Now Reading
রবীন্দ্রমানসজাত বাংলাসাহিত্যের এক আগন্তুক কারুশিল্পী



রবীন্দ্রমানসজাত বাংলাসাহিত্যের এক আগন্তুক কারুশিল্পী

আবু সয়ীদ আইয়ুবের জন্ম কলকাতার এক উর্দুভাষী অভিজাত পারসি পরিবারে ১৯০৬ সালের ১৫ই এপ্রিল। বেড়ে উঠেছেন উর্দু, ফারসি ও ইংরেজি ভাষার আবহাওয়ায়। বাংলাভাষার সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। স্কুলে পড়ার সময়েই উর্দু ও ফারসি কাব্যে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি সাহিত্যের চর্চায় তাঁর আনন্দে সময় কাটতো। মাত্র তেরো বছর বয়সে উর্দু অনুবাদে ‘গীতাঞ্জলি’ পড়ে অভিভূত হলেন। পরে ইংরেজি অনুবাদও পড়েন। সেদিন কি কেউ অনুমান করতে পেরেছিল বাংলাভাষায় মূল ‘গীতাঞ্জলি’ পড়তে তিনি দুর্দমভাবে উৎসাহিত হবেন! তার সাথে বঙ্গভাষী বন্ধুদের সাথে স্বচ্ছন্দে আলাপ-আলোচনা করার এতটা তাগিদ অনুভব করবেন যে নিজের চেষ্টায় বাংলাভাষা শিখে বাংলাভাষাকে ভালোবেসে বাংলাভাষার লেখককুলের মুকুটমণি হিসাবে সমাদৃত হবেন এবং বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ কবির শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা হবেন! নিজ চেষ্টায় সংস্কৃত শিখে তাঁকে গীতা এবং উপনিষদও পড়তে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্ত্বার স্বরূপ সন্ধানের প্রয়োজনে।

আইয়ুব কৃতিত্বের সাথে কলকাতার সেন্ট এ্যান্থনিজ স্কুল থেকে এনট্রান্স এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যায় ডিসটিংসান সহ অনার্স ডিগ্রি পাওয়ার পর তিনি আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’র প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। প্রখ্যাত অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীসের অধীনে তিনি ‘এডিংটন্‌স ম্যাথমেটিক্যাল থিয়রি অব রিলেটিভিটি’ অধ্যয়ন করেন। নোবেল-বিজয়ী অধ্যাপক সি ভি রমনের সঙ্গে কিছুকাল ‘রমন এফেক্ট’ নিয়ে গবেষণা সহকারীও ছিলেন। আশৈশব সঙ্গী শারীরিক অসুস্থতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি এমএসসি পরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেন নি। পরে তিনি দর্শনশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রিসার্চ ফেলোশিপ নিয়ে বিশ্রুত দার্শনিক অধ্যাপক ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণের অধীনে ‘কনটেন্ট অব এরর ইন পারসেপসান এ্যান্ড থট’ বিষয়ে গবেষণা করেন।

আইয়ুব কৃষ্ণনগর কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (শান্তিনিকেতন) ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে অধ্যাপনা করেন। রকফেলার ফাউন্ডেশান স্কলার, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতবিদ্যার প্রথম অধ্যাপক এবং শেষে সিমলা ইনস্টিটিউট অব এ্যাডভান্সড স্টাডিজের ফেলোশিপ– সবই একসময় ছাড়তে হয় অসুস্থতার জন্য। মাঝে ক্ষয়রোগের চিকিৎসার জন্য মাদ্রাজের মদনপল্লীতেও কাটিয়ে আসতে হয় কিছু সময়। পদার্থবিজ্ঞানের কৃতী ছাত্রর পরবর্তী গন্তব্য হলো দর্শনের অমরাবতী। সেখানেও স্থির থাকলেন না বেশি দিন। সহজাত আকর্ষণে ঝুঁকে পড়লেন সাহিত্যের প্রতি। এই পরিবর্তনের ফলে বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্য দীপ্যমান হয়ে উঠল।

