Now Reading
বাংলাদেশ ফুটবলের পরিক্রমা



বাংলাদেশ ফুটবলের পরিক্রমা

দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ — নামে পরিচিত বিশ্ব ফুটবলের মর্যাদার আসর ফুটবল বিশ্বকাপ।প্রতি চার বছর পর এই আসরে সারা বিশ্ব বুঁদ হয়ে থাকে। সারা বিশ্বের প্রায়ই ২০০ এর কাছাকাছি দেশ যারা কিনা প্রাথমিক পর্বে লড়াই করে মূল পর্বে টিকেট নিশ্চিত করতে।তাই দুবছর ধরে একটা মৃদু উন্মাদনা চলে ফুটবরপ্রেমীদের মাঝে।বাংলাদেশের ফুটবল এই সময় দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায় কেননা চিরপ্রতিদ্বন্ধী লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলে বিভক্ত দুই দেশ।বিশ্বকাপ ফুটবলের সাথে সম্পৃক্ততা বলতে আমাদের এইটুকুই।
উপমহাদেশীয় যে প্রতিযোগিতা তা টপকে মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বপ্ন অলীক স্বপ্নের মতো দেখায় কেননা আমরা এখনো প্রান্তিক পর্বে তেমন কোন সফলতা দেখাতে পারি নাই বললে চলে।আমাদের মূল দলের সফলতা বলতে কেবল সাফ গেমসের জয়।এটা সার্ক অঞ্চলের ফুটবলে খেলুড়ে দেশগুলোর মর্যাদার আসর বলে বিবেচিত।তাছাড়া এএফসি গেমস সহ আরো অনেক টুর্ণামেন্ট যেখানে আমরা নিজেদের উপস্থিতি তেমন উজ্বল করতে পারি নি।সমগ্র এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে এইসব প্রতিযোগিতায় জাপান,চীন,কোরিয়ার পাশাপাশি মধ্যেপ্রাচ্যর বেশ কয়েকটি দেশ ইরান,উজবেকিস্তান,সৌদি আরব,যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ ইরাক ও আফগানিস্তান যখন প্রতিযোগিতায় তাদের সক্ষমতার জানান দেয় তখন নিশ্চয়ই আমাদের সক্ষমতা নিয়ে ভাবা উচিত।
ফুটবল একটি দলগত প্রচেষ্ঠা কেননা এখানে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্ঠার ফসল একেকটি খেলার জয়। যে সকল দেশে জাতীয়তাবাদ ঠুনকো সেখানে ফুটবলের সফলতা গৌণ বলা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে ভারত তাদের অবস্থান সমুন্নত রাখতে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নিয়েছে তারই ফলাফল স্বরুপ তারা বিগত কয়েক বছর ধরে ফ্র্যাঞ্ছাইজি ভিত্তিক ফুটবলের আসর নিয়মিত করছে। যেটা কিনা অনেকটা ইংলিশ লীগ ও লা-লিগার আদলে গড়ে তোলেছে।এই লীগে তারা সম্পৃক্ত করেছে তারকা খ্যাতি সম্পন্ন মানুষ এবং ধনীদের যেখানে তারা এই ফুটবলের উন্নয়নের ছোঁয়া বিস্তৃত করতে কোন কমতি রাখে নি।এখানে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যের সাথে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না।
উন্মুক্ত স্যাটেলাইটের কল্যাণে আমরা এখন রাত বিরাতে বিদেশী ফুটবলের উন্মাদনায় নিজেরা শরিক হই।এই একই কারণে আমাদের আশার পারদ তরতর করে বেড়ে চলছে।দেশীয় লীগের কোন ম্যাচে ঘরোয়া ফুটবলারের ড্রিবলিং বা পাসিং আমাদের মন ভরায় না।এটা আমাদের দোষ না এই ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় আশাবাদী হওয়া ভুল বটে।কেননা আমি যদি দেশীয় ফুটবলের মামুনুল,জাহেদ,হেমন্ত ভিনসেন্ট এদের পারফরম্যান্সের তুলনা মেসি,রোনালদো নেইমারের পাল্লায় করি এটা আমাকে চরমভাবে হতাশ করবে।
আমাদের একটা বিষয় মানতে হবে ভৌগলিক পরিবেশ বা জাতিসত্তার কারণে আমরা সক্ষমতার দিক দিয়ে ইউরোপ,আমেরিকা ও আফ্রিকার মানুষের চেয়ে পিছিয়ে।এই পিছিয়ে থাকা মেনে নিয়ে সমস্ত দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যেতে পারি না। দিনবদলের পালায় সমস্ত কিছু পরিবর্তন হয় কেবল ফুটবলের ভাগ্য পরিবর্তন হয় এটা মানা যায় না। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কখনো সামগ্রিক ব্যর্থতা হতে পারে না।
এখন উন্নয়নের জয়রথে ফুটবলকে ঘিরে নবতর কৌশল আর প্রযুক্তির উদ্ভাবন হয়েছে আমরা কি আদৌ তার ‍উপযুক্ত ব্যবহার করেছি। শারীরিক সক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত হাই স্কোয়াড টিম গঠন করে যাদের কেবল আর্ন্তজাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সর্বশেষ আইএসএল এর মতো লীগে আমরা দেখি বিদেশী খেলোযাড়দের পাশাপাশি ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য। সেই তুলনায় দেশীয় ফুটবলে আমরা এখনো নিয়ম করে ঘরোয়া ফুটবলকে ঘোচাতে পারি নি।এটা অবশ্য কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কেননা প্রশাসনিক বা অবকাঠামোগত দিক দিয়ে ফুটবলে এখনো বিশৃঙ্খলা গত সপ্তাহে একটা লীগের ম্যাচে লাল কার্ড দেয়ার ঘটনায় ক্লাবের কর্তাস্থানীয় ব্যক্তি যদি বিবাদে জড়িয়ে পড়ে তাতে চরম মাত্রায় যে পেশাদারীত্বের অভাব তা প্রতীয়মান হয়। এই ফুটবলকে ক্রিকেটের সমমান না হোক বর্তমান অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য অবশ্যই সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
এই সময়ের ফুটবলপ্রেমীরা কোন অনুপ্রেরণা পাই না কেননা তারা সর্বশেষ কোন শিরোপা যা কিনা মর্যাদাপূর্ণ আসরের প্রতিনিধিত্ব করে, এমন কোন শিরোপা বাংলাদেশকে উঁচিয়ে ধরতে দেখে নি।
ফুটবলের পালাবদলে দেশে বিদেশী কোচের আসা যাওয়া আমরা দেখি নিয়ত তাদের ভাষ্য ট্যাকনিক্যাল বিষয়ে পারদর্শী হওয়া সম্ভব হলেও আমরা শারীরিক সক্ষমতা কাটিয়ে উঠতে পারছি না। এখন প্রশ্ন হলো এই অক্ষমতা কাটাতে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ কতখানি ফলদায়ক।যেখানে এশীয় অন্যদেশগুলো ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমরা অপরিবর্তিত রয়ে যাচ্ছি। এইক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন আমরা আন্তজার্তিক আসর থেকে প্রায়ই তিন বছরের জন্য ছিটকে গেছি যেটা কিনা আমাদের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
দেশীয় ফুটবলে গতি আনতে আমরা এখনো বিদেশী ভাড়া করা ফুটবলরারের উপর নির্ভরশীল। দেশীয় ফুটবলকে সুসংহত করতে একটা সময় উদ্যেগ নিয়েছিল বিদেশীদের জাতীয়তা প্রদান করে দল গঠনের যেটা কিনা অযৌক্তিক বটে।আমাদের সামনে আরো অনেক বিকল্প থাকা স্বত্ত্বেও আমরা কেন এমন পন্থার উপর দ্বারস্থ হবো।
ভারত বা শ্রীলংকার দলে অধিবাসী বা অভিবাসী দুই গোত্র থেকে লোকের সমাগম হয়।এখানে যোগ্যতাটা মুখ্য কেননা আমাদের অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়াতে আমরা প্রান্তিক স্তরের ফুটবলার পাচ্ছি না।আমাদের দেশীয় সুযোগ সুবিধার মধ্যে বসবাস করছে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী যারা কিনা রাষ্ট্র প্রদত্ত সকল সুবিধা ভোগ করছে তবে কেন তাদেরকে উপযুক্ত তদারকির মাধ্যমে জাতীয় দলে পর্যায়ক্রমে অর্ন্তভুক্ত করতে পারি না ?
সমতলের জনগোষ্ঠীর সক্ষমতার সাথে এই পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা ফুটবলের মতো পেশী শক্তির খেলায় একটা ভারসাম্যপূর্ণ দল গঠনে সহায়ক হবে।
আমার সাথে অনেকে একমত হবে ফুটবলে জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ ধরনের পদক্ষেপ আমাদের সামনের পথচলাকে আরো শক্তিশালী করবে।
আমাদের ফুটবলে পিছিয়ে পড়ার একটা বড় সমস্যা হল প্রান্তিক পর্যায়ে ফুটবলের অবকাঠামোগত দুর্বলতা,খেলার মাঠের অভাব,পৃষ্ঠপোষকতার স্বল্পতা ইত্যাদি।ফুটবল যেমন মনস্তাত্ত্বিক খেলা তেমনি শক্তি ও কলাকৌশল প্রর্দশনের জায়গা বটে।এসব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠার যথেষ্ট উপায় বা সম্ভাবনা আমাদের সামনে আছে।এই ক্ষেত্রে যে সমস্যা প্রকট তা হলো অর্ন্তদ্বন্ধ আর পেশার প্রতি উদাসীনতা।সম্প্রতি হকির ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রায় সময়ই খেলোয়াড়দের অসন্তোষ যেটা কিনা দেশীয় ফুটবলে হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ফুটবলের অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম সহ আরো কয়েকজনকে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ করা হয়। যেখানে নতুন ফুটবলার উঠে আসার পদ্ধতিটা আমরা কঠোর করে রেখেছি সেখানে প্রতিষ্ঠিতদের প্রতি কোনরুপ অন্যায় বা অবিচারের আলোকে শাস্তির খড়গ দেশীয় ফুটবলের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বটে।
এই একই সময়ে নিষিদ্ধ খেলোয়াড়দের নিষেধাজ্ঞার ধকল কাটিয়ে জাতীয় পর্যায়ে কোন ম্যাচ খেলতে পাঠানো হলে তার কাছ থেকে কতটুকু ফলাফল আপনি আশা করতে পারেন তা সময়ে বলে দেয়।
ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোতে আমাদের নিয়ত আনাগোনা কেবলই আমরা তাদের ফুটবলের সফলতার গুণগান করি নিতান্তপক্ষে তাদের প্রচলিত পদ্ধতি বা ব্যবস্থাপনার কোন যোগসাজেশ কেবল দেশীয় ফুটবলের সাথে জড়াতে পারি না। দেশীয় ফুটবলের অন্তরায় হতে পারে আমলা বা কর্তা নিয়োগ সম্পর্কিত সমস্যা যেমন আপনার সাথে ফুটবলের কোনকালে সম্পর্ক ছিল না আপনি ফুটবলের উন্নয়নের সাথে সিদ্ধান্ত প্রণয়ণে একটু একটু পিছিয়ে থাকবেন,এই সামান্যতম পিছিয়ে থাকাটা দেশীয় ফুটবলে প্রকট হয়ে ধরা দিয়েছে।
আধুনিক ফুটবলে দলবদলের নিয়ম যা কিনা অনেকটা কেনাবেচার সমান। এখানে অর্থের প্রভাব আর ক্ষমতার অপব্যবহার যা আপনাকে নিতান্তপক্ষে প্রকৃত লক্ষ্য বা সাধনা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসবে।
এই সমস্যার সমাধানকল্পে অবশ্য কর্তৃপক্ষ পেশাদার ফুটবলের স্বার্থরক্ষায় যুগোপযোগি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করবে যা কিনা প্রকরান্তরে দেশীয় ফুটবলের উন্নয়নকল্পে অবদান রাখবে।
দেশীয় ফুটবলের হারানো গৌরব আর সোনালি সুদিন ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন যৌক্তিক পদক্ষেপ নিবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলও তার মর্যাদাপূর্ণ আসরে দেশের পতাকাকে সমুন্নত রাখবে ।

আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতের এক অনবদ্য প্রতীক;যেখানে আমরা ফুটবলকে নিয়ে যেতে পারি কেবল দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা আর ফুটবলের প্রতি ভালবাসা।

About The Author
Rajib Rudra
Rajib Rudra

You must log in to post a comment