Now Reading
“মা দিবস”- হুজুগের না আবেগের?



“মা দিবস”- হুজুগের না আবেগের?

“মা” দিবস গেল এইতো কিছুদিন আগে৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে অনেকের মা কে নিয়ে ছবি,পোষ্ট, স্টাটাস – মন্দ লাগছিলো না! একদিনের জন্য হলেও মা তার সন্তানদের সঙ্গ পাচ্ছেন; অনেকের বেলায় হোক না তা লোক দেখানো- তাই বা কম কিসে!

নিজে মা হবার পর বুঝতে পারি সন্তানদের সাথে কাটানো সময় গুলো কতোটা মুল্যবান৷ তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করি কবে আবার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে একসাথে সময় কাটাবো৷ এখনো বৃদ্ধাশ্রমে যাবার মতো বুড়িয়ে যাইনি, তাতেই বাচ্চাদের পাশে পেতে আকুল হয়ে থাকি; সেখানে বয়সের ভারে নিমজ্জিত, বাধ্য হয়ে অবসর প্রাপ্ত মা’দের সন্তানকে কাছে পাবার আকুলতা আমাকে ছুঁয়ে যায়৷ কিভাবে পারে একেকটা কুলাঙ্গার শ্রেনীর সন্তানরা তাদের মা’দের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে! কেউ কেউ তো আত্মীয় স্বজনদের কাছে পৌছে দেবার নাম করে অজানা অচেনা জায়গায় অসহায় মা কে ফেলে পালিয়ে যাবার মতো ন্যাক্কারজনক কাজ ও করে৷ কিভাবে পারে? কি ভেবে পারে? একবার ও কি শৈশবের কোন স্মৃতি ভেসে ওঠে না? ভালো করে তাকাই আমার ছোট্ট ছেলেটার মুখের দিকে৷ যখন ওর জীবনে আমার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে,সেও কি আমাকে কোন বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা হাতে ধরিয়ে দিবে? এখনই কি সাবধান হওয়া উচিৎ না আমার? যাদের কারনে নিজের ক্যারিয়ারকে প্যাকেট করে সযতনে ড্রয়ারের কোনে ফেলে রাখলাম, তাদের কাছ থেকেই তো সবচেয়ে বড় আঘাতটা পাবার কথা আমার৷ অন্তত আজকাল দুনিয়াদারির হালচাল তো সেইদিকটাই দেখাচ্ছে৷

আসলে সমস্যাটা কোথায়? একটা বিশেষ সময়ের পর কেন মা বাবার মূল্য ফুরিয়ে যাচ্ছে? কেন মনে হচ্ছে জীবনে আর ওদের কোনই দরকার নেই? সামাজিক মূল্যবোধের অভাব? বিবেকের দংশনের অভাব? সময়ের অভাব? মা তো মা৷ একটা মানুষের স্থান কি পারে আরেকটা মানুষ নিতে? বিশেষ করে মা’র মতো একজনের অভাব কি পৃথিবীর কোনও মানুষকে দিয়ে পূরন হবার মতো কিছু? অনেকে এজন্য জীবনের আরেক নারী চরিত্র “বৌ” কে দায়ী করে৷ আসলেই কি তাই? কিছু কিছু ক্ষেত্রে বৌ’দের অবদান যে থাকেনা তা নয়৷ তবে এমন কি হওয়া উচিত? সেই বৌটি ও তো একসময় মা হবে; সেই সন্তানদের কেন্দ্র করেই তার জীবনের একটা বিশাল সময় সেও তো পার করবে৷ নানান কষ্ট ;নানান ত্যাগ স্বীকার করে সেও তো তার সন্তানদের বড় করবে৷ তারপর? তারপর তার সন্তানের বিয়ের পর সেও একই রকম বোঝা হয়ে দাঁড়াবে তার সন্তানের কাছে? তাকেও কি সেই একই বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটানো লাগবে? এ কি এক চক্র? যা ঘুরেফিরে ফিরেঘুরে সেই এক ব্যাপার- অবহেলা৷ এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কি?

অনেকে বলবেন ব্যপারটা আধুনিকতার সাথে সম্পৃক্ত৷ আমি তাতে একমত নই৷ আমার শৈশবে এক চীনা গল্প পড়েছিলাম যাতে এক বাবার মাথায় ঝুড়িতে করে দাদীকে পাহাড়ে রেখে আসার কথা শুনে ছেলেটা বাবাকে বলেছিলো ফিরার পথে যেন মনে করে ঝুড়িটা নিয়ে আসে৷ কারন জানতে চাইলে বাচ্চাটা উত্তর দিয়েছিলো বড় হলে তো তারও বাবাকে পাহাড়ে রেখে আসতে গেলে ঝুড়িটার দরকার হবে৷ চৈনিক গল্পটার উৎপত্তি তারও আগের কোন যুগ থেকে৷ তার মানে ব্যাপারটা আধুনিক না; যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে৷ কারন টা তখনো হাতড়ে গেছে কিছু মানুষ, আজও হাতড়াচ্ছে৷ উত্তরটা আজও অজানা৷ সন্তান বড় হলে মন মানসিকতার ,ব্যাক্তিত্বের পরিবর্তন ঘটে বলে সন্তানের হয়তো মা’কে নিয়ে অনুভূতির পরিবর্তন আসে; মা’র কি আসে? মা তো আমৃত্যু নিজের আগে সন্তানের কথাই ভেবে যাবে৷ আহ্ মা জাত! একটু কেন স্বার্থপর হতে পারে না? একটু কেন শক্ত হতে পারেনা একথা ভেবে যে , “ঠিক আছে, আমাকে তোমার দরকার নেই যখন তোমাকেও আমার কোন দরকার নেই৷ তুমি তোমার রাস্তা মাপো, আমি আমার রাস্তা মাপছি৷” আমি মা৷ আমি জানি পৃথিবীর কোন মায়ের এতো শক্তি নাই যে এভাবে ভাববে, বলবে! অভিমান করে হয়তো এক কি দুইদিন দুরে থাকবে , কথা বলা বন্ধ রাখবে৷ তারপর যেই লাউ সেই কদু৷ মাঝখান থেকে আমরা আধুনিকতার দোহাই দিবো, আর্থিক অসচ্ছলতার কারন দর্শাবো, আরও যে কাকে কাকে দোষ দিবো তার ইয়াত্তা নাই৷ তবু একবার মনের ভুলেও আয়নার সামনে নিজেকে দাঁড় করাবোনা! একবারও নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করবোনা আমরা কোনও সুশীল সন্তানরাই৷ কেন করবো? দোষ দিবো বাড়ির বৌদের৷ একসাথে থাকতে পারলে কি আর বৃদ্ধাশ্রমের খোঁজ করতে হতো? – আক্ষেপ এক সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানের৷ কেন থাকা গেলো না? এই প্রশ্নের অবশ্য সদুত্তর মেলেনি৷

সন্তানরা যদি নিজেদের বেলায় স্বচ্ছ থেকে এক এক সম্পর্ক কে সুন্দরভাবে মানিয়ে চলে; আমার মনে হয় সমস্যাটা অনেকাংশে মিটে যাবে৷ কোন বৌ যেমন কারো মা’র জায়গাটা নিতে পারেনা; তেমনি কোন মা ও পারেনা কোন বৌ’র জায়গা নিতে৷ যার যার জায়গা, যার যার সম্পর্ক তার তার হওয়া উচিৎ৷ এক্ষেত্রে সেই সন্তানকে একপেশে আচরন না করে হতে হবে বাস্তবমুখী৷ একটা সম্পর্কের জন্য যেন কোনভাবে আরেকটা সম্পর্ক নষ্ট না হয়, সেটা ঠিক রাখা টা কি আসলেই খুব কঠিন কাজ? মা কে সময় দিলে যদি বৌ নামক মানুষ গুলোর মুখ কালো হয় তাহলে সেই মানুষ গুলোর মনুষ্যত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে বৈকি৷ সেই কালো মুখ গুলো সাদা করার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে যদি মা কেই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হয় তবে সেই সন্তানের ব্যাক্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক৷ মা জাত টা তবু তার সন্তানদের দোষ খুঁজবেন না৷ খুঁজবেন তার সন্তানের কোথাও সমস্যা হলো কিনা সেসব দিকটা! আহ্ মা জাত! আমি কি এখনই সাবধানী হয়ে যাবো? এখনই কি খুঁজে রাখবো কোন ভালো বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা? যেখানে ভবিষ্যতের কোন এক মা দিবসে অনেক আয়োজন করে আমার সন্তানরাও আসবে আমার সাথে শুভেচ্ছা জানাতে, সেলফি তুলতে৷ তারপর দিন শেষে আমি আবার অপেক্ষা করবো আগামী বছরের মা দিবসটার জন্য৷

About The Author
nasrin shahid