বাংলা তাঁর পারিবারিক সূত্রে পাওয়া ভাষা নয়, স্বনির্বাচিত ভাষা। শিবনারায়ণ রায় লিখেছেন, “ঐকান্তিক প্রযত্নে তিনি শুধু এই ভাষা পড়তে বলতে শেখেন নি, এই ভাষার তিনি একজন প্রথম শ্রেণীর প্রাবন্ধিক-গদ্যশিল্পী রূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। বাংলাভাষায় তাঁর সঙ্গে তুলনীয় আর কোনো সাহিত্যিকের কথা আমার স্মরণে আসে না বাংলা যাঁর মাতৃভাষা নয়, অথচ যাঁর ভাবুকতা ও রচনাশৈলী এই ভাষাকে এমন কমনীয় ভাবে সমৃদ্ধ করেছে”। সন্‌জীদা খাতুন লিখেছেন, “আইয়ুবের ‘চণ্ডালিনীর ঝি ও রাজেন্দ্রনন্দিনী/প্রেমের দুই রূপ’ প্রবন্ধ পড়ে বিভোর হয়ে কাটল ক’দিন। গদ্যভাষার অন্তর্নিহিত কবিতা আমার এই বিমুগ্ধতার জনক”। সেই লিরিকই সুন্দর যা গদ্যের অন্তর থেকে দেহ ধরে ওঠে। অরুণকুমার সরকার লিখেছেন, “বাংলা কবিতার প্রেমে পড়েই তিনি বাংলাভাষা শিখেছেন এবং এই ভাষার এমন একটি স্বকীয় শৈলী আয়ত্ত করেছেন যা যে-কোনো বাঙালি লেখকের ঈর্ষণীয়”। বাংলা কবিতা বিষয়ে তাঁর বলার অধিকার স্বোপার্জিত।

আইয়ুবের প্রথম বাংলা প্রবন্ধ ‘বুদ্ধিবিভ্রাট ও অপরোক্ষানুভুতি’ ১৯৩৪ সালে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী ও অতুলচন্দ্র গুপ্তর মনযোগ আকর্ষণ করে। আধুনিক কবিতা নিয়ে কিছু লিখলেও আইয়ুবের প্রথম প্রেম রবীন্দ্রনাথ। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার প্রধান অংশ জুড়ে নিরপেক্ষ রবীন্দ্র-মূল্যায়ন। মুহম্মদ সাইফুল ইসলামের ভাষায় “আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার – তাঁর নিজেরই আবিষ্কার। এর জন্য আইয়ুবকে যে পরিশ্রম করতে হয়েছে, তার নজির পৃথিবীর যে কোনো সাহিত্যেই দুর্লভ”। একবার শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ আইয়ুবের সঙ্গে সাহিত্য ও আধুনিকতা প্রসঙ্গে আলোচনা করে বিশেষ সন্তোষ লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন আইয়ুব রবীন্দ্রনাথের এই দিকটি নিয়ে কিছু লিখুন। ব্যাধির উপর্যুপরি আক্রমণে আইয়ুব সে লেখা রবীন্দ্রনাথের জীবনকালে লিখতে পারেননি। তবে তাঁর প্রথম বাংলা গ্রন্থ ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’(১৯৬৮) মনীষাদীপ্ত অনন্য বিশ্লেষণের জন্য কলকাতার সাহিত্য-সমাজে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। ১৯৭০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘Poetry and Truth’ বিষয়ে আইয়ুবের বক্তৃতামালায় তাঁর দর্শন-জ্ঞানের গভীরতা এবং কাব্য-আলোচনার দক্ষতা প্রকাশ পায়। পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পুস্তক আকারে সেগুলো সংকলিত করে। এর আগে প্রায় এক দশক (১৯৫৭-১৯৬৮) আইয়ুব অম্লান দত্তর সাথে যৌথভাবে Quest নামে একটি অতি উচ্চমানের ইংরেজি ত্রৈমাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ভারতের সব অঞ্চল সহ বিদেশের বহু বুদ্ধিজীবীর লেখা কোয়েস্টে প্রকাশিত হতো।

রবীন্দ্রনাথের শান্ত-সুন্দর জগৎ আকৈশোর রবীন্দ্র-প্রেমিক আইয়ুবের মানসলোককে উদ্ভাসিত করেছিল। ‘পথের শেষ কোথায়’ গ্রন্থে আইয়ুব লিখেছেন, “আমার চোখ তো আমি অনেকটাই পেয়েছি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে”। লিখেছেন, “রবীন্দ্রনাথ আমার মনকে প্রসারিত করেছেন, হৃদয়কে সূক্ষ্ম রসগ্রাহী ও সংবেদনময় করেছেন”। ‘পান্থজনের সখা’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “স্বীকার করাই ভালো এবং বলা হয়তো বাহুল্য, যে-রবীন্দ্রনাথকে আমি মর্মে-মর্মে পরম আত্মীয় ব’লে জেনেছি, ‘চিরসখা’ ব’লে ভালোবেসেছি, তাঁরই কথা বলতে উৎসাহ বোধ করেছি এখানে।”

আইয়ুব অতিপ্রজ লেখক ছিলেন না। তিনি অনেক সময় নিয়ে লিখতেন। লেখার পরিমাণের চেয়ে উৎকর্ষতার দিকে তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। তাঁর সব লেখাই ছিল মৌলিক এবং অসাধারণ উচ্চমানের। পাণ্ডিত্য, নান্দনিক চেতনা, রসজ্ঞান, রুচি ও পরিমিতিবোধের এক অপুর্ব সমন্বয় আইয়ুবকে বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা ও সমালোচকের মর্যদায় আসীন করেছিল। সুষম বাক্যবন্ধে তিনি তাঁর চিন্তাকে আকার দিতেন। রবীন্দ্রনাথ সংক্রান্ত বইগুলি লেখার আগের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এবং লেখার সময় তিনি বার বার রবীন্দ্রকাব্য শুধু পড়েছেন ও আলোচনা করেছেন তাই নয়, প্রতিদিন রেকর্ডে রেডিওতে এমনকি প্রখ্যাত গায়ক-গায়িকাদের কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তাঁর বই ‘পান্থজনের সখা’ রবীন্দ্রকাব্যের যুক্তিসিদ্ধ আশ্চর্য ব্যাখ্যাসমৃদ্ধ গ্রন্থ। ‘পান্থজনের সখা’ আলোচনা করতে গিয়ে সুকুমারি ভট্টাচার্য লিখেছেন, “প্রবন্ধগুলি রচনাকালে তাঁর নিরন্তর শারীরিক ক্লেশ মনে করলে বিস্মিত হতে হয় এ-কাজ এত তৎপরতার সঙ্গে তিনি সমাধা করলেন কি করে। … এ গ্রন্থ যিনি রচনা করেছেন বাংলা তাঁর জন্মসূত্রে মাতৃভাষা নয়, তাঁর কৈশোরে অর্জিত ভাষা – এ ব্যাপারটির বিস্ময় সহজে কাটেনা। ভাষার প্রয়োগে সুরুচি ও মনন, শব্দ সংকলনে পরিশীলিত চিত্তবৃত্তির পরিচয় যেমন তৃপ্তি আনে তেমনই বিস্ময়”।

১৯৫৬ সালের ১০ই জুন গৌরী দত্তর সাথে সহমতের ভিত্তিতে আইয়ুবের বিয়ে হয়। পারস্পরিক সহমর্মিতা ও শ্রদ্ধাবোধের ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেছিল তাঁদের শিল্পের সংসার। আইয়ুবের বাড়িতে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় অনেক গুণী ব্যক্তি আসতেন। কেউ অধ্যাপক, কেউ লেখক, কেউ সংগীত শিল্পী। ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্যিক দম্পতি বুদ্ধদেব বসু ও প্রতিভা বসু, কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর স্ত্রী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রাজেশ্বরী দত্ত, কবি বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী, অধ্যাপক শিবনারায়াণ রায়, অধ্যাপক অম্লান দত্ত, সাংবাদিক গৌরকিশোর ঘোষ, জ্যোতির্ময় দত্ত, নরেশ গুহ, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী নিলীমা সেন। তাঁর ছাত্রজীবনের বন্ধুদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত সৈয়দ মুজতবা আলী, অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সকলের মধ্যে আইয়ুব ছিলেন খুবই বিশিষ্ট। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট রাবীন্দ্রিক ভাব ছিল, যা তাঁকে একটি স্বাতন্ত্র্য এনে দিত। তাঁর উপস্থিতিতে একটি বিদগ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হতো। অনেক প্রাণবন্ত আলোচনা হতো।

