আন্তর্জাতিক

টাইটানিক এর ইতিকথা

ইতিহাসের পাতায় এতটা চর্চা আর কোনো জাহাজকে নিয়ে হয়নি যতটা হয়েছে এই টাইটানিককে নিয়ে। কারণটা বোধহয় সেই কালজয়ী চলচ্চিত্রটির জন্য। কিন্তু সেই চলচ্চিত্রের দৃশ্যমান জগতের বাইরেও রয়েছে অজানা এক টাইটানিক। সেইসব টুকিটাকি নিয়েই আজকের এই লেখা।

‘হোয়াইট স্টার লাইন’ নামক কোম্পানির অর্ডারে এই টাইটানিক নির্মাণ করে বেলফাস্টের ‘হারল্যান্ড অ্যান্ড উলফ শিপইয়ার্ড’। ‘টাইটানিক’ নামটি আসে গ্রীক দেবতা টাইটানের নাম থেকে। এটা ছিল জাহাজটির সংক্ষিপ্ত নাম। পুরোনাম ছিল ‘আর এম এস টাইটানিক’ বা ‘রয়েল মেল স্টিমার টাইটানিক’। এর দৈর্ঘ্য ৮৮২ ফুট ৯ ইঞ্চি আর প্রস্থ ৯২ ফুট ৬ ইঞ্চি। উচ্চতায় ছিল ১৭৫ ফুট। ততকালীন সময়ে এটি ছিল সবচেয়ে বড় আর বিলাসবহুল জাহাজ। টাইটানিক জনসম্মুখে প্রথম আসে ৩১শে মে ১৯১১ তে। জাহাজটি নির্মাণ করতে খরচ হয় ৭.৫ মিলিয়ন ডলার, যা বর্তমান সময়ের হিসাবে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সমান।

নির্মাণকালের শুরু থেকেই এই জাহাজকে নিয়ে মানুষের মাঝে কৌতুহল সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল এর বিপণন কোম্পানি। এমনকি তারা টিকেট এর গায়ে প্রচারের জন্য লিখেছিল, “স্বয়ং ঈশ্বরও যাকে ডোবাতে পারবে না” ধরনের শ্লোগান। এ ধরনের শ্লোগান আর টিকিটের মূল্য সহনীয় পর্যায়ে থাকায় প্রচুর নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ আমেরিকায় যাবার স্বপ্ন দেখেছিল। আবার ‘অলিম্পিক ক্লাস’ এর বিলাসবহুল বলে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী তিন ব্যক্তি স্বপরিবারে সে জাহাজের প্রথম যাত্রার টিকেট কেটেছিলেন। প্রথম শ্রেণির টিকিটের মূল্য ছিল ৩১০০ ডলার আর ৩য় শ্রেণির জন্য ছিল মাত্র ৩২ ডলার। সাউদাম্পটনের ৪০১ নং ইয়ার্ড থেকে প্রথম যাত্রার দিনটি ছিল ১০ই এপ্রিল ১৯১২।

শুধু আকৃতি বা বিলাসিতার দিক দিয়ে নয়, গতির দিক দিয়েও এটি সেই সময়ের সেরা জলযান ছিল। প্রায় ২৪ নটিক্যাল বা ৩৯ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায় ছুটে চলত এই জলদানব। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কাছে হার মেনে তাকেও ডুবতে হয় মহাসমুদ্রের অতল গহ্বরে। উত্তর অ্যাটলান্টিক সাগরে ১৯১২ সালের ১৫ই এপ্রিল রাতে একটি আইসবার্গের সাথে রহস্যজনক ভাবে ধাক্কা খায় এই জাহাজটি। ধাক্কা লাগার প্রায় ২ ঘন্টা ৪০ মিনিট পর একেবারে তলিয়ে যায় জাহাজটি। তখন প্রায় সাড়ে তিন হাজারের মত মানুষ এই জাহাজটিতে অবস্থান করছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, এতো বড় বিলাসবহুল জাহাজের লাইফবোট ছিল মাত্র ২০টি যা বড়জোর ১১৭৮ জনকে বাঁচাতে সক্ষম। যা মোট যাত্রীর তিন ভাগের এক ভাগ। অনেকেই এই জাহাজডুবির ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে মনে করেন। কারণ, এই জাহাজডুবির ঘটনা বিশ্বে বিপুল পরিবর্তন এনেছে। বিশেষত ফেডারেল ব্যাংক অব আমেরিকা প্রতিষ্ঠা করা সহজ করে দেয় এই জাহাজডুবি। নিম্নবিত্ত মানুষের আর্থিক সমস্যার কথা চিন্তা করে এই ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী যে ব্যক্তিরা বারবার ভেটো দিয়ে আসছিলেন তাদের প্রত্যেকেই স্বপরিবারে এই দুর্ঘটনায় সলিল সমাধি হয়। যার ফলাফল স্বরুপ আজো যুক্তরাষ্ট্রকে ফেডারেল ব্যাংকের উপর অর্থের জন্য নির্ভর করতে হয়। এতো ক্ষমতাধর রাষ্ট্র হওঁয়া সত্ত্বেও তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোনো ব্যাংক নেই।

এবার আরো কিছু মজার তথ্য দেয়া যাক। এই জাহাজটির যে আর্কিটেক্ট থমাস এন্ড্রু তিনিও এই জাহাজডুবিতে মারা যান। জাহাজের ডিজাইন সংক্রান্ত সব কাগজপত্র তার সাথে থাকায় সেগুলোও সাগরের অতলে হারিয়ে যায়। এর ফলে অনুসন্ধান করার মত তেমন কোনো নথিপত্র অবশিষ্ট ছিল না। এতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও তাদের লাইফবোট এ তোলা হয়নি। কারণটা, আজো অজানা। এছাড়াও এই জাহাজের মুখ্য প্রপেলারটি ছিল অন্য জাহাজের ব্যবহৃত ভাংগা প্রপেলার যা পরবর্তীতে মেরামত করা হয় এবং টাইটানিক এ ব্যবহার করা হয়। আইসবার্গের সাথে ধাক্কা খাওয়ার আগেও একবার ‘এসএসসিটি অব নিউইয়র্ক’ জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল টাইটানিকের কিন্তু মাত্র চার ফুট দূরত্বের জন্য বেঁচে যায়। দুর্ঘটনার আগের দিন দুপুরের দিকে ‘America’ নামক জাহাজ থেকে রেডিওর মাধ্যমে জানানো হয় যে সামনে একটি আইসবার্গ আছে। এছাড়াও ‘মেসাবা’ নামের আরো একটি জাহাজ থেকেও একই বার্তা টাইটানিক এ আসে। কিন্তু টাইটানিকের রেডিও যোগাযোগের দায়িত্বে থাকা জ্যাক পিলিপস আর হ্যারল্ড ব্রীজ সেগুলোকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেন। মূলত তাদের এই দায়িত্বহীনতার ফলাফল এই জাহাজডুবি।

আর ভাগ্যও সেদিন টাইটানিকের সাথে ছিল না। নইলে এমন অংশেই আইসবার্গের সাথে ধাক্কা লাগে যার ফলে পানি প্রতিরোধের ১২টি গেটই বিকল হয়ে পড়ে। যেখানে বড়জোড় ৪টি পানিপূর্ণ কম্পারটমেন্ট নিয়ে ভাসতে পারতো সেখানে ৫টি কম্পারটমেন্ট এ পানি ঢুকে পড়েছিল। ১৫ তারিখ মধ্যরাতে লাইফবোটগুলো পানিতে নামানো হয়। এতে কিছু সংখ্যক মানুষ বেঁচে যায়। টাইটানিক চারিদিকে নিয়মিতভাবে বিপদসংকেত প্রেরণ করতে থাকে। সেসময় টাইটানিকের সবচেয়ে কাছের জাহাজ ছিল ‘Carpathia’ যেটা ৯৩ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে আসতে সময় লেগেছিল ৪ ঘন্টা। এছাড়াও ‘মাউন্ট ট্যাম্পল’, ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট’ এবং ‘অলিম্পিক’ সেই বিপদসংকেত পায়। তবে অনেক বেঁচে যাওয়া যাত্রীর মতে জাহাজ থেকে নিকটবর্তী দূরত্বে একটা জাহাজের আলো দেখা যায়। যার পরিচয় আজো রহস্যে ঘেরা। অনেকের মতে সেটি ছিল ‘Sampson’ নামক জাহাজ। ধ্বংসের মুখে থাকা টাইটানিক থেকে অনেক ওয়ারলেস এর মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় এবং দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য জরুরী রকেট পর্যন্ত ছোঁড়া হয় কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এভাবেই প্রায় ১৫০০ যাত্রীর মৃত্যু হয় এই দুর্ঘটনায়। টাইটানিক যে জায়গায় ডুবে যায় তার নাম ‘দ্যা গ্রেট ব্যাংকস অফ নিউফাউন্ডল্যান্ড’। বেশিরভাগ লোকই প্রাণ হারিয়ে ছিল অতিরিক্ত ঠান্ডায়। কারণ, তখন পানির তাপমাত্রা ছিল ২৮ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা মাইনাস ২ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এ তাপমাত্রায় মানুষ ১৫ মিনিটের ও কম সময়ে মারা যায়। সুতরাং পানিতে থাকা অধিকাংশ মানুষই মারা যায় কিছু সাহায্য পাবার আগেই। বিশেষত নারী ও শিশুরা।

৭৩ বছর পর রবার্ট বালারড নামক ফরাসি বিজ্ঞানী টাইটানিককে খুঁজে বের করেন। যে জাহাজটিকে অডুবন্ত বা আনসিংকেবল বলে আখ্যা দেয়া হয়েছিল সেই জাহাজটিই এখন সাগরতলের ১২ হাজার ৬০০ ফুট নিচে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে আছে। আর সাক্ষী হয়ে আছে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দুর্ঘটনার।

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

পঙ্গু সংগঠনের আরেক নাম জাতিসংঘ

Syed Asraful

রাশিয়াকে মোকাবেলায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের বিশাল সামরিক প্রস্তুতি

MP Comrade

চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

MP Comrade

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy