Now Reading
ফলের মুকুটহীন সম্রাট “আম” এর অজানা কিছু তথ্য



ফলের মুকুটহীন সম্রাট “আম” এর অজানা কিছু তথ্য

বাংলাদেশ,ফুলে ফলে সমৃদ্ধ এই দেশ। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতিটি মৌসুম পরিপূর্ণ হয় বিভিন্ন সুস্বাদু ফলে। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত প্রতিটি ঋতুর আছে নিজেস্ব কিছু ফল। তবে বাঙালির কাছে গ্রীষ্ম কালটা যেন ফলের সমাহার নিয়ে আসে। আম জাম লিচু তরমুজ কতই না বাহারি ফল। তাই আমিও ভাবলাম এমন কিছু লিখি যা এই গ্রীষ্ম কালকে আরো ফলময় করে তুলবে। তাই আমি ভাবলাম ফলের রাজা ”আম” নিয়ে কিছু লিখবো।

আম একটি গ্রীষ্মকালীন ফল। যা গ্রীষ্মপ্রধান দেশ গুলোতে চাষ হয়ে থাকে।আমের উৎপত্তি “Mangifera indica” যা Anacardiaceae পরিবারের একটি ফল (বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে)। কিছু সূত্রমতে এইধরণের ফল বাংলাদেশ ,ভারত ,মায়ানমারে বেশি ফলে থাকে। তবে গর্বের বেপার এইযে এর মধ্যে বাংলাদেশ এর আম বিশ্ব বিখ্যাত। বলা হয়ে থাকে ৬৩২ এবং ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে ভারত ভ্রমণকালে সুপরিচিত চীনা পর্যটক “হুইন টিসং” আমকে প্রথম বহির্বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৫৫৬-১৬০৫ সালে মুঘল সম্রাট আকবার তৎকালীন ভারতের দ্বারভাঙা নগরে ১০০০০০ আমগাছের বাগান করেন। যা ভারত উপমহাদেশের প্রথম আমবাগান হিসেবে পরিচিত।
আমের ইংরেজি নাম “ম্যাংগো”,তামিল শব্দ  “ম্যান-গায়” থেকে এসেছে। পর্তুগিজ শাসনামলে যাকে “মাঙ্গা” বলা হতো। ১৭০০ সালের দিকে ব্রাজিল এ আমগাছ রোপন করা হয় যা ভারত উপমহাদেশের বাহিরে রোপন করা প্রথম আমগাছ।পরবর্তীতে বিভিন্ন বন্য পশুপাখি দ্বারা এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পরে।

বাংলাদেশে প্রচুর প্রজাতির আম উৎপাদন হয়ে থাকে। যার বেশির ভাগ রাজশাহী ,নাটোর,চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং দিনাজপুরে হয়ে থাকে। এবং এইখানে ফলা আমের চাহিদা বাজারে বেশি। বিশিষ্ট কিছু বৈচিত্রের মধ্যে ফজলি ,ল্যাংড়া ,গোপাল ভোগ ,লক্ষণ ভোগ ,মোহনভোগ ,রাজভোগ,হিমসাগর ,কালুয়া ,খিরসাপাত ইত্যাদি বেশি জনপ্রিয়। চলুন জাতভেদে আমের কিছু বৈশিষ্ট জেনে নেই।

ফজলি :এই জাতের আম সাধারণত মৌসুমের শেষের দিকে পাওয়ায়।ফজলি সাধারণত আচার এবং জেলি তৈরিতে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। এটি আকারে অনেক বোরো হয়ে থাকে। সাধারণত একটি আম ১-১.৫ কেজি ওজনের হয়ে থাকে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই জাতের ফলন হয়ে থাকে।

ল্যাংড়া :এইটা হয়তো অনেকেরই অজানা যে কেন এই জাতের আমকে ল্যাংড়া বলা হয়। এর পেছনে আছে একটি গল্প। যে ব্যেক্তি প্রথম এই জাতের আমগাছ রোপন করেছিলেন তার একটি পা ছিল না যার জন্য তাই এলাকাবাসী তাকে ল্যাংড়া বলে ডাকতো। পরবর্তীতে তার নাম অনুসারে এই জাতের নাম দেয়া হয় ল্যাংড়া। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত একটি আমের জাত এইটা। আকারে উপবৃত্তাকার হয় এই ধরণের আম।

খিরসাপাত:এই জাতের আমের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট আছে। আর তা হলো এই আমি খোসা না ছাড়িয়ে খাওয়া যায়। আর তার জন্য আপনাকে বেশি কিছু করতে হবে না। আপনাকে শুধু আমটাকে ভালো মতো ভর্তা করতে হবে ( খোসা সহ ) এরপর ছোট্ট একটি ফুটো করে ভেতরে থাকা ম্যাংগো জুস এর মজা নিন। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে এই জাতের আম পাওয়ায়। বাংলাদেশের বাজারের জনপ্রিয় আমগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম।

কালুয়া :এই জাতের আম সাধারণত ডিম্বাকার হয়ে থাকে। পাকা অবস্থায় খোসা সবুজ বর্ণের হয়ে থাকে এবং ভেতরে অনেকটা লালটে হলুদ বর্ণের হয়। কাঁচা অবস্থায় প্রচুর অম্লীয় হলেও পাকার পর তা অনেক সুস্বাদু এবং মিষ্টি হয়। এই জাতের আমি গাছেই পাকাতে হয় কারণ কাঁচা অবস্থায় পারলে এর অম্লীয়ভাব তা থেকেই যায়।

হিমসাগর : হিমসাগর জাতের আম খুব অল্পসময়ে ফলন হয়। এই জাতের আম খুব মিষ্টি হয়ে থাকে। বলা হয় হিমসাগর আম যখন পাকে ,এর মিষ্টি গন্ধ ঘরে বসে পাওয়ায়। অনেকেই এই জাতের আমকে “আমের রাজা” বলে থাকে। এই জাতের আম পাকা অবস্থায় বাহির থেকে সবুজ এবং ভেতরটা হলুদাভ হয়ে থাকে। এই জাতের আমের কোনো আঁশ থাকে না। মাঝারি আকারের এই আমের ওজন  ২৫০-৩৫০ গ্রাম হয়ে থাকে। বলা হয় অনেক কবি সাহিত্যিক তাদের কবিতায় ,গানে এই আমের কথা লিখে থাকে।

বাংলাদেশে এক সময় প্রায় ৬৩৯৮২০ মে.টন আম উৎপাদন হত।তবে বিগত বছর গুলোতে এর মাত্রা কমেছে।উৎপাদনের হার কোমর পেছনে কিছু কারণ রয়েছে আর তা হল
১.পুরোনো গাছ গুলো আর আগের মতো ফলন দিতে পারছে না।
২.বাগান মালিকদের মৌসুমী ফল চাষের প্রতি আগ্রহ কমেছে।
৩.পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাব।
৪.ফলন সহায়ক কীটপতঙ্গের অভাব।
৫.ফলন যোগ্য জমিতে আবাসিক ভবন ,মার্কেট ইত্যাদি তৈরী।
প্রতিবছর কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী বেশি লাভের আশায় বিষাক্ত ওষুধ প্রয়োগ করে আমের দ্রুত ফলন করে থাকে। যার জন্য আম হারাচ্ছে তার স্বাদ। এবং এই ধরণের আম খেয়ে প্রচুর মানুষ হচ্ছে অসুস্থ। সেই সকল অসাধু ব্যাবসায়ীদের উদ্দশ্যে বলতে চাই আপনারা হয়তো জানেন না আপনাদের এই নোংরামির জন্য আমের রাজ্য বলে খ্যাত বাংলাদেশ তার সিংহাসন হারাতে বসেছে। সরকারের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ এই সব অসাধু ব্যাবসায়ীদের কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি প্রদানের আইন করুন। কারণ তাদের এই কাজ তা কি দেশদ্রোহিতার সমতুল্য না ?

যাই হোক। আমের মৌসুম আর হয়তো ১০-১২ দিন বাদে শুরু হচ্ছে।তাই বেশি করে আম খান চালের( চালের দাম এবার মাথার ওপরে ) ওপরে চাপ কমান। আর যেহেতু এবার পুরো মৌসুম রমজানের মধ্যে পড়ছে। তাই টাকা দিয়ে বিদেশী ফল না খেয়ে আম/কাঁঠাল খান। আপনার শরীরের শর্করার চাহিদাই পূরণ করবে ইনশাআল্লাহ।

About The Author
Abdul Mueez
1 Comments
Leave a response

You must log in to post a comment