বাক্যালাপের সময় আইয়ুবের শিষ্টতা, সৌজন্য ও সংযম ছিল অতুলনীয়। তাঁর মেধাকে যেমন সবাই সমীহ করতেন, তেমনই অভিভূত হতেন তাঁর চরিত্রের মাধুর্যে। তাঁর কন্ঠস্বর কখনো উচ্চগ্রামে উঠতো না। আইয়ুব ছিলেন এক আশ্চর্য বাক্‌শিল্পী। তাঁর ভাষা সুন্দর, চিন্তা সুন্দর, সর্বোপরি তাঁর মন সুন্দর। তিনি সর্বদাই বিনম্র, অনুত্তেজিত, সুবিন্যস্ত, নিজের যুক্তিতে দৃঢ় অথচ অপরের বক্তব্য বুঝতে আগ্রহী এবং তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি অতি সৌহার্দ্যপূর্ণ ভঙ্গিতে মৃদুস্বরে স্বভাবসিদ্ধ শোভন ও পরিশীলিত ভাষায় যুক্তিজাল বিস্তার করতেন। যাঁর সঙ্গে তর্ক করছেন অনেকক্ষণ পর্যন্ত আইয়ুব তাঁর সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন এমন মনে হতো। তারপর দেখা যেত তাঁর অনেক যুক্তিই আইয়ুব খণ্ডন করেছেন। মতের মিল নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মনের উদারতা বন্ধুত্বের যথার্থ ভিত্তি।

আইয়ুব ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক দার্শনিক, সংস্কৃতিবান মুক্তমনের মানুষ। একজন প্রকৃত মানবতাবাদী। ধর্মীয় সংকীর্ণতা, অসহিষ্ণুতা ও অনৈতিকতার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে। তাঁর নিজের কথা থেকে তাঁর উদারনৈতিকতার পরিচয় পাওয়া যায়:

‘শিশু বয়সে যখন ভালোমন্দ সত্যাসত্য বিচার করার মতো চিৎশক্তি আদৌ তৈরি হয় নি, তখনই আমরা সম্প্রদায় বিশেষের কতকগুলি অবোধ্য শাস্ত্রবাক্য বা ডগ্‌মা মুখস্থ করাই, কতকগুলি অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠান অভ্যাস করাই। তার চেয়েও যেটা সাংঘাতিক, ভিন্ন মত, আচার ও অনুষ্ঠানের প্রতি অতিশয় অবজ্ঞার ভাব আমরা সেই কাঁচা বয়স থেকেই ছেলেমেয়েদের মনে পাকা করিয়া রাখি। … এ কুশিক্ষার অনিষ্টকারিতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।’

আইয়ুবের স্ত্রী অধ্যাপক, লেখক ও সমাজসেবী গৌরী আইয়ুব (দত্ত) রবীন্দ্রস্নেহধন্যা মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অমূল্য মানবিক সহায়তা দিয়েছেন অগণিত মুক্তিযোদ্ধা এবং বাংলাদেশের উদ্বাস্তু বুদ্ধিজীবী ও বাস্তুচ্যুত শরণার্থী এতিম শিশুদের জন্য।

মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম লিখেছেন, আইয়ুব যে বাঙালির বৃহৎ ঐতিহ্যের সঙ্গে আপনাকে পৃথক করে দেখেননি, সেটাই তাঁকে বাঙালি মনীষার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অম্লান দত্ত বলেছেন, “জন্মসূত্রে বাঙালি না হয়েও আবু সয়ীদ আইয়ুব হয়ে আছেন আশ্চর্যভাবে বঙ্গসংস্কৃতির সন্বয়সাধক মিত্র, বহুবিদ্যাসমৃদ্ধ মেধার ঔজ্জ্বল্যে এবং ঔদার্যের ঐশ্বর্যের গুণে যিনি অর্জন করেছেন অনিঃশেষ স্মরণযোগ্যতা”।

তাঁর অন্যান্য লেখার কথা ছেড়ে দিলেও ‘আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ’(১৯৬৮), ‘পান্থজনের সখা’(১৯৭৩), ‘পথের শেষ কথায়’(১৯৭৭), ‘ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক’(১৯৯১), ‘One Hundred and One Poems of Tagore’(১৯৬৬), ‘Tagore’s Quest’(১৯৮০), ‘Varieties of Experiences’(১৯৯০) বইগুলির জন্য তিনি বিদ্বৎসমাজে চিরজীবী হয়ে থাকবেন। আবু সয়ীদ আইয়ুব ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’(১৯৬৯), ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’(১৯৭০), ‘কালিদাস নাগ স্মৃতি পদক’(১৯৭৪), ‘আনন্দ পুরস্কার’(১৯৭৬), বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’(১৯৮০) এবং টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ‘রবীন্দ্রতত্ত্বনিধি’ সম্মানে অলংকৃত হয়েছেন।

আইয়ুব আবৃত্তি শুনতে পছন্দ করতেন। নিজেও ভাল আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথ থেকে – ঘর আধোঅন্ধকার করে মৃদু গম্ভীর কন্ঠে। গানের খুব ভক্ত ছিলেন। ক্লাসিক্যাল, ভজন – বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত। তাঁর অনুরোধে অনেক স্বনামধন্য গায়ক-গায়িকা বাড়িতে এসে গান শুনিয়ে যেতেন। শেষের দিকে তিনি অনারোগ্য পার্কিন্‌সন্‌ রোগযন্ত্রণায় কাতর হয়ে শয্যাগত ছিলেন। এই রোগে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে অকেজো হয়ে যায়, কিন্তু মস্তিষ্ক শেষপর্যন্ত সক্রিয় থাকে। আইয়ুব নিজেই লিখেছেন, “বলার কথা জমছে মনে, অথচ প্রকাশ করার শারীরিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি – সে যে কী বিষম জ্বালা, কেমন ক’রে তা বোঝাবো। রবীন্দ্রনাথের মতন সাত্ত্বিক কবির চারিত্র্যশক্তি বা মনোবল আমার নেই যে বলবো:

“এই করেছ ভালো নিঠুর হে, এই করেছ ভালো
এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো।”

বরঞ্চ আমি গালিবের মতন মাটির মানুষের কবির ভাষায় বলতে পারি:

“চলে যাচ্ছি জীবনের শত অপূর্ণ বাসনার ক্ষতচিহ্ন বুকে নিয়ে;
আমি এক নির্বাপিত প্রদীপ, মহফিলে রাখার যোগ্য নই আর।”

রেডিওর প্রভাতী অধিবেশনে রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠান আইয়ুব নিয়মিত শুনতেন। ১৯৮২ সালের ২১শে ডিসেম্বর সকালটি এলো আর সব দিনের মতোই। বেতার তরঙ্গে তখন ভেসে আসছিল “এখনো ঘোর ভাঙে না তোর যে, মেলে না তোর আঁখি – কাঁটার বনে ফুল ফুটেছে দেখিসনে তুই তা কি”। গানটি শুনতে শুনতে কাঁটার বনে ফুল ফোটার বার্তা নিয়েই নিঃশব্দে মৃত্যুহীন লোকে চলে গেলেন বাংলাসাহিত্যের রবীন্দ্রমানসজাত আগন্তুক এক অনন্যসাধারণ কারুশিল্পী।

সহায়ক পাঠ-
১। পান্থজনের সখা – আবু সয়ীদ আইয়ুব।
২। পথের শেষ কোথায় – ”
৩। আবু সয়ীদ আইয়ুব স্মরণে – আরতি সেন।
৪। আবু সয়ীদ আইয়ুব – অন্নদাশঙ্কর রায়।
৫। আবু সয়ীদ আইয়ুব জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্য – অম্লান দত্ত।
৬। আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে – সন্‌জীদা খাতুন।
৭। আবু সয়ীদ আইয়ুবঃ জীবনের পথে প্রজ্ঞার আলোয় – মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম। ৮। আবু সয়ীদ আইয়ুবঃ সৌম্য প্রমিথিউস – শিবনারায়ণ রায়।

About The Author
Abdul Mueez
Abdul Mueez