Now Reading
মাশরাফির সাথে ১০০ জয়



মাশরাফির সাথে ১০০ জয়

ক্রিকেট খেলা টা বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে। এটা এখন আমাদের জন্য অক্সিজেনের মত হয়ে গেছে। মনে করেন আপনার সাথে কারো রাজনৈতিক বিরোধ আছে, যাকে দেখলেই আপনার রক্ত গরম হয়ে ওঠে, কিন্তু একসাথে বাংলাদেশের খেলা দেখতে বসলে কি আর মনে থাকবে আপনার পাশে কে ? এমনই আমাদের ভালবাসা ক্রিকেটের উপর। মাশরাফি সাকিবরা আমাদের কাছে দেশের সবচেয়ে উচু স্থানে আছে। যারা মাঠে নামলে গ্রামের দোকানগুলোতে ভীড় লেগে যায়, শহরের টিভির শো রুম গুলোর সামনে একসাথে দাঁড়িয়ে খেলা দেখে রিক্সাওয়ালা আর একজন সরকারী চাকুরীজীবী। অনেক ইতিহাসের সাক্ষী আমরা ১৬ কোটি প্রাণ। অনেক ইতিহাসের মধ্যে একটা বলছি।

মনে আছে সেই দিন টার কথা ? ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ যেদিন ১০০ তম ওয়ানডে ম্যাচ জেতার জন্য মাঠে নেমেছিল মাশরাফিরা। এই দিনটা কখনও ভোলার মত না, অন্তত আমার জন্য। ঢাকার বাইরে থাকায় সব খেলা দেখা হতো না। যেগুলা আগে দেখেছিলাম সেগুলার একটাতেও মাশরাফি খেলেনি। সেদিন আফগানস্থানের বিপক্ষে ১০০ জয় আর প্রথমবারের মত আমার সবথেকে প্রিয় মানুষটিকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু সাথে আরো অনেক কিছুই দেখেছি। যেগুলার জন্য আমার জীবনে এই দিনটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

মাশরাফির ২য় ওভারে। বল হাতে এগিয়ে আসছে জীবন্ত বাংলাদেশ। বল করার সাথে সাথেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। সেই মুহূর্ত টা আমার জন্য সহ্য ক্ষমতার বাইরে ছিল। মনের মধ্যে একটা কথায় আসছিল, আজ প্রথমবার মাশরাফি কে দেখতে আসলাম আর আজই কি তার ক্যারিয়ার টার সমাপ্ত হবে ? আমি আর কোনদিন খেলা দেখবো না যদি মাশরাফির কিছু হয়। আমার সাথে পুরা স্টেডিয়াম নিরব। কিন্তু যাকে টিভির পর্দায় এত ত্যাগ স্বীকার করতে দেখলাম যার সম্পর্কে এত কিছু শুনলাম সে কি থেমে থাকতে পারে ? না, বাঘকে কখনও দমায়ে রাখা যায় না। আমার হিরো আবার উঠে দাড়ালো, বল হাতে নিলো। আমার গাল বেয়ে পড়ে যাওয়া পানি মুছে তাকে একটা স্যালুট দিলাম। কিন্তু চোখ থেকে আরো বেশি পানি পড়ছে আমার। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি বাকিদেরও চোখ ভেজা। আমি এতদিন যা যা শুনতাম, তার সম্পর্কে যা যা পড়েছি আজ নিজের চোখে দেখলাম। আমার হাত পা তখনও কাঁপছে। একটা মানুষ নিজের দেশকে এত ভালবাসতে পারে? কিভাবে সম্ভব আমি বা আপনি হলে তখন কি করতাম ? আমি আর আপনি হলে তো এতদুর আসতেই পারতাম না। পারতাম না এতগুলা সার্জারী পার করে আসতে। আমরা তো টিভির সামনে বসে খেলতে পারি।

সেই ম্যাচে আর কি দেখেছিলাম জানেন ? দেখেছিলাম ম্যাশ এর মতই আরেক পাগলা কে। আমি তো চোখের পানি মুছে বসে পড়েছিলাম কিন্তু সে বসে থাকতে পারেনি। মেসি রোনালদো দের সাথে আমরা টিভিতে এই দৃশ্য প্রায়ই দেখি যে একজন ভক্ত সিকিউরিড়ি ভেদ করে মাঠে ভিতর এসে তাদের জড়িয়ে ধরে ছবি তোলে, জার্সি নেয়। নিজের দেখের একজন ক্রিকেটারের সাথে এই জিনিসটা দেখলে তাও স্টেডিয়ামে বসে, কতটা ভাল লাগে ভাবতে পারেন ? মাশরাফি কে এসে জড়িয়ে ধরার পর সিকিউরিটিরা তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যেতে চাইলে তাকে সেই মাশরাফিই বাচায়। নিজের আপন ভাই এর মত বুক দিয়ে আগলে রাখে তাকে। পরে তাদের হাতে দিয়ে এও বলে দেয় যেন তাকে কিছু না করা হয়। আমরা সবাই জানি সে কাজটা ঠিক করেনি। এভাবে মাঠের মাঝে চলে যাওয়া অনেক খারাপ হয়েছে। কিন্তু সে তার আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। পরে তাকে মিরপুর থানায় আটক করলে মাশরাফির সুপারিশেই তাকে ছাড়া হয়। এই কথাগুলো এখন গল্পের মত মনে হয়। আসলেই কি এটা হয়েছিল ? নাকি ১৬ কোটী মানুষ সেদিন স্বপ্ন দেখছিল ? না সব সত্যি। কেন সত্যি হবেনা ? এ যে মাশরাফি।

আমরা আগে চিন্তা করতাম যদি ওদের মত আমিও মাঠে যেয়ে মেসিকে জড়িয়ে ধরতে পারতাম, যদি রোনালদোর সাথে একটা সেলফি তুলতে পারতাম। এত কিছু দিয়ে শেষ হল আমাদের ১০০ তম জয়। একটুর জন্য শেষ হয়ে যেত মাশরাফির ক্যারিয়ার। যার জন্য আমি নিজেকেই দায়ী মনে করতাম। সত্যিই তাই, আমরা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, যুদ্ধের গল্প শুনেছি, বই তে পড়েছি। কিন্তু আমরা জীবন্ত কিংবদন্তী মাশরাফিকে দেখেছি। দেখেছি তার দেশের জন্য ভালোবাসা। অনেকে আসবে যাবে, মাশরাফির জায়গাটা খালিই পড়ে থাকবে।

About The Author
Ahmmed Abir
জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বাচতে শিখেছি। নিজেকে চ্যালেঞ্জ করে সামনে এগিয়ে যেতে শিখেছি। পছন্দ করি গান গাইতে গীটার বাজাতে আর গেইম খেলতে।