Now Reading
A Race To GPA5



A Race To GPA5

একবিংশ শতাব্দীর এসময়ে এসে একটা দেশ ও জাতির কল্যাণের অন্যতম মাধ্যম যেমন শিক্ষা তেমনি উন্নতির অন্তরায় এই শিক্ষার স্বল্পতা।কোন দেশের ধারণক্ষমতার বাইরের জনগণ যখন তার উপযোগিতা দেশ বা সমাজের কল্যাণে দিতে পারেনা,তখনই এই জনসমষ্টি উপযোগহীন বোঝা বনে যায়।আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে সভ্যতার উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের চলতে হলে অবশ্যই যুগোপযোগী শিক্ষাপদ্ধতি দরকার।নেপোলিয়নের এক বিখ্যাত উক্তি আছে যেখানে আমরা উপজীব্য হিসেবে পাই —একজন শিক্ষিত মা শিক্ষিত জাতি গঠনের রুপকার হতে পারেন।এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন বা তার উপযোগিতা পেতে একটা দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ জরুরী নারীদের জন্য যারা কিনা ভবিষ্যতে আগত প্রজন্মের ধারক হিসেবে বিবেচ্য হবে।সরকার বা তৎসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই কাজে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেছে কেননা এখন আমরা প্রতিটা ঘরে একজন স্বশিক্ষিত মায়ের ‍উপস্থিতি লক্ষ্য করতে পারছি।এই বিষয়টা আমাদের উন্নয়ন ধাপে এগিয় যাওয়ার একটা সবুজ সংকেত বটে।আমাদের সময়ে মায়েদের গন্ডি অনেক সীমাবদ্ধ ছিল কেননা চাইলেও তাঁরা আমাদেরকে শিক্ষা বিষয়ে উপযুক্ত নির্দেশনা দিতে পারতো না,এই বিষয়টা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হতো কেননা আমাদের মায়েরা সময়ের পরিবর্তনের সাথে নিজেদের তেমনভাবে মেলে ধরতে পারে নি।

এই যুগের মায়েরা তাদের কোমলমতি সন্তানের সাথে একটা অলিখিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যায়।অনেকাংশে দেখা যায় সন্তানের চেয়ে মা-বাবারা আরো বেশি সোচ্চার।এই যত্নের বাহ্যিকতা তার কারণে কোমলমতি শিশুর সক্ষমতা অবশ্য ঢাকা পড়ে।

৯০দশকে বেড়ে উঠা শিক্ষার্থীরা অনেকটা ভাগ্যবান কেননা তাঁরা এই ধরনের প্রতিযোগিতার আঁছ গায়ে লাগার আগে নিজেকে অনেকটা গুছিয়ে নিয়েছে।

১৯৯১-২০০০ এইসময়  শিক্ষা ব্যবস্থায় অগ্রগতি বা শিক্ষার্থীর যে সফলতা তা নিছক তার একান্ত অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল।এখানে বাবা-মা কেবল শুভাকাঙ্খী ছিল বটে।আধুনিকতার মোড়কে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার বাহন যখন একমাত্র শিক্ষা তখনই কোন এক অজানা কারণে এই লেখাপড়াসংক্রান্ত যাবতীয় সফলতার কৃতিত্ব আমাদের আধুনিক বাবা মায়েরা তাদের আত্মসম্মানের বাহন হিসেবে নিয়ে নিয়েছে। লেখাপড়ায় আমরা শিক্ষার্থীদের সক্ষমতাকে গৌণ করে দেখতে শুরু করলাম।এইসকল শিক্ষার্থীদের যাবতীয় সফলতার ছো্ট-বড় যেকোন পদক্ষেপ বাবা মায়ের আত্মমর্যাদার মুকুটে যুক্ত হওয়ার একেকটা পালক।

এবিষয়টা কারো ইচ্ছা বা অনিচ্ছাস্বত্ত্বে জনপ্রিয় হয়ে গেল।আমরা জাতি হিসেবে অণুকরণের সংস্কৃতির সুনিপুণ একটা গুণ আমাদের মধ্যে বিদ্যমান।আমাদের সন্তানের সামনে একটা লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাদের একটা ম্যারাথনে নামিয়ে দিই।এই সময়ে ছেলেমেয়ের প্রতি ভালবাসার চেয়ে নিজের সমাজে ছেলেমেয়ের গুণকীর্তি নিয়ে দম্ভ করাই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়াই।

কোন কোন ক্ষেত্রে বাবা-মা ছেলের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে এমন বিবেচকের মত সিদ্ধান্ত দেয় যা কিনা চরম বিব্রতকর।এই ক্ষেত্রে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা যারপরণাই বিব্রত হয়,একটা সময় তারা নিজেদের ট্র্যাকে থাকতে পারে না ফলাফল ক্যারিয়ার নিয়ে একটা অগোছালো অবস্থার মধ্যে পড়ে।

বর্তমান সময়ে ছেলেমেয়ের উপর প্রথম তোপ শুরু হয় যখন সে কোন স্কুলে ভর্তি হবে তখনই তাকে একটা আর্দশ স্কুলে ভর্তি হতে হবে।শিক্ষার্থীর মানদন্ড নির্ধারণে স্কুল বড় একটা প্রভাবক! এটাই নীতিনির্ধারকরা আমাদের জন্য বেঁধে দিয়েছেন।এই স্নায়ুযুদ্ধের পরপরই যখনই একটু নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করবে তখনই তার সামনে হাজির হয় যোগ্যতা প্রমাণের বিশাল মঞ্চ যা কিনা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষা নামে পরিচিত।এই পরীক্ষায় আপনি কোনভাবে উতরে গেলে চলবে না কেননা এখানে মার্কশীটের পাশে দেখতে চাই জিপিএ 5। অভিভাবক মহলে সব বিষয়ে আশির উপরে নম্বর নিয়ে আসা শিক্ষার্থীরা গোল্ডেন জিপিএ র সম্মানে ভূষিত হন।এই বিষয়ে খোদ কর্তৃপক্ষ অবগত নই এমনও একটা গ্রেডিং যে থাকতে পারে,ভাবা যায় প্রতিযোগিতা কোথায় গিয়ে ঠেকছে।

প্রচলিত আছে বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছেলেমেয়ে পূরণ করবে এটাই স্বাভাবিক তবে এই স্বপ্নে ছেলের সক্ষমতার বিষয়টা গৌণ করে দেখা কোন অংশে শোভা পায় না।বাবা-মা তাদের স্বপ্নযাত্রায় সফল হতে ঘোড়সওয়ারী করে তাদের সন্তানকে ক্ষেত্রবিশেষে একটা মানসিক চাপে পরিণত হয় সন্তানের জন্য।

এখন মানুষ সবকিছুতে দ্রুততার সাথে সফলতা চাই তাই কোন একটা পদক্ষেপ হেলায় ছাড়তে রাজি না।আধুনিক মায়েদের একটা প্রবণতা যা কিনা সন্তানকে সব্যসাচী হতে হবে এটা একটা মনস্তাত্বিক চাপ বলা যায়।

আমরা বলিউডের হিট ছবি রাজকুমার হিরানি পরিচালিত থ্রি-ইডিয়টস কম বেশি সবাই দেখেছি যেখানে জন্মের সাথে সাথে ছেলের ক্যারিয়ার নির্ধারণ করে দিচ্ছে এমনটাই হচ্ছে আমাদের সমাজে।পরিবারের বাইরে গিয়ে সমাজের লোকজনও একজন নিতান্ত পক্ষে উপযোগিতা খুঁজতে কুন্ঠাবোধ করেনা।আপনি যখন জেএসসির গন্ডি পেরিয়ে এসএসসিতে এসে ভর্তি হবেন তখন বিষয় বা গ্রুপ নির্ধারণে কৌশলী হতেই হবে।আপনি এই স্টেজে চাইলে বিজ্ঞান,ব্যবসায় শিক্ষা বা মানবিক বিষয়ে কোন উদ্দেশ্য ছাড়া পড়তে পারবেন না।প্রকৃতপক্ষে লেখাপড়ার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন কেননা এখানে জানা বা নিজেকে প্রভাবিত করাটা মুখ্য না আপনি বিজ্ঞান বিষয়ে পড়ালেখা করবেন অদূর ভবিষ্যতে আপনাকে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে।আবার ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়লেন যেখানে বিবিএ বা এমবিএ পড়াটা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়তো আপনি ব্যর্থ আবার মানবিকে পড়ে আপনি পিছিয়ে থাকবেন কেন আপনাকে এলএলবির মতো বিষয়ে পড়তে হবে।

আপনার সক্ষমতা অনুযায়ী গ্রুপ নির্ধারণ আপনাকে প্রকারান্তরে একটা লম্বা দৌড়ের ট্র্যাকে নিয়ে যাচ্ছে।

বলিউডের প্রখ্যাত নির্মাতা রাজকুমার হিরানী তাঁর এক সাক্ষাতকারে বলেছিল থ্রি-ইডিয়টসের সফলতার পর অনেক প্রতিষ্ঠিত লোক এসে তাঁর কাছে আবার পরামর্শ চেয়েছে যারা কিনা এখন যে স্টেজে সফল সেখানে তাঁরা তৃপ্ত না।একটা অতৃপ্তির ঢেঁকুর প্রতিনিয়ত তাঁদের গিলতে হচ্ছে কেননা যখন তাদের গতিপথ নির্ধারণ করছিল তখন তারা সুযোগটা পাই নি।আমাদের বর্তমান সময়ে তদ্রুপ ঘটনা বা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি প্রতিনিয়ত হচ্ছে।একটা উদাহরণ টানা যেতে পারে — সরকারের শীর্ষস্থানীয় একজন কর্মকর্তা যিনি সচিব পদমর্যাদার অধিকারী তিনি এই বয়সে এসে বইমেলায় বই প্রকাশের পর আত্মতৃপ্তিতে ভোগেন।এই যে সাহিত্যকর্ম এই বিষয়ে একটা অনুরাগ উনার ছিল তাই যতক্ষণ না তা সম্পন্ন করতে পারছে না ততক্ষণ নিজের সাথে একটা অর্ন্তদ্বন্ধ ছিল বটে।

উচ্চ মাধ্যমিকের পর উচ্চশিক্ষার জন্য অনেকে স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নিজের স্বপ্নকে বলি দেয়,তাদের তখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দেয়া হয় না বরং মতামতের কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে।এই বিষয়টা দীর্ঘমেয়াদে একটা খারাপ পরিণতি ডেকে আনে। একজন ভাল শিল্পীসত্তার শিক্ষার্থী যদি কখনো প্রশাসনের কোন উচ্চপদে আসীন হয় তবে তার কাছে আমরা উপযোগিতার সর্বোচ্চ বিন্দু আশা করব সমীচিন নয়।

আমার এক পরিচিত এইচ.এস.সি পরীক্ষার্থী যে কিনা পরীক্ষা দেয়ার পর এখন প্রতিনিয়ত উৎকন্ঠায় ভুগছে কেননা তার সামনে দুটো লক্ষ্যমাত্রা ছুঁড়ে দেয়া হয়েছে কেননা তাকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে।পাশাপাশি তার একাডেমিক লেখাপড়ার বাইরে একটা গুণ আছে যে কিনা ভাল আঁকতে পারে।অদূর ভবিষ্যতে এই বিষয়ে স্বতন্ত্র ক্যারিয়ার গড়তে চাই যেটা কিনা তার ভালবাসার জায়গা জুড়ে আছে।এই কাজটা করতে তার ভাল লাগে ।তাই এই শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখা বা তার ভাললাগাকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁকে একজন শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারের এগিয়ে আসা উচিত।এই মুহুর্তে তার সবচেয়ে ভরসার মানুষ হবে তাঁরা।এই শিক্ষার্থী স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না,তার মনে শংকা ঢুকে গেছে যা তাকে রীতিমতো একটা দ্বন্ধের মধ্যে রেখেছে।পারিপার্শ্বিক লোকজন,আত্মীয় স্বজনের ভাষ্য ব্যবসায় শিক্ষায় পড়ালেখা করে তুমি যদি বিবিএ বা এমবিএ না কর তবে এই জীবন তো ষোলআনাই বৃথা।

এই চিত্র একটা পরিবারের হলেও সার্বিকভাবে এমন একটা অর্ন্তদ্বন্ধের মাঝে সবাইকে যেতে হই।অভিভাবকের অভীষ্ঠ লক্ষ্য সোনার হরিণ রুপী সেই জিপিএ 5 ।এই মানসিকতা বা প্রতিযোগিতা হতে সরে এসে নিজেদের স্বীয় গুণাবলির আলোকে একটা ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার যা কিনা ভবিষ্যতের বুনিয়াদ হবে বর্তমানকে সমৃদ্ধ করবে।

About The Author
Rajib Rudra
Comments
Leave a response

You must log in to post a comment