গেল। দাদী মারা গেলেন। দাদী মারা যাবার পর থেকে ছোট চাচা আমার লেখাপড়ার জন্য কিছু টাকা প্রতি মাসে দেয়া শুরু করলেন।আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম।তাই আমার লেখাপড়া বাবদ খরচ একটু বেশি হত।জিব্রান চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তো। ওকে আমি নিজেই পড়াতাম।

এভাবে দিন পার হতে থাকে। আমি যখন দশম শ্রেণীতে পড়ি তখন এক্সট্রা শিক্ষক প্রয়োজন ছিল।এস এস সি পরিক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য। মা বুঝলেও নিরুপায় ছিল।কারন বাবা এক্সট্রা টাকা দিতে রাজি না।এর মাঝে বাবার ঐ সংসারে একটি মেয়েও হয়েছে।

একদিন দুপুরে মা অনেক বাজার করে বাসায় এলেন।আমার খুব অবাক লাগছিলো। কারন বাবার ঐ ঘটনার পর থেকে আমাদের জীবন ফ্যাঁকাসে হয়ে গেছে।ভাল বাজার হয়না বললেই চলে।

মা বাসায় এসে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন ,”রুবামা, তুমি তো বলেছিলে তোমার টিচার দরকার।ভাল একজন টিচারের কাছে পড়া শুরু করে দাও,আর জিব্রান কেও একটা কোচিং সেন্টারে ভর্তি করে দাও।ভাল ভাবে লেখাপড়া শুরু কর তোমরা।“

আমি বললাম ,’মা, টাকা জোগাড় হবে কিভাবে?’” মা বল্লেন,”আমি কিছু ছোট ছোট বাচ্চাকে পড়াবো। আজ বাচ্চাগুলোর বাবা-মার সাথে আমার কথা হয়েছে।“

সত্যি বলতে বিষয়টা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি।আজকাল টিউশন পাওয়া এতো সহজ না। বাবা-মায়েরা শিক্ষকের educational background ভাল না হলে তাকে বাছাই পর্বেই বাতিল করেন। আর মা তো ম্যাট্রিক পরিক্ষাও দিতে পারেননি, বিয়ে হয়ে যাবার কারনে।যাই হোক, আমি বিষয়টা আর ঘাঁটালাম না।

মার কথা মত আমি টিচারের কাছে পড়া শুরু করলাম আর জিব্রানকেও কোচিং সেন্টারে ভর্তি করলাম।

আরও কিছু দিন এভাবে কেটে গেল। আমার এস এস সি পরীক্ষা শেষ হল। তখন রেজাল্ট দেয়নি। মা প্রতিদিন বাচ্চা পড়াবার কথা বলে বাইরে বের হন।ফেরেন রাত দশটা- এগারটার সময়। কোন অভাব নেই,ভাল চলছি আমরা।

একদিন বিকালে জিব্রান ক্রিকেট খেলতে বের হল। বাসার সামনের একটা চায়ের দোকান আছে। চাওয়ালা জিব্রানকে ডেকে বলে,”বাবু, তোর মা কই?”বলেই খিকখিক করে টিটকারির হাঁসি হাসছেন। ওনার হাঁসি দেখে জিব্রান মেজাজটা ঠিক রাখতে পারেনি।

জিব্রান একটু উচ্চস্বরেই বলে,” ঐ মিয়া, হাসেন কেন? চা-ওয়ালা মাথা নিচু করে চা বানাচ্ছে আর হেঁসেই যাচ্ছে।

এইবার জিব্রান তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল,”আমারে দেখতে কি মদন মনে হয়? হাসেন কেন?

চা-ওয়ালা এবার হাঁসি বন্ধ করে জিব্রানকে বলে,”কাশেম মিয়াঁর বাড়িত গিয়া দেখ, তোর মায়ে কি পড়াইতে যায়। “জিব্রান স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তখন।কাশেম ,এলাকার একজন সম্পদশালী লোক। কিন্তু তার চরিত্রের বেহাল দশা।পর পর দুইটা বউ চলে গেছে ওনার নোংরামি সহ্য করতে না পেরে।মা ওখানে কেন?

জিব্রান প্রায় দৌড়েই কাশেমের বাড়ি গিয়ে জোরে জোরে দরজায় করা নাড়তে থাকে।কাশেম দরজা খোলে। জিব্রানকে দেখে কাশেম অপ্রস্তুত হয়ে যায়।

জিব্রান কাশেমকে বলে,” চাচা ,আমার মা নাকি আপনার বাসায়?”

কাশেম মিয়া তো উত্তর দিতে পারেনি। উত্তর জিব্রান পেয়ে গেছে দরজার কাছে তার মায়ের স্যান্ডেল জোড়া দেখে।কিছু না বলে কাঁদতে কাঁদতে জিব্রান বাসায় ফিরেছিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কেঁদেছে আমার ভাইটা। আমি সব শুনে কিছুই বলতে পারিনি।পাথর হয়ে গেছিলাম।

জিব্রান ফেরার দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর মা ফিরলেন।মাথা নিচু করে, কতটা লজ্জায় তা আমি অনুভব করতে পারছিলাম।আমি কাউকেই সান্ত্বনা বা সহানুভূতি দেখাতে পারিনি।জিব্রানের ঘরের দরজা বন্ধ।মা বারান্দায় চেয়ারে বসে আছেন।মা কাদেনি। চাঁপা কষ্টে যেন মা ভেঙ্গেচুরে যাচ্ছে। আমি জানি না,জিব্রান মাকে খারাপ ভাবছে কিনা বা কতটা ঘৃণা করছে। আমার দৃষ্টিতে মায়ের কোন দোষ ছিলনা।মা নিরুপায় ছিলেন।আমার এই বিচার বুদ্ধি হয়তো সাধারণ সমাজে নীতিবিরুদ্ধ,কিন্তু আমি জানি আমি ঠিক। মা আমাদের জন্য নিজের সত্ত্বাটাকে হত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

রাতে আমরা কেউ খাইনি।জিব্রান ঘর থেকে বের হয়নি।আর মা বারান্দাতেই বসে ছিলেন।রাত প্রায় তিনটার সময় আমার ঘুম ভাঙে জিব্রান আর মায়ের করুন কান্নার শব্দে। দৌড়ে বারান্দায় গেলাম।দেখি জিব্রান মার পা জড়িয়ে আছে আর মা ওকে জাপটে ধরে কাদছে।আমি সত্যি বলতে কখনই ভাবিনি জিব্রান জঘন্য সত্য এই বাস্তবতাকে এই কিশোর বয়সে পরিপক্ব মানসিকতা দিয়ে বুঝতে পারবে। ও কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলছে,” মা তোমার কোন দোষ নাই।আমি বাবাকে কেটে ফেলবো। ঐ লোকটা আজ আমাদের এখানে নামাল ,মা”

জিব্রানকে শান্ত করে ওর ঘরে পাথালাম।মাকেও ঘরে নিয়ে আসলাম ঘুমাবার জন্য। সকালে উঠে মাকে আর বাসায় পাইনি। আত্মীয়স্বজন কারো বাড়িতে খোঁজ নিতে বাকি রাখিনি আমরা। বাড়িতে বাবা, চাচা আর মামা এলেন।আমি সবই ওদের সামনে বলে দিয়েছি।আমার ধারনা ছিল ওরা আমার মাকে হয়তো আরও কিছু আজেবাজে বলবে।কিন্তু বলেনি।জিব্রান কয়েকবার তেড়ে আসতে ধরেছিল বাবার দিকে। ওর একটাই কথা,” সব তোর জন্য হয়েছে। “ চাচা বাবাকে বললেন ,”ভাই তোমার জীবনে এগুলোই পাওনা ছিল” বাবার মুখ দেখে মনে হচ্ছিল অপরাধবোধে ভুগছেন। কিন্তু তাতে কি?এই বোধের কোন মূল্য কি আছে?

এর পর থেকে আমরা চাচার বাসাতেই ছিলাম।বাবা আর চাচা দুজনই আমাদের ভার নেয়। জিব্রান অবশ্য এসবের পর থেকে বাবার সাথে কখনো কথা বলতো না।এভাবে আমার অনার্স- মাস্টার্স পরিপূর্ণ হয়।জিব্রান রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তে থাকে। আমার বিয়ে হয়ে যায় একজন ব্যাংকের কর্মকর্তার সাথে।আমি একটি কলেজের লেকচারার।

আমরা মায়ের খোঁজ পেয়েছিলাম,নানি বাড়ির এক আত্মীয়ের কাছে।মা আসলে তার গ্রামের বাড়িতেই ছিলেন।মানে আমাদের নানা বাড়িতেই ছিলেন।মামা মায়ের খরচ বাবদ কিছু টাকা পাঠাতেন। জিব্রান মাকে নিয়ে এসেছিল ঢাকায়। কিন্তু মা বেশিদিন বাঁচেন নি। হয়তো উনি লজ্জার অনুভূতিটা কাটাতেই পারছিলেন না। আর আমরাও মাকে বুঝাতে পারিনি যে আমাদের চোখে সে নিষ্পাপ।

জিব্রান ডাক্তার হিসেবে বেশ নাম করেছে।বিয়েও করেছে ও। জিব্রানের ছেলে আর আমার ছেলের মাঝে খুব ভাব।জিব্রান এখনো অবসরে দীর্ঘশ্বাসে আমাকে বলে,”আপু,আমাদের মায়ের পৃথিবীতে জন্ম হয়েছিল উদাহরন হিসেবে।যে কিছুই পেলনা। আমি আমার বাবার মত বাবা নই।আমি আমার পরিবারকে ভালবাসি।“

About The Author
Rahat Ara
I am Rahat. I am a BBA student. writing is my hobby. In my free time I like to read books and love to enjoy sci-fi movies. I want to be a Chartered accountant.
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment