সমসাময়িক চিন্তা

“আস্তে আস্তে চুমা দিও, কামড় দিও না !!” – একজন ‘আরজে ট্যায’ এবং বাংলাদেশে অপসংস্কৃতি

নিজের বিবেকবোধ থেকেই এই লেখাটা লিখছি।

সময় এখন অগ্রগতির, বিশ্বের অন্যন্য দেশের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাবার, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি বা আমি বাংলাদেশ কিংবা নিজের দেশে বসে নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে, নিজের ভাষাকে ছোট করে নিজেকে পশ্চিমা ঢঙ্গে সঙ সেজে উপস্থাপন করবো।

বিশ্বাস করুন, একজন বাংলাদেশী হিসেবে নিজের কাছেই আমার লজ্জা করে, কি করে কিছু মানুষ আজকাল সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য নিজেকে উজার করে দিচ্ছে ? কি করে নিজের এরা নিজের দেশ, নিজের সংস্কৃতি, মাতৃভাষাকে ছোট করে যাচ্ছে? আচ্ছা এরা কি সত্যই বাংলাদেশী? এরা কি নিজের দেশের ইতিহাস জানেনা? ৫২ এর ভাষা আন্দোলন কিংবা ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ – এসবের কিছুই কি তারা জানেনা? নাকি দেশদ্রোহী কোনো রাজাকারের স্পার্ম থেকে এদের জন্ম? কি খুব বেশি বলে ফেললাম? বেশি বললে ফেললেও আমি দুঃখিত হতে পারছিনা বলেই দুঃখিত !!

হ্যাঁ, আজকের এই লেখাতে আমি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট নারী পর্ণোগ্রাফিক স্টাইলিশ আরজে  কিংবা রেডিও জকির কথা বলছি। তিনি আর কেউ নন, তিনি আমাদের আরজে ট্যায। বাংলায় উচ্চারন তাজ হলেও ইংরেজি উচ্চারণে মুখশ্রী বাকিঁয়ে তিনি ট্যায উচ্চারণ করেন। বাহ! নাম নিয়েও কত ভন্ডামী রে বাবা!!

আচ্ছা, রেডিও জকি কি জানেন তো? রেডিও চ্যানেলে যিনি মাইক্রোফোনের সামনে অনর্গল কথা বলে যান তার শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে এই আরজে ট্যায একটু ব্যতিক্রমী বটে।  তার ব্যপারে  যতদূর জেনেছি সে রেডিও স্পাইস নামক একটি এফ এম চ্যানেলে জকিগিরি করে। আর সেই চ্যানেলের সেই সিইও।  এখন কথা হলো, তাকে মানুষ তো চিনেনা, কিভাবে চেনানো যায়? কিভাবে জনপ্রিয় হওয়া যায় সেই উপায় হিসেবেই তার ফেসবুকে আগমন।

ব্যস! ফেসবুকে এসেই বাজিমাত!

রেডিওতে মানুষ কথা শোনে, মুখ দেখেনা, কিন্তু ট্যায এর বেলায় ভিন্ন কথা। তিনি ভিডিও করে আপলোড দিতে লাগলেন, ফেসবুক লাইভে আসতে লাগলেন বর্তমান সময়ের আরো কিছু সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়া ইউটিউবার আর শিল্পীকে নিয়ে।  নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর এইতো সুযোগ।

সে টার্গেট করলো যুব সমাজকে।  কারণ এদেরকে আকর্ষণ করতে পারলেই নিজের প্লান সাকসেসফুল। হ্যাঁ ঠিক তাই হলো।

পশ্চিমা পোশাক বা খোলামেলা পোশাকে হাজির হয়ে নিজের শরীর দেখিয়ে ডিজিটালি নগ্নতার বহিঃপ্রকাশ।  আমার ভাবতেও অবাক লাগে ,  একজন বাংলাদেশী হয়ে বাঙালী মেয়ে হয়ে সে কিভাবে এত নিচে নামতে পারে! তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গিই বলে দেয় সে কোন স্তরের খ্যাত। আরে ভাই, যে শাড়ি পড়েও শালীনভাবে চলতে পারে ,সে খ্যাত না রে! এই অসভ্যগুলোই খ্যাত যারা শরীরে পোশাক পেচিঁয়ে রাখতে জানেনা। ট্যায ম্যাডাম থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে গিয়ে ভিডিও আপলোড দিলেন যেখানে শরীরের উপরিভাগ নেটের কাপড়ের নিচে ভাসছে। বাহ! এই হলো আধুনিকতা। নতুন করে আধুনিকতার সঙ্গা আমাকে শিখতে হবে বলে মনে হচ্ছে।

তার পোশাক নিয়ে আর কিছুই বলতে চাচ্ছিনা।   এইবার আসি একটু ভিন্ন বিষয়ে। আচ্ছা, এই মহিলা কি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক? আই মিন, আমি একটু ভিন্ন কিছু বোঝাতে চাচ্ছি। দুঃখিত, আমি  কি বোঝাবো নতুন করে, সেই তো আরেক খ্যাত সস্তা মডেল আম্ব্রিন এর সাথে লাইভে এসে যা দেখিয়ে গেল বাংলাদেশকে…! দেশে বোধহয় এই প্রথম কোনো মেয়ে নির্লজ্জ বেহায়াপনার মত আরেকটি মেয়ের গালে বিশ্রীভাবে চুমু দিয়ে প্রমাণ করে দিল যে সে আসলে একটা লেসবিয়ান। এইটা আমার কথা না, সারা বাংলাদেশের মানুষ যারা সেই ভিডিও দেখেছে তাদের কথা।  ওহ আরেকটা কথা, কানে কানে বলি, ঐটা আমিও দেখেছি, তাই বলছি কি, ট্যায আসলেই মনে হয় একটা লেসবো!!

পৌষ সংক্রান্তি নিয়ে ছোট একটা ভিডিও আছে, যেখানে তার বাংলা শুনলে মনে হয়, একটা প্লের বাচ্চাও তার থেকে ভালো বাংলা বলতে পারে।  এছাড়াও কুয়াকাটার একটা ভিডিও দেখলে মনে হয়, সে আমাদের দেশে হিন্দি গানকে প্রমোট করছে।  অবাক লাগে, আমার কান্না আসে যখন দেখি এই মেয়ের মত আমাদের দেশে হাজারো লক্ষ মানুষ আছে যারা কিনা নিজের দেশের নিজের ভাষার গান শোনা বাদ দিয়ে হিন্দি উর্দু গানে মজে আছে।  তাদেরকে বললে বলে , বাল! বাংলা গান শোনে কে? তারা নাকি হিন্দিতে ফিলিংস পায়, জানিনা তারা কিসের ফিলিংস পায়, তবে এইটুকু বুঝি তারা মানসিক বিকারগ্রস্ত। তাদের বাবা-মা তাদেরকে দেশকে সেভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে পারেনি বোধহয়।

পহেলা বৈশাখে তার ও তার সাথীদের নিয়ে তৈরী করা ভিডিওতে তার নাচটা দেখে মনে হল, তিনি পঙ্গু ছিলেন, সুস্থ হয়ে মাত্র বিছানা থেকে উঠে এসেছেন! হায়রে! বাঙালী হয়েও তোরা পঙ্গুই থেকে যাবি।

আবার আসি ট্যায আপার কথায়,  আপার অনুষ্ঠান যদি ২ ঘন্টার হয়ে থাকে, তবে সেখানে ১ ঘন্টা ৫০ মিনিট ইংরেজি চলে। বাকি ১০ মিনিট বাংলিশ। শুনতে গেলে দম আটকে আসে।  একবার সৌমিক রহমান আর সৌভিক রহমান নামে দুইজন ইউটিউবার অভিনেতাকে নিয়ে ভিডিও আপলোড করলো, সেখানে তাদের একজনকে ট্যায সেনশনাল বা স্পাইসি গান গাইতে বলছে; বাহ! কি যুগ রে ভাই? গান আবার স্পাইসিও হয় নাকি? এ তো পুরাই লুল!!

এভাবে বলতে গেলে আমার লেখা আমি শেষ করতে পারবো না।   তবে যে ব্যাপারটি নিয়ে সারা দেশে সোশ্যাল মিডিয়াতে ঝড় উঠেছিল, তা হল নতুন মডেল অভিনেত্রী শাহতাজ এর সাথে সেই গানঃ

“ফুল দিও কলি দিও কাঁটা দিও না!

আস্তে আস্তে  চুমা দিও, কামড় দিও না!”

সেই ভিডিও পুরো ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেল একদিনের মধ্যে।  সেখানে তার সেই অঙ্গভঙ্গি মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে এই আরজে আর যাইহোক, কোনো সুস্থ মানুষ না। অসুস্থ বলতে বলা হচ্ছে সে নেশাগ্রস্ত কিনা। তার ভিডিওর অনেক কমেন্টে দেখলাম, “এ কি নেশা টেশা করে নাকি?” এই টাইপের কমেন্ট। শাহতাজ সেই ভিডিওতে ইতস্তত বোধ করছিল। ট্যায অবশ্য তাকে কিভাবে বুকের উপর দিয়ে হাত নাচিয়ে নিচে নামিয়ে এনে আবার উপরে আনতে সেই প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলো।

বর্তমান সময়ের কিছু খ্যাত তার অনুষ্ঠানে নিয়মিত আসা যাওয়া করে।  তাদের দ্বারা নিজের প্রচার। আই মিন, খ্যাত রা তো খ্যাতদের দিয়েই পরিচিত হবে তাইনা? ছোট আজাদ নামক একজন ইউটিউবার এর সাথে ভিডিওতে আরজে ট্যায তার বুক ডাউন শো এর মাধ্যমে দর্শকদের এটাই জানিয়েছে যে সে বুক বা শারীরিক কসরতে খুব বেশি অভিজ্ঞ।

র‌্যাপার প্রিতম যে কিনা সুকান্তের আঠারো বছর বয়স গানটার বারোটা বাজিয়ে ছেড়েছে, মডেল টয়া যে কিনা মেয়েদের বাইরে গেলে কনডম নিয়ে বেরোতে বলে , জালালি সেট নামক র‌্যাপার যারা বাংলায় র‌্যাপ করে গালি দিতে ওস্তাদ সাথে র‌্যাপকেও রেপ করে ছাড়ছে, জাকিলাভ নামক ইউটিউবার যে কিনা ইউটিউব কে পর্ণটিউব বানাতে ব্যস্ত, সালমান মুক্তাদির সহ আরো অনেকে যারা সত্যিই বাঙ্গালী কিনা বলে সন্দেহ করা হয়, ডিজে সনিকা যে কিনা তারই ধাচের – এমন ক্যাটাগরির কিছু মানুষ তার লাইভ বা প্রোগ্রামের নিয়মিত অতিথি।

আর এত কিছুর পরেও সবচাইতে অবাক লাগে যখন দেখি ফাহমিদা নবী, শাফিন আহমেদ, হাবিব ওয়াহিদ, সিয়াম আহমেদ (অভিনেতা), মেহেরীন এর মত শিল্পীরাও তার অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি আমি।

সর্বশেষে,

শহরের সবচাইতে হটেষ্ট এফ এম চ্যানেল  এবং আরজে ট্যায, আপনাকে বলছি,

আপনার এই অধিকার নেই যে আপনি লক্ষ শহীদের রক্তে কেনা এই বাংলাদেশের মাতৃভাষাকে ইচ্ছা মত ব্যবহার করবেন।  বাংলাদেশ একটা পশ্চিমা দেশ নয় যে আপনি ইচ্ছামত খোলামেলা পোশাক পড়বেন যেখানে আপনার শরীরের অধিকাংশই খোলা থাকে।  ফেসবুক শুধু এডাল্টদের স্থান নয় আর, এখানে কিশোর কিশোরীদের বিচরণ রয়েছে।  তারা তবে কি শিখবে? আরজে কে সম্মানজনক পেশা হিসেবে নেয়া যায়, তাহলে কি তারা এটা শিখবে যে আরজে হতে গেলে আপনার মত পোশাক পরিধান করা, ইংরেজি বাংলা মিলিয়ে কি আজব ভাষা বলা কিংবা কয়েকটা ছেলে ডেকে এনে হিন্দি কিংবা সুরসুরি দেয়া গানের সাথে শরীর দুলিয়ে নাচা? কেন, আপনি শালীন পোশাক পড়ে দেশপ্রেমের গান শোনাতে পারেন না? পারেন না একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের গান শোনাতে? পারেন না শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে রোল মডেল হতে যেখানে আমরা সবাই ১০০ টা কথা বললে ৫০টা ইংরেজি বলি?

আপনাকেই বা কি করে পুরোপুরি দোষ দিই বলেন? এই দেশে তো এখন সোজা পথে জনপ্রিয় হওয়া বেশ কঠিন। এখন তো বিটিভির যুগ নেই, মেধা থাকলেও মেধার মূল্য নেই। তাই বাঁকা পথে হাটঁতে চাই অনেকেই। আর দেশের মানুষের ভেতরেও অপসংস্কৃতি এমন ভাবে ঢুকে গেছে পার্শবর্তী দেশ ভারতের চ্যানেলগুলো চলার কারণে যে আপনাকে আমি শতভাগ দোষ দিতে পারছিনা। তবে যাই করেন, নিজের দেশ, দেশের ভাষাটাকে আর সংস্কৃতিটাকে এভাবে ছোট করবেন না।

আপনি কি জানেন না,  এই দেশ আমাদের মা, এই বাংলা ভাষা আমাদের প্রাণ, এগুলো আমাদের রক্তের সাথে মিশে আছে?

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

সেলফি আসক্তিঃ একটি মানসিক ব্যাধি?

Ferdous Sagar zFs

ওই চিনস আমারে?

SRA

পুলিশ বনাম ছাত্র

Mominul H Rakib

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy