সাহিত্য কথা

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ১)

ভবঘুরে রা এমনই হয়। স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করা, মাথায় কোন দুশ্চিন্তা না রাখা, পাছে লকে কিছু বলবে এমন ভাবনায় সময় নষ্ট না করা তাদের প্রাথমিক কাজ।

ধ্রুব হঠাৎ তাদের দলে নাম লেখিয়েছে। ভোর ৬ টায় ঘুম থেকে উঠে পকেটে ৫০০ টাকা নিয়ে বের হয় প্রতিদিন। ৬ টা পনেরোর মধ্যে সবুজ হোটেলের সামনে গিয়ে দারায়। তারপর ভেতরে ঢুকে সকালের ভোজন শেষ করে। খাসীর পায়া এবং ৪ টি পরোটা ধ্রুবর প্রতিদিনের রুটিন । বেয়ারা সবাই ধ্রুবকে ভাল করেই চিনে।

প্রতিদিন ধ্রুব হোটেলে প্রবেশের সাথে সাথেই তাদের আপ্যায়ন শুরু হয়ে যায়। ধ্রুবর প্রতিদিনের অর্ডার তাদের সবার জানা, তাই জিজ্ঞাসা করে আর সময়  নষ্ট করে না।

মাত্র ৮০ টাকা বিল এবং বেয়ারা কে ২০ টাকা বখশিস দিলে সর্বমোট ১০০ টাকা আসে। তবুও ধ্রুব প্রতিদিন ৫০০ টাকা নিয়ে বেরহয় কেন জানি না। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত গাজা সেবনের কারনে মাথাটা আউলিয়েছে, হয়ত সে কারনেই।

গত পরশু ধ্রুবর মা মারা গেছেন। নিকট আত্মীয়রা বললেন ধ্রুবর চোখে তারা অশ্রুকণা দেখেননি। ৪ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার সময়ও এই বেশ ধরেছিল সে।

এতসব কথা শোনার পর মনে হবে ধ্রুব ছেলেটা এমনই। না হয় মা-বাবা মারা যাওয়ার পরও একটি মানবশিশু এতটা বেখেয়াল কিভাবে থাকে?

ব্যাপারটা আসলে তা নয়, ধ্রুবর চোখের সব জল শুকিয়ে গিয়েছিল বাবা মারা যাওয়ার ৮ মাস আগে। ২০১২ সালের এপ্রিলের ১৩ তারিখ। যখন তার আদরের একমাত্র ছোট বোনটাকে ধর্ষন করে হত্যা করা হয়। পাড়ার কিছু বখাটের কাজ এটা, ধ্রুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল। ৩ জন কাছের বন্ধু এবং ২ টা চাইনিজ কুড়াল নিয়ে ধ্রুব বেরিয়েছিল তার বোনের আত্মার শান্তির কামনায়। কিন্তু তারা গা ঢাকা দেয়, পুলিশও তাদের কোন হদিস পায় নি। সেদিন থেকে চনমনে ধ্রুব বদলে গিয়ে নিজেকে হারিয়েছে। বোনের ঐ ঘটনাটার পর মা আধমরা এবং বাবা নেই বলা যেতে পারে। ধ্রুবর বাবা বাংলাদেশ আর্মির অবসরপ্রাপ্ত মেজর ছিলেন, ১২ বছর আর্মিতে থাকার পর নিজের কিছু ব্যাবসা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছিলেন সর্বত্র।

ধ্রুবর বোন ছিল পড়ালেখার দিক দিয়ে অত্যন্ত মেধাবী, তাকে নিয়ে মিঃ এন্ড মিসেস মেজর এর কোন চিন্তা ছিলনা। তারা জানত, একদিন সে ঠিকই ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার কিছু হয়ে দেখাবে। যত চিন্তা ছিল সব ধ্রুব কে নিয়েই। ধ্রুবকে সবসময় তাড়া করে বেড়াত সৃষ্টিশীল কিছু করার ইচ্ছা । পড়ালেখা নিয়ে টেবিল এবং বইয়ের গন্ডির মাঝে বসে থাকার মত ধৈর্য্য তার ছিল না। কিন্তু ধ্রুবর বোন ঐন্দ্রিলা মারা যাওয়ার পর তার মা-বাবা ধ্রুবকে নিয়ে চিন্তাও ছেড়ে দিয়েছিল। খুব তাড়াহুড়োর মধ্যেই মেজর সাহেব সব বিষয়সম্পত্তি ধ্রুবর নামে করে দিয়ে মারা গেলেন। এবং ধ্রুবর মা, বাপ-মেয়ের কবরের পাশে কাদতে কাদতে।

আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছল ছিল ধ্রুবর পরিবার। তখন ধ্রুব ছাড়া ব্যাবসার দেখাশুনা করার মত আর কেউ ছিল না। নারায়ণগঞ্জে বিশাল বড় এক খামার, ঢাকায় একটি ছোটখাট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং চট্টগ্রামে ২ টা রেস্তোরা ছারাও গ্রামে রয়েছে অনেক চাষের জমি। এসব দেখাশুনা করার জন্য মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন, মানসিক স্তুতি থাকা প্রয়োজন। যা ধ্রুবর ছিল না। তাই মাথা পুরোপুরি আউলে যাওয়ার কিছু আগেই ধ্রুব তার খুব কাছের এক বন্ধু শৈবাল কে নিয়োগ দেয় তার ব্যাবসা সামলাতে।

স্কুলজীবন থেকেই একসাথে ছিল শৈবাল আর ধ্রুব। দুইজন খুবই ভাল বন্ধু। মানিকজোড়ই বলা যায়। কিন্তু শৈবাল এর পরিবারের আর্থিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ এবং পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় তার উপর ছিল সংসারের হাল ধরার চাপ। ভাগ্য দোষে চট্টগ্রাম বিশ্যবিদ্যালয় থেকে পাশ করে বের হওয়ার ১ বছর পার হয়ে গেলেও কোন চাকরি জোটেনি শৈবাল এর কপালে। তখন ধ্রুব নরম গলায় শৈবালকে তার সব ব্যাবসা-বাণিজ্য দেখাশুনা করার প্রস্তাব দিল। বিনিময়ে মাসিক ৬০ হাজার টাকা বেতন দেবে।

অর্থনীতির এই মন্দাজড়িত অবস্থায় কেউ শুরুতেই এত বিশাল অংকের প্রস্তাব দেয় না। আর বন্ধুকে চাকরির প্রস্তাব দেওয়া জামিন অযোগ্য অপরাধের আওতায় পরে। শৈবালের মাথায় তখন রক্ত চড়ে বসেছে, এক চরে সে ধ্রুবর ১৬ টি দাঁত ফেলে দিতে চায়। তার শক্ত হাতের উপর তার যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস আছে। কিন্তু একদিকে মানসিক ভারসাম্যহীন ধ্রুব, আরেকদিকে শৈবালের পরিবারের কথা চিন্তা করে শৈবাল রাজি হয়ে যায়। তাকে ৬০ হাজার টাকা দেওয়া ধ্রুবর কাছে কোন ব্যাপারই না, এখন অবশ্য সে ১ লক্ষ পায়। সব মিলিয়ে মাসিক ১৩ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা আয় হয় ধ্রুবর। কিন্তু সে পরিমাণে ধ্রুবর কোন খরচ নেই বললেই চলে।

ধ্রুবকে বাচিয়ে রাখার পেছনেও শৈবালের অনেক অবদান। মাথাটা পুরোপুরি আউলে যাওয়ার পর থেকে জ্ঞ্যান-বুদ্ধি সব হারিয়েছে সে। শৈবালের মত এক বন্ধু পাওয়া ধ্রুবর সৌভাগ্যই বটে । তার খাওয়া পড়া থেকে শুরু করে, প্রতি মাসে এতগুলো টাকা তার ব্যাংকে জমা দেওয়া সব ধ্রুবই করে। আর এই একমাত্র শৈবালের সাথেই ধ্রুব কথা বলে। অন্যথা প্রায় সময় চুপটি মেরে বসে থাকে।

যাই হোক আজকের মত সকালের খাওয়া শেষ করে একটি চুরুট ধরিয়ে বাড়ি ফিরল ধ্রুব। এলোমেলো বিছানার উপর বসে জানালা দিয়ে পাখির গান শুনছিল। ধ্রুব তখনি ফোন দিল। ধ্রুবর ফোনে রিংটোন বাজছে, ” আমার পরান যাহা চায়, তুমি তাই “। গানটা ধ্রুবর খুব প্রিয়, তাই বেশিরভাগ মানুষ তাকে ফোন দিয়ে যোগাযোগ করতে পারে না। ৩ থেকে ৪ বার বাজার পরে ধ্রুব ফোন ধরল। শৈবাল কোনরকম বিরক্তি প্রকাশ ছাড়াই তার সাথে কথা বলা শুরু করল।

শৈবালঃ খালাম্মার চল্লিশার ব্যাবস্থা করতে হবে তো। এতটা বেখেয়ালে থাকিস না। ধ্রুব শুনে চুপ করে বসে থাকে। চোখে মুখে অপরাধী অপরাধী ভাব, কিন্তু মুখে আর কিছু প্রকাশ করে নি।

ধ্রুবঃ বাসায় আয় কাজ আছে। শৈবালকে বলল ধ্রুব। এই অসময় শৈবালকে কখনো দেখা করতে বলে না ধ্রুব, তাই শৈবাল একটু অবাক হয় বৈকি ।
(চলবে……)

একই রকম আরো কিছু ফুটপ্রিন্ট

জানা অজানা রূপকথা | পর্ব -২

Zabin Khan

ধ্রুব’র কাহিনি (পর্ব ৩)

Prashanta Deb

পৃথিবীর ক্ষণস্থায়ী কিছু দেশের উত্থান-পতনের গল্প

Ariyan Mahmud Rokon

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy