দেশপ্রেম

স্মৃতি

নদীর তীরটায় বসে স্টিমারগুলোর যাওয়া আসা নিরিক্ষন করছি মনোযোগ সহকারে ৷ মেয়েটা কখন এসে পাশে বসলো টেরই পাইনি ৷ পাশ ফিরতেই চমকে উঠলাম,
> তুমি এখানে? (আমি)
> সেতো দেখতেই পাচ্ছো
> এত যায়গা থাকতে আমার পাশেই বসতে হলো?
> আমার ইচ্ছা, কোন সমস্যা?
> না, তোমার যেখানে মন চায় বসো, দাড়াও, শুয়ে গড়াগড়ি খাও, আমি যাই…
বলে উঠতে যাবো, মেঘা হাত টেনে ধরে বসালো আবার ৷ হ্যা, মেয়েটার নাম মেঘা ৷ আমরা পরষ্পর ক্লাসমেট ৷ ক্লাসের সেরা সুন্দরীদের মধ্যে মেঘাও একজন ৷ আর আমি প্রিতম, বলা যায় ক্লাসের সবচেয়ে নির্বাক ছেলেটা ৷ ক্লাস ওফ থাকলে সবাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, আর আমি একা একা বসে থাকি, এত শোরগোল আমার ভাললাগেনা ৷ প্রকৃতির সাথে নিরব বন্ধুত্ব ওরা বুঝবে না ৷
কিছুদিন ধরে যেখানেই যাই, মেঘা সেখানে গিয়ে আমার সাথে প্রকৃতির বন্ধুত্ব ফাটল ধরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ৷ বিরক্তি লাগে, সেটা বোঝার চেষ্টাই করে না ৷
> ওই, কি ভাবছো? (মেঘা)
> তোমার কথা (বলে ভাবলাম, কি বললাম?)
> তাহলে ভাবো, মন দিয়ে ভাবো
> আমি আসলে ভাবছিলাম, তুমি আমায় এভাবে বিরক্ত করে কি মজা পাও?
> খুব বিরক্ত করি?
> আমার একা থাকতেই ভাল লাগে ৷ তুমি বুঝতে চাওনা কেন সেটা?
> আমি আমার উত্তর পাইনি
> কোনটার?
> খুব বিরক্ত করি?
> হ্যা (কঠোর ভাবে বললাম)
মেঘা আমার দিকে করুনভাবে তাকালো কিছুক্ষন, তারপর উঠে চলে গেল ৷
কেমন যেন একটু খারাপ লাগলো ৷ একটু ভাল করেও নিষেধ করে দিতে পারতাম ৷ না, সরি বলা দরকার ৷ কিন্তু তারপর থেকে এই তিনদিন কলেজেই আসলোনা মেঘা ৷ ওর এক বান্ধবীর থেকে বাসার ঠিকানা নিয়ে কলেজ শেষে ওর বাসায় গেলাম ৷ কলিংবেল চাপতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলল,
> কে? (মহিলা)
> আন্টি আমি প্রিতম, মেঘার ক্লাসমেট
> ওহ, আমি মেঘার মা ৷ আসো, ভেতরে আসো
আমাকে বসতে বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন ৷ কিছুক্ষণ পর মেঘা আসলো ৷ নিরবে দাড়িয়ে আছে দেখে বললাম,
> সরি মেঘা, আমার ঐদিন ওভাবে বলা উচিত হয়নি
> (নিরব)
> কিছু বলবে না?
> ইটস্ ওকে
> হুম, তাহলে আজ আসি
> মা তোমার জন্য নাস্তা আনছে, একটু পরে যাও ৷ চলো তোমায় চারদিকটা ঘুরিয়ে দেখাই ৷
> ঠিক আছে
মেঘাদের বাড়িটা অনেক বড়, অনেকগুলো রুম ৷ কিন্তু মানুষ মাত্র তিনজন ৷ মেঘার রুমটাও দেখলাম ৷ বেশ সাজানো গোছানো ৷ হটাৎ মেঘার মায়ের ডাকে মেঘা আমাকে ওর রুমে বসতে বলে চলে গেল ৷ আমি বসে বসে ওর বইখাতা নাড়াচাড়া করতে লাগলাম ৷ টেবিলের উপর একটা খোলা ডায়রি দেখলাম ৷ লিখতে লিখতেই রেখে গেছে কেউ ৷ নিয়ে পড়তে লাগলাম ৷ কিছুক্ষন পর মেঘা আসলো ৷ আমার হাতে ওর ডায়রিটা দেখে কেমন যেন চুপসে গেলো ৷
> তুমি আমার ডায়রি পড়ছো কেন? (মেঘা)
> এতদুর ভাবার আগে তোমার আমার সম্পর্কে ভাল করে জেনে নেওয়া উচিত ছিল
> সেজন্যই তো কখনো দাবি করিনি (মেঘা)
> আমি যখন গ্রামে থাকতাম, আমার একটা খেলার সাথী ছিল, প্রেমা ৷ আমাদের অজান্তে ছোটবেলা থেকে আমাদের বিয়ের কথাও হয়ে ছিল আমাদের বাবা মার মধ্যে ৷ সারাদিনই একসাথে কাটতো আমাদের ৷ কিন্তু মাধ্যমিক শেষের পথে এক এক্সিডেন্টে ওর বাবা মা দুজনেই মারা যায় ৷ আর ওকে ওর মামা বিদেশে নিয় যায় তার কাছে ৷ ও চলে যাওয়ার পরই আমার জীবনে ওর অস্তিত্বটা বুঝতে পারি ৷ ভালবাসা কি যখন একটু একটু বুঝতে শিখলাম, তখন বুঝলাম আমি ওকে ভালবাসি ৷ পরে মার থেকেই জানলাম যে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ৷
> এখন সে কোথায়? (মেঘা কাঁপা গলায় বলল)
> জানিনা, চেষ্টা করেছি অনেক, কিন্তু ওর কোন খোজ পাইনি এখনো
> যদি কখনো খুজে না পাও?
> জানিনা
> প্রিতম, যদি কখনো তাকে ফিরে পাও, আমি তোমাদের মাঝে বাঁধা হবোনা কখনই
মেঘার দিকে তাকালাম ৷ কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে ৷ আমি কিছু না বলে বেরিয়ে আসলাম ৷ সেদিনের পর থেকে মেঘার সাথে টুকটাক ভালো মন্দ কথা হতে থাকে ৷ যত দিন যায়, তা বাড়তেই থাকে ৷ মেঘার কেয়ার নেওয়া, নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবেসে যাওয়ার কাছে আমিও যেন দুর্বল হয়ে পড়ি ৷ তবু প্রেমাকে শেষ বারের মত একবার খোজার দাবি মেঘা ফিরিয়ে দেয় না ৷ কিন্তু এবারও কোন সন্ধান করতে পারলাম না ৷ পড়াশুনা শেষ করে একটা বেসরকারি কোম্পানীতে জয়েন করেছি ৷ বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে, তাই মাকে মেঘার কথা বললাম ৷ তারপর পারিবারিকভাবেই আমাদের বিয়ে হলো ৷ বিয়ের তিন বছর হয়ে গেছে ৷ হ্যা, সূখেই আছি আমি ৷ আজ আরও একটা সুখের দিন ৷ আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়তে চলেছে ৷ কিছুক্ষণ পর নার্স এসে জানালো,
> কনগ্রাচুলেশান, আপনার মেয়ে হয়েছে
> আমি কি এখন ভেতরে যেতে পারি? (আমি)
> আজ যেতে পারবেন না
> কেন?
> অনেক কষ্টে আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো গেছে ৷ ডাক্তার আপা না থাকলে ওনাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না ৷ কাল পর্যন্ত ওনার কাছে যেতে পারবেন না
> ওহ, কোন ডাক্তার আপা?
> আসুন, ওনার কেবিন দেখিয়ে দিচ্ছি
> চলুন
নার্স কেবিন দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল
> আসতে পারি? (আমি)
> আসুন
> আমি মেঘার হাসবেন্ড
> ওহ, কনগ্রাচুলেশন
> থ্যাংক ইউ, কিন্তু আমাকে ভেতরে যেতে দিচ্ছে না
> কালকের আগে যেতে পারবেন না ৷ আর দুজনেই এখন বিপদমুক্ত ৷ চিন্তার কিছু নেই
> অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, আসি
> ওকে
উঠতে যাবো, তখনি চোখ আটকে গেলো টেবিলের উপরের নেমপ্লেটে প্রেমার নাম দেখে ৷ এবার ভাল করে তাকালাম ওনার দিকে ৷ ঘাড়ের কাছে কাটা দাগ দেখে চিনতে ভুল হলো না যে এই আমার সেই প্রেমা ৷ কি বলবো ভেবে পেলাম না ৷ নিরবেই বেরিয়ে আসলাম ৷ সাজানো জীবনটা যেন এক মুহুর্তেই এলোমেলো হয়ে গেলো ৷ দুদিনের মধ্যে আর একবারও প্রেমার সামনে গেলাম না ৷ আজ মেঘাকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি ৷ মেঘাকে গাড়িতে বসিয়ে আমি প্রেমার কেবিনে আসলাম ৷ প্রেমা জানলার পাশে দাড়িয়ে ছিল ৷ পায়ের শব্দ পেয়ে আমার দিকে তাকিয় বলল,
> কিছু বলবে? (নির্বিকার ভাবে বলল)
তুমি বলায় অবাক হয়ে তাকাতে দেখে বলল,
> তুমি আমায় চিনতে পারো, আর আমি তোমায় চিনবো না, এটা কেমন করে ভাবলে
> (নিরব)
> কেমন আছো?
> ভালই (গলাটা ধরে আসছে)
> মেঘাকে অনেক ভালবাসো, তাই না?
> হুম, বিয়ে করেছ?
> খুজে পাইনি যে তোমায়
> আমিও খুজতে কম করিনি, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে
> হুম, সে দাবিও নেই আমার ৷ তবে একটা অনুরোধ রাখবে
> বলো
> মেয়ের নাম প্রেমা রাখবে?
> হুম
প্রেমা আবার জানলার দিকে ফিরে দাড়ালো ৷ আমি কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বেরিয়ে আসলাম ৷ চোখটা ভেজা অনুভব করলাম ৷ তাই মেঘার চোখে পড়ার আগেই মুছে নিলাম ৷ গাড়িতে উঠলাম ৷ মেয়েটাকে কোলে নিলাম ৷ ওর পলকহীন চোখজোড়া তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আর আমিও ৷ গাড়ি ছুটে চলেছে দুপাশের অতীতকে পেছনে রেখা, ছুটছে আপন ঠিকানায়, জীবনের শেষ ঠিকানায়…….

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

বাঙালীর শেকড় সন্ধান

MP Comrade

আমি “তাদের” মতো হতে চাই।

nasrin shahid

ঠিক কি কারনে বাঙালি জাতি ৭মার্চের ভাষণে উত্থাল হয়েছিল?

MP Comrade

Login

Do not have an account ? Register here
X

Register

%d bloggers like this: