Now Reading
ম্যারিটাল রেপ বা দাম্পত্য জীবনে ধর্ষণ কি আপনি জানেন ?



ম্যারিটাল রেপ বা দাম্পত্য জীবনে ধর্ষণ কি আপনি জানেন ?

আমি মানুষটা কেমন?? আমাকে একটু খোঁচা মেরে দেন মুখ দিয়ে খৈ এর মত কথা ফুটবে। যেমন আজ একটু খোঁচা খেয়ে আসলাম। আর খোঁচার বিষয় টা কি ছিল জানেন?? ম্যারিটাল রেপ। নিঃসন্দেহে এই ব্যাপারটা অনেক জটিল। ধর্মীয় মতামত এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে এটা সমালোচনার ঝড় তোলবে এক কথায়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে চাই না । শুধু জানাতে চাই। আপনি জানেন ,শুনেন, বুঝেন। নিজের জায়গা থেকে নয় , ভিকটিমের দিক হতে ভেবে দেখুন।নিজেকে ভিকটিম মনে করুন এবং আলোচনাই যাবার পূর্বে এটাই বলব আক্রমণাত্মক মতামত দেয়া থেকে বিরত থাকুন।
 
যায় হোক ম্যারিটাল রেইপ এর কথা বলছিলাম। এটা জানার আগে রেইপ কি সেটা জানা দরকার। রেপ/ধর্ষণ:একটা মানুষের শারীরিক ও মানসিক মতের বিরুদ্ধে তার যৌনাঙ্গ সমূহের জোরপূর্বক ব্যবহারই ধর্ষণ। যা এক ধরনের আগ্রাসন এবং সহিংস অপরাধ। এক্ষেত্রে কেবল নারীই নয় পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের কোন মানুষ ও ভিকটিম হতে পারে। তবে 99% ক্ষেত্রে পুরুষই ধর্ষকের ভূমিকায় থাকে। যায় হোক কথা না বাড়িয়ে চলে যাচ্ছি দাম্পত্য ধর্ষণ বা ম্যারিটাল রেপ এ। ম্যারিটাল রেপ বা দাম্পত্য ধর্ষণ: উপরের বর্ণনা হতে এটা অবশ্যই বুঝতে পেরেছেন যে রেপ কি। আর দাম্পত্য ধর্ষণ হল সেই ধর্ষণ যা বিবাহের পর স্বামীর দ্বারা স্ত্রীর হয়ে থাকে। ভারতবর্ষের ঐতিহ্যই বলা চলে পারিবারিক সূত্রে বিয়ে টা।বিয়ের পর একটা মেয়ের ফার্স্ট প্রায়োরিটি থাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়া মানুষটিকে জানা( সবার ক্ষেত্রে না)। কিন্তু স্বামী ঘরে ঢুকার পরই সব বদলে যায়। দুই একটা মিষ্টি কথা বলে অতঃপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বৌয়ের উপর। বাহরে বিয়ে করা বৌ না।
 
বাংলাদেশের চলচিত্রে এমন একটা ম্যারিটাল রেপ এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। শাকিব খান ও শাবনূর অভিনীত ছবি “আমার প্রাণের স্বামী”…সেখান থেকে শাকিবের বৌ শাবনূর , শাকিবকে আদালতে রেপিষ্ট হিসেবে একিউজ করে। নায়ক তখন পৃথিবীর সব স্বামীকে ধর্ষক আরো ব্লা ব্লা ডায়লগ দিয়ে নিজের জামিন নিজেই করিয়ে নেয়। এখানে সিনেমার কথা তুলেছি কেবল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে। নায়ক যখন বলল নিজের স্ত্রীকে কাছে পেতে চাওয়া যদি ধর্ষণ হয় তবে পৃথিবীর সকল স্বামী ধর্ষক, আদালতের বিচারক ও মানতে বাধ্য হল যে নায়ক ঠিক। স্বামী আবার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে নাকি?? যাইহোক বিয়ের পর স্বামী ভাবতে থাকে তার স্ত্রীর উপর তার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ রয়েছে।আর বিয়ে?? আমার মতে বিয়ে কেবল মাত্র সামাজিক ও ধর্মীয় চুক্তিই নয়, এটা স্বামীর ইচ্ছেমত স্ত্রীকে ভোগ করার এক সার্টিফাইড লাইসেন্স।এধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে বহু দেশে। পশ্চিমা দেশগুলোতে মেনে নিতে শুরু করেছে ম্যারিটাল রেপ এর ব্যাপারটি। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার শারীরিক মিলন রেপ হতে পারে এটা মেনে নিতে আমাদের কোথাও যেন বাধে।
 
ম্যারিটাল রেপ অপরিচিত শব্দ না হলেও একটি অনুচ্চারিত শব্দ। এর পেছনে কাজ করছে সামাজিক অবকাঠামো ও সমাজ ব্যবস্থা। ধর্মীয় অনুশাসন কখনোই ম্যারিটাল রেপ সাপোর্ট করে না। ইসলাম ধর্মে পবিত্র কোরআন শরীফে সূরা বাকারার ২২৩ নং আয়াতের স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে- তোমাদের স্ত্রীরা হলো তোমাদের জন্য শস্যক্ষেত্র। অতএব তোমরা তোমাদের শস্য-ক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা গমন কর। হঠাৎ করে দেখলে মনে হতে পারে যে এখানে বলা হয়েছে স্বামীর আদেশ পালনে স্ত্রী বাধ্য। স্ত্রীর মতামতের কোন ভিত্তি নেই। আসলেই কি তাই??না। এ ব্যাপারে হাদীস যা বলে- যদি কোন স্বামী তার স্ত্রীকে বিছানায় ডাকে (যেমন- সঙ্গম করার জন্য), আর সে প্রত্যাখান করে ও তাকে রাগান্বিত অবস্থায় ঘুমাতে বাধ্য করে, ফেরেশতারা সকাল পর্যন্ত তাকে অভিশাপ করতে থাকে।[বুখারি, ইংরেজি অনুবাদ ভলি- ৪/বুক-৫৪/৪৬০] একটু ভালো করে লক্ষ্য করুন, স্ত্রী স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়ায় স্বামী রাগ করে কী করছে? স্ত্রীর ওপর জোর-জবরদস্তি করে নিজের যৌন অধিকার আদায় করে নিচ্ছে?নাকি ঘুমিয়ে পড়েছে? এই হাদিসে নারী কর্তৃক স্বামীর ডাকে সাড়া না দেওয়ার কারণে স্ত্রীর সমালোচনা করা হলেও পুরুষকে কিন্তু জোর-জবরদস্তি করে নিজ অধিকার আদায়ে উৎসাহিত করা হচ্ছে না। আবার স্ত্রী যদি অসুস্থতা বা অন্য কোন সঙ্গত সমস্যার কারণে যৌনাচার হতে বিরত থাকতে চান, তবে তিনি কিছুতেই এই সমালোচনার যোগ্য হবেন না, কেননা ইসলামের একটি সর্বস্বীকৃত নীতি হচ্ছে: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না [২:২৮৬] কেবল ইসলাম ধর্ম বললে ভুল হবে হিন্দু বা সনাতন ধর্মেও অন্যের উপর বল প্রয়োগে বাধা প্রধান করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মে সনাতনি বা চিরন্তন কর্তব্যের কথা যেমন সততা, অহিংসা, ধৈর্যশীলতা, সমবেদনা ও আত্মনিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি আরো অনেক কথা বলে। এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণ বলতে ষড় রিপুকে নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছে যার মধ্যে কাম ও রয়েছে এবং তা নিজের বিবাহিত স্ত্রীর উপর ও প্রযোজ্য।
 
অন্যান্য ধর্ম যেমন বৌদ্ধ বা খিস্টান ধর্মেও অন্যকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে তার উপর বল প্রয়োগের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মূলত এখানে ম্যারিটাল রেপ বা দাম্পত্য ধর্ষণ মেনে না নেয়া বা আড়চোখে দেখার প্রধান কারণ দাঁড়াচ্ছে সামাজিক ব্যবস্থা ,সামাজিক অবকাঠামো এবং ধর্মীয় অনুশাসন বিকৃত করে তা উপস্থাপন করা। এখানে নারীকে পারিবারিক চাপ অথবা অন্য উপায় না থাকার ফলে বছরের পর বছর বাস করতে হয় ‘স্বামী’ নামের ধর্ষকের সঙ্গে৷ একবার নয়, হয়ত প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহে ধর্ষণ হয় তার৷ লোকলজ্জার ভয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে পারে না সে৷ তাই বয়ে বেড়াতে হয় যৌন রোগ, ক্ষত বা মানসিক অসুখ৷ তাই কোনো নারীকে যদি প্রশ্ন করেন – আপনার স্বামী কি আপনাকে ধর্ষণ করছেন? – তাহলে বেশিরভাগ নারীই এক হয় চুপ হয়ে যাবে কিংবা পড়ে যাবে চিন্তায়৷ আর কেউ যদি সাহস করে সত্যটা বলেও ফেলে, তাহলে তার ভবিষ্যৎ কী? কে দেবে তাকে পুনর্বাসন, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ? পরিবার? রাষ্ট্র? ধর্ম? কেউ না৷ আর সে জন্যই ধর্ষক স্বামীরা আজও বুক ফুলিয়ে হাঁটে আর মেয়েরা পুতুল খেলতে খেলতে মুখ বন্ধ করে ‘ধর্ষিতা’ হন!

About The Author
Arman Siddique
Arman Siddique